সুন্দরবনের সংকট ও অস্তিত্বের লড়াই

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষাদেয়াল হিসেবে কাজ করলেও আজ নিজেই বহুমাত্রিক সংকটে আক্রান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারে বনের উঁচু এলাকাও প্লাবিত হচ্ছে। করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কুমিরসহ ডিম থেকে বংশবিস্তারকারী প্রাণীর প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক চক্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণাক্ততার প্রভাবে সুন্দরীসহ বিভিন্ন বৃক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ছে, বদলে যাচ্ছে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। চোরা শিকার ও বন্যপ্রাণী পাচার সুন্দরবনের আরেকটি বড় হুমকি। লাভজনক অবৈধ বাণিজ্যের কারণে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী নির্বিচারে শিকার হচ্ছে। হরিণ ধরার জন্য পাতা মালা, ছিটকা, গলা ও হাঁটা ফাঁদে প্রায়ই বাঘ আটকা পড়ে মারাত্মকভাবে আহত বা নিহত হচ্ছে। নাইলন দড়ি কিংবা জিআই তারের তৈরি এসব ফাঁদ শরীরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা মৎস্যসম্পদ, ডলফিন ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য ভয়াবহ হু

সুন্দরবনের সংকট ও অস্তিত্বের লড়াই
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষাদেয়াল হিসেবে কাজ করলেও আজ নিজেই বহুমাত্রিক সংকটে আক্রান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারে বনের উঁচু এলাকাও প্লাবিত হচ্ছে। করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কুমিরসহ ডিম থেকে বংশবিস্তারকারী প্রাণীর প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক চক্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণাক্ততার প্রভাবে সুন্দরীসহ বিভিন্ন বৃক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ছে, বদলে যাচ্ছে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। চোরা শিকার ও বন্যপ্রাণী পাচার সুন্দরবনের আরেকটি বড় হুমকি। লাভজনক অবৈধ বাণিজ্যের কারণে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী নির্বিচারে শিকার হচ্ছে। হরিণ ধরার জন্য পাতা মালা, ছিটকা, গলা ও হাঁটা ফাঁদে প্রায়ই বাঘ আটকা পড়ে মারাত্মকভাবে আহত বা নিহত হচ্ছে। নাইলন দড়ি কিংবা জিআই তারের তৈরি এসব ফাঁদ শরীরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা মৎস্যসম্পদ, ডলফিন ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পায়নের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সুন্দরবনের অদূরে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশবিদদের উদ্বেগ রয়েছে। কয়লা পরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণের সম্ভাব্য প্রভাব নদী ও বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে আশঙ্কা করা হয়। রামপাল–মোংলা অঞ্চলে শিল্পায়নের বিস্তারে মাটি, পানি ও বাতাসে দূষণ বেড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পশুর নদীতে উচ্চ তাপমাত্রার পানি নিঃসরণ, কয়লার ছাই ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাটার সময় দূষিত পানি বনভূমিতে ঢুকে উদ্ভিদের ক্ষতি করছে। গবেষণায় নদীর পানিতে মাছের ডিম ও পোনার সংখ্যা এবং প্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, ফলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং স্থানীয় জেলেরা মাছের ঘাটতির কথা বলছেন। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে মানবিক সংকটও কম নয়। অধিগ্রহণ করা জমির আগের মালিকরা এককালীন ক্ষতিপূরণ পেলেও টেকসই বিকল্প জীবিকা পাননি। যে জমি একসময় তাদের সারা বছরের জীবিকার নিশ্চয়তা দিত, তা হারিয়ে অনেক পরিবার দারিদ্র্য ও বেকারত্বে নিমজ্জিত। পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে; তাদের সন্তানরাও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। এ ছাড়া বনদস্যুতা, কাঠ পাচার ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সুন্দরবনের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে।  আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি—সুন্দরবন দিবস। বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাসে এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)–এর উদ্যোগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দেশের প্রায় ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলন থেকেই ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করা হয় এবং তখন থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ধারাবাহিকভাবে এবার পালিত হচ্ছে ২৬তম সুন্দরবন দিবস। সুন্দরবন রক্ষায় এখন সময়োপযোগী ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, ১৪ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি শুধু প্রতীকী নয়—এটি গবেষণা, সংরক্ষণ বাজেট বৃদ্ধি এবং নীতিমালায় পরিবেশগত অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে। একই সঙ্গে ইসিএ (Ecologically Critical Area) এলাকায় নতুন শিল্প স্থাপন স্থগিত রাখতে হবে এবং যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রমের আগে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরিবেশ সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উজানের পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আন্তঃদেশীয় সমন্বয় অপরিহার্য। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে, যাতে জীববৈচিত্র্য, বনজ সম্পদ ও স্থানীয় জীবিকা সুরক্ষিত থাকে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি সুন্দরবনের গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও মিঠাপানির উৎসের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—এ বাস্তবতা মাথায় রেখে সমন্বিত নদী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। তৃতীয়ত, বননির্ভর মানুষের জন্য টেকসই বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাদের ওপর বনের চাপ কমে। মৌয়াল, জেলে ও বনজীবীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা, পরিবেশবান্ধব কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করলে বন সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পাবে। পাশাপাশি টেকসই পর্যটন নীতি প্রণয়ন করে স্থানীয় জনগণকে আয়বর্ধক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। চতুর্থত, দস্যুতা, চোরা শিকার ও বন অপরাধ দমনে কঠোর নজরদারি ও স্মার্ট পেট্রোলিং জোরদার করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, জিপিএস ট্র্যাকিং ও কমিউনিটি অংশগ্রহণভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনা কার্যকর করলে বিষপ্রয়োগ ও অবৈধ শিকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। স্থানীয় জনগণকে অংশীদার করে বন সুরক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সবশেষে, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকাকে প্লাস্টিকমুক্ত ইমপ্যাক্ট জোন হিসেবে ঘোষণা করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা আরোপ জরুরি। স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ, পুনর্ব্যবহার ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কঠোর নীতিমালা ও বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করলে এই বিশ্ব ঐতিহ্য অরণ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসইভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। সুন্দরবন বাঁচলে উপকূল বাঁচবে।  উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যদি পরিবেশগত ভারসাম্য ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় না আনা হয়, তবে সেই উন্নয়নই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনবে। সমন্বিত, বৈজ্ঞানিক ও প্রকৃতিবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি—নইলে এই প্রাকৃতিক সুরক্ষাদেয়াল এক গভীর বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। লেখক : পরিবেশ ও নারী অধিকারকর্মী।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow