সিন্ডিকেটের দখলে পেট্রোল পাম্প, রাতে চলে ‘সিরিয়াল’ কেনাবেচা

সাতক্ষীরায় জ্বালানি তেলের সংকটকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। জেলার ফুয়েল স্টেশনগুলোতে সাধারণ মানুষকে হটিয়ে গভীর রাতে মোটরসাইকেল রেখে ‘সিরিয়াল’ দখল করছে তারা। সকালে সেই সিরিয়াল টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হচ্ছে। সিন্ডিকেটের এ দৌরাত্ম্যে সাধারণ গ্রাহক ও জরুরি সেবার যানবাহনগুলো তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিবাদ করলে সাধারণ মানুষ ও পাম্প কর্মচারীদের ওপর হামলা ও ‘মব’ তৈরির হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। ভোর হতে মোটরসাইকেলের দখলে পাম্পসরেজমিনে সাতক্ষীরা শহর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফোটার আগে পাম্পের সামনে ও সড়কে হাজার হাজার মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। তবে এসব সারির শুরুতে অধিকাংশ মোটরসাইকেলের ধারে কাছে কোনো চালক নেই। স্থানীয় প্রভাবশালী বখাটে যুবকরা আগের রাতেই ৩০ থেকে ৪০টি বাইক পাম্পের ভেতরে বা সামনে সারিবদ্ধভাবে রেখে দেয়। ফলে ভোরে আসা সাধারণ মানুষ দেখতে পান তাদের সামনে কয়েকশ বাইকের ‘ভুতুড়ে’ সিরিয়াল। সিরিয়াল বাণিজ্যে জিম্মি সাধারণ মানুষসাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর এলাকার চাকরিজীবী মো. নজরুল ইসলাম জানান, ফজরের পর লাইনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু

সিন্ডিকেটের দখলে পেট্রোল পাম্প, রাতে চলে ‘সিরিয়াল’ কেনাবেচা

সাতক্ষীরায় জ্বালানি তেলের সংকটকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। জেলার ফুয়েল স্টেশনগুলোতে সাধারণ মানুষকে হটিয়ে গভীর রাতে মোটরসাইকেল রেখে ‘সিরিয়াল’ দখল করছে তারা। সকালে সেই সিরিয়াল টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হচ্ছে। সিন্ডিকেটের এ দৌরাত্ম্যে সাধারণ গ্রাহক ও জরুরি সেবার যানবাহনগুলো তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিবাদ করলে সাধারণ মানুষ ও পাম্প কর্মচারীদের ওপর হামলা ও ‘মব’ তৈরির হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

ভোর হতে মোটরসাইকেলের দখলে পাম্প
সরেজমিনে সাতক্ষীরা শহর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফোটার আগে পাম্পের সামনে ও সড়কে হাজার হাজার মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। তবে এসব সারির শুরুতে অধিকাংশ মোটরসাইকেলের ধারে কাছে কোনো চালক নেই। স্থানীয় প্রভাবশালী বখাটে যুবকরা আগের রাতেই ৩০ থেকে ৪০টি বাইক পাম্পের ভেতরে বা সামনে সারিবদ্ধভাবে রেখে দেয়। ফলে ভোরে আসা সাধারণ মানুষ দেখতে পান তাদের সামনে কয়েকশ বাইকের ‘ভুতুড়ে’ সিরিয়াল।

সিরিয়াল বাণিজ্যে জিম্মি সাধারণ মানুষ
সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর এলাকার চাকরিজীবী মো. নজরুল ইসলাম জানান, ফজরের পর লাইনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু সামনে অন্তত ৫০টি বাইক রাখা, যেগুলোর কোনো চালক নেই। পরে জানতে পারি, এ সিরিয়াল ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টাকা দিলে আগে তেল পাওয়া যায়, না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও লাভ হয় না।

তানভীর হোসেন নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, একই লোক দিনে ৩-৪ বার তেল নিচ্ছে। একবার তেল নিয়ে আবার অন্য বাইক নিয়ে লাইনে ঢুকছে। পরে সেই তেল বাইরে চড়া দামে বিক্রি করছে।

প্রাইভেটকার চালকদের চরম ভোগান্তি
ভাড়ায় চালিত একটি প্রাইভেটকারের চালক মো. আশিক বলেন, রাতে এসে ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি। পুরো পাম্প এখন মোটরসাইকেলের দখলে। বড় গাড়ির কথা কেউ ভাবছে না। আয় না হলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

সিন্ডিকেটের দখলে পেট্রোল পাম্প, রাতে চলে ‘সিরিয়াল’ কেনাবেচা

বিপাকে জরুরি সেবা, নেই অগ্রাধিকার
তেল সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জরুরি সেবায়। চিকিৎসক, সাংবাদিক, অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পণ্যবাহী যানবাহনের জন্য কোনো আলাদা লেন বা অগ্রাধিকার নেই।

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, জরুরি রোগী দেখতে যেতে হয়। কিন্তু তেলের জন্য ৩-৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। এতে রোগীসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।

খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাম্প থেকে সংগৃহীত তেল ড্রাম বা বোতলে ভরে গ্রামের খুচরা দোকানগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দামে গোপনে বিক্রি হচ্ছে এই তেল। এতে কৃত্রিম সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

সিন্ডিকেটের দখলে পেট্রোল পাম্প, রাতে চলে ‘সিরিয়াল’ কেনাবেচা

পাম্প কর্তৃপক্ষ অসহায়
পাম্প মালিকরা বলছেন, তারা পরিস্থিতির শিকার। শহরের একটি ফুয়েল স্টেশনের মালিক লাল্টু বলেন, সিন্ডিকেটের সদস্যরা দলবদ্ধভাবে এসে পাম্পে মোটরসাইকেল রেখে যায়। বাধা দিলে কর্মচারীদের মারধর করে, এমনকি দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও ট্যাগ অফিসারের সামনেও ঔদ্ধত্য দেখায়। নিরাপত্তাহীনতায় আমরা আতঙ্কে আছি।

প্রশাসনের পদক্ষেপ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পাম্পে ভ্রাম্যমাণ আদালত, বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে সিন্ডিকেটের কৌশলের কারণে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস জানান, ফুয়েল স্টেশনগুলোতে মোটরসাইকেলভিত্তিক সিন্ডিকেটের কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। অনিয়ম বন্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জরুরি সেবার জন্য আলাদা ব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

আহসানুর রহমান রাজীব/আরএইচ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow