সীমান্তে মায়ের আকুতি, ‘আমার সন্তানকে বাঁচান’

‘তিন দিন ধরে সীমান্তের শূন্য রেখায় রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অসুস্থ দুই শিশু সন্তান আর স্বামী নিয়ে পড়ে আছি। কোনো দেশ আমাদের গ্রহণ করছে না। আমরা খুবই অসহায়, এখন আর মরে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। আমার ৫ মাসের সন্তান ফাইমাকে বাঁচান! চার বছর বয়সী আরেক সন্তান ফাতেমাও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। আমরা বাঁচতে চাই...’ —সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলার ঘেঁষে অবস্থান নেওয়া এক মা সুমি আক্তারের এই বুকফাটা আর্তনাদ আর অশ্রুসজল চোখ যেন থমকে দিয়েছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর পাহারাকে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেল ৪টার দিকে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তের গয়টাপাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক চরম মানবেতর দৃশ্য। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পুশইন হওয়ার পর সাংবাদিক দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুমি আক্তার। গত তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে সুমি-বেলাল দম্পতি ও তাদের দুই শিশু সন্তানসহ মোট ৬ জন এবং অন্য একটি পয়েন্টে আরও ৩ যুবকসহ মোট ৯ বাংলাদেশি নাগরিক আটকে আছেন। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান মেলেনি। ফলে স

সীমান্তে মায়ের আকুতি, ‘আমার সন্তানকে বাঁচান’

‘তিন দিন ধরে সীমান্তের শূন্য রেখায় রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অসুস্থ দুই শিশু সন্তান আর স্বামী নিয়ে পড়ে আছি। কোনো দেশ আমাদের গ্রহণ করছে না। আমরা খুবই অসহায়, এখন আর মরে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। আমার ৫ মাসের সন্তান ফাইমাকে বাঁচান! চার বছর বয়সী আরেক সন্তান ফাতেমাও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। আমরা বাঁচতে চাই...’ —সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলার ঘেঁষে অবস্থান নেওয়া এক মা সুমি আক্তারের এই বুকফাটা আর্তনাদ আর অশ্রুসজল চোখ যেন থমকে দিয়েছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর পাহারাকে।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেল ৪টার দিকে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তের গয়টাপাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক চরম মানবেতর দৃশ্য। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পুশইন হওয়ার পর সাংবাদিক দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুমি আক্তার। গত তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে সুমি-বেলাল দম্পতি ও তাদের দুই শিশু সন্তানসহ মোট ৬ জন এবং অন্য একটি পয়েন্টে আরও ৩ যুবকসহ মোট ৯ বাংলাদেশি নাগরিক আটকে আছেন।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান মেলেনি। ফলে সীমান্তের শূন্য রেখায় ঝুলে আছে ৯টি প্রাণ।

সুমি আক্তার ও বেলাল হোসেন দম্পতির দাবি, তারা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিক। তাদের স্থায়ী বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুর গ্রামে। জীবিকার তাগিদে প্রায় ৭ মাস আগে দালালের মাধ্যমে সিলেটের সীমান্ত দিয়ে তারা ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের সঙ্গে থাকা অন্য দুজন হলেন- একই জেলার হিমেল (২৬) ও সজিব হোসেন (১৮)। 

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ১০৬৬ নম্বর মেইন পিলারের কাছে শূন্য রেখায় আটকে পড়া বাকি তিন যুবক হলেন— ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার আনোয়ারাবাদ ইউনিয়নের কাউছিয়া গ্রামের নাঈম (২২), সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার কাউকান্দি গ্রামের জহিরুল ইসলাম (২৬) এবং নেত্রকোনার বারহাট্টা থানার সাওতা গ্রামের পারভেজ (২১)। তারা প্রত্যেকেই কয়েক মাস আগে ভাগ্য অন্বেষণে ভারতে গিয়েছিলেন।

ভুক্তভোগী সুমি আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাঁচ মাসের সন্তানের কষ্ট আর সইতে পারছি না। জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা দরকার, কিন্তু কে করবে চিকিৎসা? আমার সন্তানকে দয়া করে বাঁচান। আমাদের যেকোনো দেশে নিয়ে যান, কিন্তু এভাবে খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখবেন না।’

সীমান্তবর্তী গয়টাপাড়া ও ভুন্দুরচর এলাকার বাসিন্দারা জানান, ফাঁকা জঙ্গল ও কৃষিজমিতে মশা, পোকা-মাকড় আর বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে চরম মানবেতর রাতদিন পার করছেন এই নাগরিকরা। মানবিক দিক বিবেচনা করে স্থানীয় গ্রামবাসী তাদের পোশাক, খাবার ও পানি সরবরাহ করছেন। 

গ্রামবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পাঁচ মাসের এবং চার বছরের দুটি অবুঝ শিশুর এই দশা দেখে চোখে পানি ধরে রাখা যায় না। সরকারের উচিত দ্রুত কূটনৈতিকভাবে এর একটা সমাধান করা, তা না হলে বিনা চিকিৎসায় অবুঝ শিশুগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।’

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক ১০৬০ মেইন পিলারের ১ সাব পিলারে কাছে রোববার (১৪ জুন) ভোরে ভারতের আসাম রাজ্যের দক্ষিণ সালমারা মানকারচর জেলার ঝালোরচর বিএসএফ কর্তৃক অবৈধভাবে গয়টাপাড়া সীমান্তে ৬ নাগরিককে পুশইন করেন। পরে বিজিবি-স্থানীয় জনতা বাধা দিলে তারা সীমানা পিলারের কাছে অবস্থান নেয়। এ ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে।

ঘটনার পর ওই দিন বেলা ১১টার দিকে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে ঘণ্টাব্যাপী একটি জরুরি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধীনস্থ দাঁতভাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার ঠান্ডু মিয়া। ভারতের পক্ষে ছিলেন ১৮৩ ব্যাটালিয়নের ঝালোরচর ক্যাম্পের ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার। তবে ওই বৈঠকে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বিজিবিও পুশইন হওয়া ব্যক্তিদের গ্রহণ করেনি। ফলে তিন দিন ধরে এই অচলাবস্থা চলছে।

শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সোনা মিয়া কালবেলাকে বলেন, সীমান্তের শূন্য রেখায় ৫ মাসের শিশুকে নিয়ে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নারীসহ ৯ জন নাগরিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্তে এখনো তীব্র উত্তেজনা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ জরুরি।

গয়টাপাড়া বিজিবি ক্যাম্পের সুবেদার শফিকুল ইসলাম কালবেলাকে জানান, পুশইন হওয়া ব্যক্তিরা এখনো শূন্য রেখায় দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কড়া পাহারায় রয়েছেন। মানবিক কারণে আমরা তাদের খাবার ও পানির ব্যবস্থা করছি, ওদিকে বিএসএফ তাদের বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পলিথিন দিয়েছে। তবে পুশইনের বিষয়ে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।

জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মো. ইমাম হোসেন কালবেলাকে বলেন, আটকে পড়া নাগরিকদের বিষয়ে বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। আশা করছি শীঘ্রই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে। তবে সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow