সিলেট থেকে ইমনের নিথর দেহ নিয়ে ফিরল পরিবার

মাত্র চার মাস আগে বিয়ে করেছিলেন ইমন আচার্য। নতুন সংসার, নতুন স্বপ্ন আর পরিবারের ভরসা হয়ে উঠছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল এক নির্মম ছুরিকাঘাতে। ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে সিলেটে নিহত হয়েছেন র‌্যাব-৯ এর সদস্য ইমন আচার্য।  ময়নাতদন্ত শেষে তার নিথরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে কান্নায় ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। শনিবার (২৩ মে) সকালে নিহত ইমন আচার্যের ভাই সুজিত আচার্য বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন।  মামলার একমাত্র আসামি করা হয়েছে ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়া আসাদুল আলম বাপ্পিকে (২২)। বাপ্পিকে সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।  এদিকে, শনিবার মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন ইমনের স্বজনরা। দুপুরে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে ছিল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ভাইয়ের ম

সিলেট থেকে ইমনের নিথর দেহ নিয়ে ফিরল পরিবার

মাত্র চার মাস আগে বিয়ে করেছিলেন ইমন আচার্য। নতুন সংসার, নতুন স্বপ্ন আর পরিবারের ভরসা হয়ে উঠছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল এক নির্মম ছুরিকাঘাতে। ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে সিলেটে নিহত হয়েছেন র‌্যাব-৯ এর সদস্য ইমন আচার্য। 

ময়নাতদন্ত শেষে তার নিথরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে কান্নায় ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।

শনিবার (২৩ মে) সকালে নিহত ইমন আচার্যের ভাই সুজিত আচার্য বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন। 

মামলার একমাত্র আসামি করা হয়েছে ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়া আসাদুল আলম বাপ্পিকে (২২)। বাপ্পিকে সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। 

এদিকে, শনিবার মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন ইমনের স্বজনরা।

দুপুরে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে ছিল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ভাইয়ের মরদেহের পাশে বসে বারবার সৃষ্টিকর্তার কাছে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানাচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ধলই ইউনিয়নের পশ্চিম ধলই গ্রামের আশ্চর্য বাড়ির রনধির আচার্যের (মিন্টু ডাক্তার) ছোট ছেলে ইমন আচার্য ২০১৮ সালে পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০২৫ সালে র‌্যাব-৯ এ সংযুক্ত হন। পরিবারের আশা ছিল, একদিন ছেলেটি আরও বড় হবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই প্রাণ দিতে হলো তাকে।

পরিবার সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি বিয়ে করেছিলেন ইমন। এখনও নতুন সংসারের রেশ কাটেনি। স্বামীর মরদেহ গ্রহণ করতে ছুটে এসেছেন তার স্ত্রী। হাসপাতালের মর্গের সামনে নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন তিনি। কয়েক মাস আগেও যে মানুষটির হাত ধরে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন, আজ তাকেই বিদায় জানাতে হচ্ছে চিরদিনের জন্য।

সরেজমিনে ওসমানী হাসপাতালের মর্গের সামনে দেখা যায়, নিহত ইমনের কাকা ও পশ্চিম ধলই উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক প্রাণজিৎ আচার্য, বড় ভাই সুজিত আচার্য, বোন জামাতা, তার স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজন বন্ধুরা বাড়ি থেকে ছুটে আসছেন। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে নেওয়া হলে বড় ভাই সুজিত ও তার বন্ধুরা বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ইমনের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না। 

পুলিশ জানায়, শুক্রবার দুপুরে কোতোয়ালি থানা সংলগ্ন এলাকায় কয়েকজন ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীকে ধাওয়া করে পুলিশ। এ সময় সাদা পোশাকে থাকা ইমন আচার্য পুলিশকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে যান। ছিনতাইকারী আসাদুল আলম বাপ্পীকে আটকানোর সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাপ্পী তাকে ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইমন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় বাপ্পী তোপখানার একটি বাসায় ঢুকে এক শিশুকে জিম্মি করার চেষ্টা করে। পরে পুলিশ ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয় এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরিসহ বাপ্পীকে আটক করা হয়।

ইমনের পরিবার সূত্রে জানা যায়, রোববার (২৪ মে) দুপুর ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। এতে র‌্যাব-৭ এর সদস্যদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

নিহত ইমন আচার্যের ভাই সুজিত আচার্য কালবেলাকে বলেন, আমাদের পরিবারে মোট সাতজন সদস্য। বাবা, মা, আমি ও আমার স্ত্রী, ছোট ভাই ইমন ও তার স্ত্রী এবং একটি ভাগনা। বাবা আগে পুলিশে চাকরি করতেন। সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি পঙ্গু হয়ে আছেন। এখন এই পরিবারটা কীভাবে চলবে আমি জানি না।

তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে এসেছে, আমার ভাইয়ের ফুসফুস ও হার্টসহ তিনটি স্থানে আঘাত করে ছিদ্র করা হয়েছে। কী নিষ্ঠুরভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে, সেটা ভাবলেও শরীর কেঁপে ওঠে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুদীপ আচার্য সরকারের কাছে ভাই হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি, এই হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। যেন কোনোভাবেই সে মুক্তি না পায়। আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়, আর কোনো নববধূ যেন চার মাসের মাথায় বিধবা না হয়।

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির কালবেলাকে বলেন, নিহত র‌্যাব সদস্য ইমন আচার্য হত্যা মামলায় তার বড় ভাই সুদীপ আচার্য বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি রুজু করা হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামি আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

র‌্যাব-৯ এর অধিনায়ক (সিও) উইং কমান্ডার তাজমিনুর রহমান চৌধুরী শনিবার রাতে কালবেলাকে বলেন, ইমন আচার্য হত্যার ঘটনার পর আমরা এসএমপির সঙ্গে যৌথভাবে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছি। গত রাত পর্যন্ত ৪৪ জন ছিনতাইকারী ও দুষ্কৃতিকারীকে বিভিন্ন মামলায় আটক করা হয়েছে। এ ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন পুলিশের হাতে আটক রয়েছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঈদ এবং ঈদ-পরবর্তী সময় পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, মামলাটি ৩০২ ধারায় রুজু করা হয়েছে। আদালতে আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। আমরা দ্রুত বিচার আইনে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চাই। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দ্রুত পাওয়া গেলে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

নিহতের পরিবারের প্রতি র‌্যাবের সহযোগিতার বিষয়েও কথা বলেন তিনি জানান, র‌্যাবের ফ্রিজার ভ্যানে করে মরদেহ এবং স্বজনদের আলাদা গাড়িতে হাটহাজারীতে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।

উইং কমান্ডার তাজমিনুর রহমান চৌধুরী বলেন, ইমন আচার্য বীরত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। আমরা আশা করি, তাকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি তার পরিবারের আর্থিক সহায়তা ও ভবিষ্যতের যে কোনো প্রয়োজনে র‌্যাব পাশে থাকবে।

সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে ছিনতাই, ধর্ষণ ও অপরাধ বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু সিলেট নয়, সারা দেশেই এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow