পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর একটি হলো এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন (ENSO)। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) একে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী জলবায়ু ধরনগুলোর অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আর এই শক্তি যখন "সুপার" মাত্রায় পৌঁছায়, তখন তার পরিণতি হয় ঐতিহাসিক— খরা, দুর্ভিক্ষ, মহামারি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের রূপে। ২০২৬ সালে নতুন একটি শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। NOAA-র ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ "সুপার এল নিনো"-তে রূপান্তরের ২৫ শতাংশ সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে, এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট (IRI) পূর্ণ এল নিনো বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ৯৬ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত বলছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য প্রস্তুতির প্রশ্নটি এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
এল নিনো নামের জন্ম: সমুদ্রের কোলে এক শিশুর গল্প
"এল নিনো"; স্পেনীয় ভাষায় যার অর্থ "ছোট ছেলে" বা বিশেষভাবে "শিশু যিশু" (The Christ Child)। নামটি এসেছে পেরু ও ইকুয়েডরের সমুদ্র উপকূলের সেই জেলেদের কাছ থেকে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। NOAA-র তথ্য অনুযায়ী, সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই দক্ষিণ আমেরিকার এই জেলেরা লক্ষ্য করতেন যে কিছু বছরে ডিসেম্বর মাস নাগাদ প্রশান্ত মহাসাগরের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। উষ্ণ পানির আগমনে মাছের পরিমাণ কমে যেত, কারণ ঠাণ্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ হামবোল্ট স্রোত বাধাগ্রস্ত হতো। জেলেরা এই উষ্ণ স্রোতকে "এল নিনো দে নাভিদাদ" (El Niño de Navidad), অর্থাৎ "বড়দিনের শিশু" নামে ডাকতেন, কারণ এটি প্রায় প্রতি বছর ক্রিসমাসের সময়ে আসত। ব্রিটানিকার তথ্যমতে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে পেরুর উত্তরাঞ্চলের জেলেদের মধ্যে এই নামের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৯১ সালের একটি চিঠিতে পেরুতে এই ঘটনার প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে বর্ণনা করা হয় কীভাবে মরুভূমি সবুজ হয়ে যায় এবং অপরিচিত প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে।
পরে "এল নিনো দে নাভিদাদ" থেকে সংক্ষিপ্ত হয়ে নামটি শুধু "এল নিনো" হয়ে যায়। রয়্যাল মেটেওরোলজিক্যাল সোসাইটির বিবরণ অনুযায়ী, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঘটনাটি একটি আঞ্চলিক কৌতূহলের বিষয় হিসেবেই ছিল। বিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে স্থানীয় এই উষ্ণতার সঙ্গে বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ব্রিটিশ আবহাওয়াবিদ স্যার গিলবার্ট ওয়াকার ১৯২০-র দশকে "সাউদার্ন অসিলেশন" আবিষ্কার করেন, অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকা ও ভারত-অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলের মধ্যে বায়ুচাপের দোদুল্যমান পরিবর্তন। এরপরই এল নিনোকে এই বৃহত্তর বৈশ্বিক জলবায়ু চক্রের অংশ হিসেবে বোঝা যায় এবং পূর্ণ নামটি হয় "এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন" বা ENSO। একটি শিশুর নামে ডাকা সেই স্থানীয় সমুদ্র-স্রোত আজ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জলবায়ু শক্তিগুলির একটির পরিচয় বহন করছে।
সুপার এল নিনো: সংজ্ঞা ও সৃষ্টির প্রক্রিয়া
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ হওয়ার ঘটনা। NOAA-র সংজ্ঞা অনুযায়ী, যখন নিনো ৩.৪ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা তিন মাসের গড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে, তখন তাকে এল নিনো হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দুর্বল এল নিনোতে এই বিচ্যুতি ০.৫ থেকে ১.০ ডিগ্রি, মাঝারিতে ১.০ থেকে ১.৫ ডিগ্রি, এবং শক্তিশালী বা "সুপার" এল নিনোতে তা ২.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি ছাড়িয়ে যায়।সুপার এল নিনোর উৎপত্তি ঘটে যখন প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিক পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে বা থেমে যায়। এর ফলে গভীর সমুদ্রের ঠাণ্ডা পানি উপরে উঠে আসার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিশাল পরিমাণ উষ্ণ জলরাশি এশিয়া থেকে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে সরে আসে। AccuWeather-এর জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ পল পাস্টেলোক বলেছেন, এই প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত এবং শতাধিক মিটার গভীর এক বিশাল উষ্ণ জলের ঢেউ সমুদ্রের মধ্য দিয়ে পূর্বদিকে ধাবিত হয়। WMO স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা "সুপার" শব্দটিকে তাদের আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগে ব্যবহার করে না; তবে ENSO-এর "অত্যন্ত শক্তিশালী" মাত্রাই বাস্তবে এই ধারণাটিকে চিত্রিত করে। ১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত কেবলমাত্র পাঁচটি ঘটনাকে এই সর্বোচ্চ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে: ১৯৭২-৭৩, ১৯৮২-৮৩, ১৯৯১-৯২, ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬।
বৈশ্বিক প্রভাব: সভ্যতার ওপর এক জলবায়ু ধাক্কা
সুপার এল নিনোর প্রভাব কেবল আবহাওয়াগত নয়— এটি মানব সভ্যতার প্রতিটি স্তরকে আঘাত করে। কৃষিতে শস্য উৎপাদন হ্রাস পায়, খাদ্যমূল্য বাড়ে এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন হয়। পানি সম্পদের ওপর অভূতপূর্ব চাপ পড়ে; কারণ কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার অন্যত্র তীব্র খরা একই সময়ে ঘটতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে কলেরা, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে। IPCC-র মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলো বারবার উল্লেখ করেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিত হলে এল নিনোর তীব্রতা ও ঘন ঘন হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। UNDRR (জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ক কার্যালয়) এল নিনোকে বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ ক্ষতির অন্যতম প্রধান চালক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে ইতিহাসের ক্ষত
এল নিনোর ইতিহাস এই উপমহাদেশে রক্তাক্ত। ১৮৭৬-৭৮ সালের মহাদুর্ভিক্ষ ছিল সম্ভবত মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম জলবায়ু-সৃষ্ট বিপর্যয়গুলির একটি। জার্নাল অব ক্লাইমেটে প্রকাশিত সিং ও সহলেখকদের (২০১৮) গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে ওই বছরগুলোয় এশিয়া, ব্রাজিল ও আফ্রিকায় একযোগে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেয়, যা বিশ্বব্যাপী ৫ কোটিরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। ভারতেই ৬ থেকে ১০ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। গবেষক মাইক ডেভিস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Late Victorian Holocausts-এ দেখিয়েছেন যে ওই বিপর্যয়ে কলোনিয়াল অর্থনীতির ভূমিকা ছিল সমান দায়ী; দুর্ভিক্ষের মাঝেও ব্রিটিশ ভারত থেকে রেকর্ড পরিমাণ গম রপ্তানি বন্ধ হয়নি। ১৮৯৯ সালের দুর্ভিক্ষও ছিল এল নিনো-সৃষ্ট মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ব্যর্থতার ফল।
সেসময় নেতিবাচক ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (IOD) এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র করেছিল, যা ভারতের মৌসুমি বৃষ্টিপাতে মারাত্মক ঘাটতি ঘটিয়েছিল।১৯৮২-৮৩ সালের এল নিনো ছিল তখন পর্যন্ত রেকর্ড সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনা। ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হয়। ১৯৮৭ সালের এল নিনো ভারতে গুরুত্বপূর্ণ খরার কারণ হয়েছিল; সেই বছর দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে ফসল হ্রাস পায়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রমটি ছিল ১৯৯৭-৯৮ সালে। এই সুপার এল নিনো পর্বটি এখন পর্যন্ত যন্ত্রপাতি-নির্ভর পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী। কিন্তু একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা (সহ একটি নেচার জার্নালে প্রকাশিত এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের নিশ্চিত করা গবেষণা) দেখিয়েছে যে ওই বছর শক্তিশালী ইতিবাচক ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (IOD) এল নিনোর খরা-সৃষ্টিকারী প্রভাবকে কার্যকরভাবে নিরপেক্ষ করেছিল। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে অনুকূল বায়ুপ্রবাহ তৈরি হওয়ায় ভারতের সামগ্রিক মৌসুমি বৃষ্টিপাত সে বছর দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ১০২ শতাংশে পৌঁছায়; অর্থাৎ স্বাভাবিকের কাছাকাছি।
ScienceDirect-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র (২০২৪) স্পষ্ট করে বলেছে যে ১৯৯৭ সালে IOD-প্রণীত অভিসারী বায়ুপ্রবাহ ভারতের উপর এল নিনো-প্রণীত অবরোহী গতিকে প্রতিস্থাপন করেছিল, ফলে স্বাভাবিক মৌসুমি বৃষ্টিপাত নিশ্চিত হয়েছিল। ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোতে অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। এবারে IOD-এর ইতিবাচক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের নিচে ছিল এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তীব্র খরা দেখা দেয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে IOD সবসময় নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে না।
বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব: একটি বহুমাত্রিক ঝুঁকি
বাংলাদেশে এল নিনোর সঙ্গে খরা ও বৃষ্টিপাত ঘাটতির সম্পর্ক গবেষণায় প্রমাণিত। চৌধুরী (২০০৩) এবং হারুন-উর-রশিদ ও ইসলামে (২০০৭) গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এল নিনো বাংলাদেশের কৃষিতে পানি সংকট, মাটির ক্ষয় এবং চাষের মৌসুমে বিঘ্ন ঘটায়। ২০২৩ সালের এল নিনোর সময় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের মাঝামাঝিতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের তুলনায় ৬৭ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল; যা কৃষি উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল।
একটি সুপার এল নিনো ঘটলে বাংলাদেশে নিম্নলিখিত ঝুঁকিগুলো তীব্র হতে পারে:
খরা ও তাপপ্রবাহ: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যেখানে ইতিমধ্যে বৃষ্টিপাতের দীর্ঘমেয়াদি হ্রাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পিএমসিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা (২০২২) দেখিয়েছে যে বরেন্দ্র অঞ্চল এবং তিস্তা অববাহিকা বাংলাদেশের প্রধান খরা-প্রবণ অঞ্চল।
কৃষি উৎপাদন হ্রাস: চাল, পাট, ডাল ও সবজির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়লে তা দীর্ঘমেয়াদে আর্সেনিক-দূষণের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।
পানি সংকট ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি: পৃষ্ঠ পানির সংকট ও ভূগর্ভস্থ পানি হ্রাস একযোগে হলে খাদ্য উৎপাদন চাপের মুখে পড়বে, এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারদরে।
উপকূলীয় ঝুঁকি: এল নিনো পর্বে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনা কিছুটা কম থাকলেও, পোস্ট-মনসুন পর্বে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়তে পারে। লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ও সমুদ্রপৃষ্ঠ উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় কৃষি ও পানীয় জল সরবরাহে সংকট তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: খরা-পরবর্তী পানির গুণমান হ্রাস ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডের প্রকোপ বাড়াতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বাহক মশার বিস্তার ঘটাতে সহায়ক।
বর্তমান প্রস্তুতি: সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার বাস্তব মূল্যায়ন
বাংলাদেশ বিগত দুই দশকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (BMD) নিয়মিত আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রদান করছে এবং ENSO-পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করছে। স্পারসো (SPARRSO) দূর সংবেদন ও ভূ-স্থানিক তথ্য ব্যবহার করে ফসল ও পানি সম্পদ পর্যবেক্ষণে ভূমিকা রাখছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে। দেশে এখন হাজারেরও বেশি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উপকূলীয় অঞ্চলে অনেকটাই উন্নত হয়েছে।
তবে সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। খরা-কেন্দ্রিক পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি ব্যবস্থা এখনো ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা ব্যবস্থাপনার তুলনায় দুর্বল। মৌসুমি জলবায়ু পূর্বাভাসকে কৃষি পরিকল্পনা, সেচ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতির সঙ্গে সমন্বিত করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো অপর্যাপ্ত। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের কাছে সময়মতো পূর্বাভাস ও কারিগরি সহায়তা পৌঁছানো এখনো চ্যালেঞ্জের বিষয়। এছাড়া জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচিগুলির বেশিরভাগই সমুদ্র-স্তর উত্থান ও ঘূর্ণিঝড়কেন্দ্রিক, অন্তর্দেশীয় খরার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ পেয়েছে।
নীতিগত সুপারিশ: এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়
এক. সরকারকে একটি জাতীয় এল নিনো প্রস্তুতি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে যা কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত। WMO ও NOAA-র দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস ব্যবহার করে ছয় মাস থেকে এক বছর আগে থেকেই খাতওয়ারি প্রস্তুতি শুরু করা জরুরি।
দুই. বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও স্পারসোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে একটি জলবায়ু-তথ্যভিত্তিক কৃষি পরামর্শ সেবা (agro-advisory service) চালু করতে হবে, যা জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাবে।
তিন. কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে এল নিনো বছরে খরা-সহনশীল ধানের জাত, স্বল্প-সেচ-নির্ভর ফসল এবং বিকল্প চাষ পদ্ধতির বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও বীজ-সহায়তা প্রদান করতে হবে।
চার. উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পৃষ্ঠ সেচ পরিকাঠামো (খাল সংস্কার, জলাধার নির্মাণ) জোরদার করতে হবে যাতে ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা কমানো যায় এবং খরার সময় সেচ-সংকট প্রশমিত হয়।
পাঁচ. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে খরা-পরবর্তী পানিবাহিত রোগ ও তাপজনিত স্বাস্থ্য সংকটের জন্য আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশেষত উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা থাকতে হবে।
ছয়. খাদ্য মজুদ ব্যবস্থাপনায় জাতীয় সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এল নিনো পূর্বাভাস পাওয়ার পর দ্রুত খাদ্যশস্য মজুদ ও আমদানি পরিকল্পনা নেওয়া গেলে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সাত. স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জলবায়ু-ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করতে হবে যাতে কোন এলাকায় কোন ধরনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, তা আগে থেকেই চিহ্নিত থাকে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল প্রস্তুত থাকে।
আট. সাধারণ মানুষের মধ্যে এল নিনো ও এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয়, কমিউনিটি রেডিও, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার ও সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে সহজ ভাষায় প্রস্তুতি বার্তা প্রচার করা দরকার।
ইতিহাস সাক্ষী, সুপার এল নিনো কেবল একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়, এটি এক সভ্যতা-পরীক্ষক শক্তি। ১৮৭৭ সালের গ্রেট ড্রাউট যেমন কোটি মানুষের জীবন কেড়েছিল, ২০১৫-১৬ সালের সুপার এল নিনোও বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও পানি সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে ইতিহাসের দুর্ভোগ পুনরাবৃত্তি হওয়া অনিবার্য নয় যদি পূর্বাভাস, প্রস্তুতি এবং নীতি একসঙ্গে কাজ করে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে দুর্যোগ মোকাবিলায় সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমাতে পারে। সেই অর্জন ধরে রেখে এখন আমাদের প্রস্তুতির দিগন্ত আরও প্রসারিত করতে হবে; শুধু ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা থেকে নয়, খরা ও তাপপ্রবাহ থেকেও।
IPCC এবং WMO উভয়ই সতর্ক করেছে যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে চরম জলবায়ু ঘটনাগুলো আরও ঘন ঘন ও তীব্র হবে। বাংলাদেশকে এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই তার জলবায়ু-স্থিতিস্থাপকতার পরিকল্পনা সাজাতে হবে। প্রকৃতির কাছে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। সুপার এল নিনো আসবে তার নিজের শর্তে। আমাদের কাজ হলো আগে থেকে তৈরি থাকা।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী ও গবেষক, পর্যবেক্ষক,
গণতন্ত্র (সীমান্তহীন) প্যারিস, ফ্রান্স