সিরাজগঞ্জে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ১০৫৬ বিদ্যালয়

সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলায় ১ হাজার ৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। ফলে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ। এতে পাঠদান ও শিক্ষার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণের দাবি শিক্ষক ও অভিভাবকদের। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১ হাজার ৬৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যার মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদরে ২৪৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৪০টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। তাড়াশে ৯৭, রায়গঞ্জে ১১৩, কামারখন্দে ৩১, শাহজাদপুরে ১৫৫, কাজীপুরে ১৫৯, বেলকুচি ১০৩, চৌহালী ৯০ ও উল্লাপাড়ায় ২৭৮টির মধ্যে ১৬৮টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এছাড়া অনুমোদিত সহকারী শিক্ষক পদ ৯ হাজার ৩৭৩টি থাকলেও কর্মরত রয়েছে ৮ হাজার ৫২৬টি। এতেও শূন্য রয়েছে ৮৪৭টি পদ। এই হিসেবে ৬৩ ভাগেরও বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। আর প্রধান শিক্ষক না থাকায় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। এতে পাঠদান ব্যাঘাত ঘটছে। ‘শুধু প্রধান শিক্ষকই নন, ৮৪৭ জন সহকারী শিক্ষকের ঘাটতিও রয়েছে। এসব শূন্য পদ প

সিরাজগঞ্জে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ১০৫৬ বিদ্যালয়

সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলায় ১ হাজার ৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। ফলে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ। এতে পাঠদান ও শিক্ষার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণের দাবি শিক্ষক ও অভিভাবকদের।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১ হাজার ৬৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যার মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদরে ২৪৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৪০টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। তাড়াশে ৯৭, রায়গঞ্জে ১১৩, কামারখন্দে ৩১, শাহজাদপুরে ১৫৫, কাজীপুরে ১৫৯, বেলকুচি ১০৩, চৌহালী ৯০ ও উল্লাপাড়ায় ২৭৮টির মধ্যে ১৬৮টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এছাড়া অনুমোদিত সহকারী শিক্ষক পদ ৯ হাজার ৩৭৩টি থাকলেও কর্মরত রয়েছে ৮ হাজার ৫২৬টি। এতেও শূন্য রয়েছে ৮৪৭টি পদ।

এই হিসেবে ৬৩ ভাগেরও বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। আর প্রধান শিক্ষক না থাকায় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। এতে পাঠদান ব্যাঘাত ঘটছে।

‘শুধু প্রধান শিক্ষকই নন, ৮৪৭ জন সহকারী শিক্ষকের ঘাটতিও রয়েছে। এসব শূন্য পদ পূরণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন হলে শূন্যপদ পূরণ হবে।’

সরেজমিনে রায়গঞ্জ উপজেলার কয়ড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে, পুরো বিদ্যালয় শিক্ষার্থীর পদচারণে মুখর। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীতে ঠাসা। শিক্ষকেরা কেউ ক্লাস নিচ্ছেন। কেউ কার্যালয়ে বসে দাপ্তরিক কাজ করছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল আলম ক্লাস নিয়ে এক ফাঁকে তার কক্ষে আসেন।

আশরাফুল আলম বলেন, ২০১৯ সাল থেকে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। এ পদে কাজের চাপ বেশি থাকায় আগের মতো আর ক্লাস নিতে পারি না।

একই উপজেলার চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলে দেখা জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে ফিরোজ মাহমুদ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

‘শিক্ষক সংকটে দুর্বল শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ শিক্ষকস্বল্পতার কারণে তাদের জন্য বাড়তি সহায়তা বা দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া যোগ্য শিক্ষক খুঁজে পেতেও সমস্যা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করতে কিছু শিক্ষকের অনাগ্রহ, সব মিলিয়েই প্রাথমিকে এই সংকট তৈরি হয়েছে।’

অন্য শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীর অনুপাতে এমনিতেই শিক্ষক কম, তার মধ্যে আবার প্রধান শিক্ষক নেই। এ কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বেড়ছে।

প্রধান শিক্ষক না থাকায় নিজেদের সমস্যার কথা জানিয়ে ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারুফ শেখ জাগো নিউজকে বলেন, দেড় বছর ধরে স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই। এতে আমাদের সমস্যা হয়। তিনজন শিক্ষক টানাটানি করে ক্লাস নেয়। এই বিষয়গুলো দেখার কেউ নেই। প্রধান শিক্ষক থাকলে সব দিক খেয়াল রাখতে পারতেন।

জালাল উদ্দিন নামের এক অভিভাবক জাগো নিউজকে বলেন, প্রধান শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রধান। তিনি বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম তদারকি ও শিক্ষকদের কাজের দেখভাল করেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন নথি সংরক্ষণ, স্থানীয় অভিভাবক ও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু বিদ্যালয়ে ওই পদ শূন্য থাকলে একজন সহকারী শিক্ষককে এসব দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য শিক্ষক সংখ্যা কমে যায়। ফলে পাঠদান ব্যাহত হয়।

‘মামলা, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ পরীক্ষায় দেরি, পদোন্নতিতে ধীরগতির কারণে এ সংকট দীর্ঘ হচ্ছে। এমনিতেই ঠিকমতো পড়াশোনার অভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিখন-ঘাটতি নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে ওঠে। এর মধ্যে বিদ্যমান শিক্ষক-সংকট এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে বলে মনে করছেন তিনি। এ সংকট নিরসনে তিনি দ্রুত সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।’

আরেক অভিভাবক সিমা খাতুন বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক কম থাকায় আমার সন্তান পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। এখন তাকে প্রাইভেট পড়াতে হচ্ছে। ফলে তাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করবে কিনা, সেটা নিয়ে ভাবছি।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার তৃতীয় শ্রেণির সাকিব হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, একজন শিক্ষক প্রায়ই একই সময়ে দুটি ক্লাস নেন। আবার কখনো কখনো একটি ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই অন্য ক্লাসে চলে যান।

ব্রম্মগাছা ইউনিয়নের চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুবেল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও শিক্ষার গুণগত মান রক্ষায় প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানে পদ শূন্য থাকায় নেতৃত্বের বড় একটি ঘাটতি তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রধান শিক্ষকেরা দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি তদারকি ও ক্লাস নেন। ফলে প্রধান শিক্ষক না থাকলে এসব কাজে সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মানও নিম্নগামী হতে থাকে। শুধু তাই নয়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বেগ পান।

প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্বে থাকা রায়গঞ্জ উপজেলার চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক ফিরোজ মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, তার বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১৩৩ জন। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। সে কারণে এই পদে তিনি চলতি দায়িত্বে আছেন। ওই সময়ে প্রধান শিক্ষক ছাড়াও আরও দুজন সহকারী শিক্ষক অবসরে চলে গেছেন। বর্তমানে বিদ্যালয়ে তিনিসহ মোট তিনজন শিক্ষক রয়েছে। এরমধ্যে একজন রয়েছে প্রেষণে।

তিনি আরও বলেন, চলতি দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে পাঠদান ছাড়াও প্রশাসনিক, দাপ্তরিক ও নানা সরকারি কর্মসূচি পালনের মূল দায়িত্ব তার কাঁধে। শিক্ষকদের পাঠদান তদারকি, শিক্ষা কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, মাসিক সভায় যোগদান ও নানা তথ্য-উপাত্ত শিক্ষা কার্যালয়ে জমা দেওয়াসহ নানা কাজ করতে হচ্ছে৷ এতে কষ্ট হলেও তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে জানান।

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, অপর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত চাপ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সীমিত যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি, সব মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মান এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক, কারণ শিক্ষার্থীদের শিখনফলও দুর্বল।

তিনি আরও বলেন, এতে শিক্ষক সংকটে দুর্বল শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ শিক্ষকস্বল্পতার কারণে তাদের জন্য বাড়তি সহায়তা বা দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া যোগ্য শিক্ষক খুঁজে পেতেও সমস্যা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করতে কিছু শিক্ষকের অনাগ্রহ, সব মিলিয়েই প্রাথমিকে এই সংকট তৈরি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না শর্তে জেলার এক উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, মামলা, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ পরীক্ষায় দেরি, পদোন্নতিতে ধীরগতির কারণে এ সংকট দীর্ঘ হচ্ছে। এমনিতেই ঠিকমতো পড়াশোনার অভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিখন-ঘাটতি নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে ওঠে। এর মধ্যে বিদ্যমান শিক্ষক-সংকট এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে বলে মনে করছেন তিনি। এ সংকট নিরসনে তিনি দ্রুত সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাহাব উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, শুধু প্রধান শিক্ষকই নন, ৮৪৭ জন সহকারী শিক্ষকের ঘাটতিও রয়েছে। এসব শূন্য পদ পূরণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন হলে শূন্যপদ পূরণ হবে।

এনএইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow