সৈয়দ শামসুল হক এবং জলেশ্বরীর ছোটগল্প

সৃষ্টিশীলতার বৈচিত্র্য ও বৈভবে সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লেখক। সৃজনশীল অন্যান্য মাধ্যমে যেমন উপহার দিয়েছেন অনেক সৃষ্টিকর্ম তেমন ছোটগল্পও লেখেছেন শতাধিক। এসব গল্পের একটি বড় জায়গা দখল করে আছে গ্রাম-বাংলা। তিনি শৈশবে যে অঞ্চলে বেড়ে উঠেছিলেন সেটি একটি মহকুমা শহর। নামে শহর হলেও তা ছিল আসলে গ্রামেরই সামান্য উন্নত সম্প্রসারণ। এ-জন্য জলেশ্বরীকে নিয়ে লেখা সব গল্পই গ্রামের গল্প। সৈয়দ হক বাংলার যে পল্লি অঞ্চলে তার শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন তা ছিল উন্নয়নের স্পর্শবর্জিত ও দারিদ্র্যে কণ্টকাবৃত। গ্রামকেন্দ্রিক তার গল্পগুলোর মধ্যে দেখা যায় ক্ষুধা, অভাব ও জীর্ণ-শীর্ণ মানুষের সংগ্রামমুখর ছবি; তবুও এ-ধরনের গল্পে লেখকের সাফল্য ঈর্ষণীয়। গ্রামের মানুষের অন্তর্জীবনে ঢুকে লেখক বের করে এনেছেন সেই জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও জটিলতা। অসংখ্য উত্তীর্ণমানের ছোটগল্প লেখা হয়েছে গ্রামীণ পটভূমি-নির্ভর। তবুও ইতিহাসের এই বহু ভিড় থেকে সৈয়দ হককে সহজেই চেনা যায় তার গ্রামনির্ভর গল্পগুলোর জন্য। বিশেষত জলেশ্বরীর গল্পগুলোতে স্বতন্ত্র লেখনশৈলী ব্যবহারের জন্য আলাদা হয়ে গেছেন ছোটগল্পের বহুচর্চিত কিন্তু ধ্রুপদি

সৈয়দ শামসুল হক এবং জলেশ্বরীর ছোটগল্প

সৃষ্টিশীলতার বৈচিত্র্য ও বৈভবে সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লেখক। সৃজনশীল অন্যান্য মাধ্যমে যেমন উপহার দিয়েছেন অনেক সৃষ্টিকর্ম তেমন ছোটগল্পও লেখেছেন শতাধিক। এসব গল্পের একটি বড় জায়গা দখল করে আছে গ্রাম-বাংলা। তিনি শৈশবে যে অঞ্চলে বেড়ে উঠেছিলেন সেটি একটি মহকুমা শহর। নামে শহর হলেও তা ছিল আসলে গ্রামেরই সামান্য উন্নত সম্প্রসারণ। এ-জন্য জলেশ্বরীকে নিয়ে লেখা সব গল্পই গ্রামের গল্প। সৈয়দ হক বাংলার যে পল্লি অঞ্চলে তার শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন তা ছিল উন্নয়নের স্পর্শবর্জিত ও দারিদ্র্যে কণ্টকাবৃত। গ্রামকেন্দ্রিক তার গল্পগুলোর মধ্যে দেখা যায় ক্ষুধা, অভাব ও জীর্ণ-শীর্ণ মানুষের সংগ্রামমুখর ছবি; তবুও এ-ধরনের গল্পে লেখকের সাফল্য ঈর্ষণীয়। গ্রামের মানুষের অন্তর্জীবনে ঢুকে লেখক বের করে এনেছেন সেই জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও জটিলতা।


অসংখ্য উত্তীর্ণমানের ছোটগল্প লেখা হয়েছে গ্রামীণ পটভূমি-নির্ভর। তবুও ইতিহাসের এই বহু ভিড় থেকে সৈয়দ হককে সহজেই চেনা যায় তার গ্রামনির্ভর গল্পগুলোর জন্য। বিশেষত জলেশ্বরীর গল্পগুলোতে স্বতন্ত্র লেখনশৈলী ব্যবহারের জন্য আলাদা হয়ে গেছেন ছোটগল্পের বহুচর্চিত কিন্তু ধ্রুপদি ধারা থেকে। জলেশ্বরীর গল্পগুলো-র (১৯৮৯) লেখনশৈলী বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ হকের এক অনন্য উদ্ভাবন। জলেশ্বরী হলো সৈয়দ হক কর্তৃক কল্পিত বাংলাদেশের একটি জনপদ যেখানকার প্রেক্ষাপটে তিনি অনেক ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। আসলে জলেশ্বরী হলো সৈয়দ হকের জেলা শহর কুড়িগ্রামের আদলে তৈরি এক কাল্পনিক জনপদ, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই। জলেশ্বরীর নানা ক্ষুদ্র জনপদ মান্দারবাড়ি, ভেলাকোপা, শকুনমারী, বুড়ির চর, কাঁঠালবাড়ি, হাওয়ার হাট, উলিপুর, বল্লার চর, রাজার  হাট এবং জলেশ্বরীর সীমান্তবর্তী কুচবিহার, দীনহাটা, আসাম প্রভৃতি স্থান এই পর্যায়ের গল্পগুলোতে তৈরি করেছে ভৌগোলিক সীমানা। পরিচিত বিষয়ের মধ্যে আনতে চেয়েছিলেন অচেনা একটি সুর, যে অচেনা সুরের প্রাতিস্বিকতা সৃষ্টিতে তিনি সফল। জলেশ্বরী সামনে চলে এলে পাঠকের মধ্যে তৈরি হয় অজানাকে জানার একটি কৌতূহল, দুর্মর আগ্রহ, শৈল্পিক রহস্য ও আড়াল। তাছাড়া বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় অনেক লেখক তৈরি করে নিয়েছেন কল্পিত জনপদ। যেমন উইলিয়াম ফকনারের (১৮৯৭-১৯৬২) ইয়ট্নাপটাফা, আর. কে. নারায়ণের (১৯০৬-২০০১) মালগুড়ি, হুয়ান রুলফোর (১৯১৮-১৯৮৬) কোমালা, গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের (১৯২৭-২০১৪) মাকোন্দো- তেমনই সৈয়দ হকের জলেশ্বরী। জলেশ্বরী তৈরি করে তিনি আলাদা হয়ে গেলেন তার কাল ও সময়ের অনেক বাঙালি লেখক থেকে। জলেশ্বরী জনপদ নির্বাচন করে তিনি যেমন দূরদর্শিতার পরিচয় দেন তেমনই জলেশ্বরীর উপাখ্যান লেখার জন্য নির্বাচিত শৈলীও তাঁকে স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তায় ভূষিত করে। বাংলা সাহিত্যে জলেশ্বরী বিষয়ে তার এই কৃতিত্বে তিনি মৌলিকত্বের দাবিদার।

২.
সৈয়দ হকের গল্প রচনার মধ্যপর্বটা (১৯৭০ থেকে ২০০০ পর্যন্ত) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ-পর্বেই গল্প রচনার প্রকরণ-শৈলী একটি বিশেষ দিকে বাঁক নেয়। যে-বাঁক ফেরাটা তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই পরিবর্তন মধ্যপর্বের প্রথম গ্রন্থ প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮১) দিয়ে নয়। বাঁক ফেরাটা শুরু হয় জলেশ্বরীর গল্পগুলো (১৯৮৯ এবং নতুন গল্প যুক্ত হয়ে ২০০৮) দিয়ে। 
কেন কুড়িগ্রাম জলেশ্বরীতে রূপান্তরিত হলো তার উত্তর নিশ্চয় ছিল সৈয়দ হকের কাছে। জলেশ্বরী সাহিত্যে অত্যন্ত মজবুত একটি আসন করে নেয়। তাঁকে নাগরিক জীবনের কথাকার বলা হলেও আসলে তিনি জলেশ্বরীর কথাকারও। অন্য সব বিশেষণ ছাড়িয়ে তাঁর নামের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে ‘জলেশ্বরীর কথাকার’ অভিধা। সফল কবিতা পড়লে যেমন আলাদা ব্যঞ্জনা হৃদয়ে অনুভব করা যায়, সার্থক চিত্রকরের ছবির পৃথক চিত্রভাষা যেমন চোখ ও মনে লেগে থাকে, তেমনই জলেশ্বরীর গল্পের আলাদা শৈলীর কারণে এক ব্যতিক্রমী লেখকই পাঠকের বোধে জেগে ওঠেন। জলেশ্বরী কুড়িগ্রামের আদল হলেও শেষপর্যন্ত তা পরিণত হয় সমগ্র বাংলাদেশেরই প্রতিরূপে।


তিনি গল্পের শরীরে করেছেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। শিল্পের ইতিহাস আসলে আঙ্গিক বিবর্তনের ইতিহাস। লাতিন আমেরিকান গল্পকার হোর্হে লুইস বোর্হেস (১৮৯৯-১৯৮৬) আখ্যানকে অস্বীকার করে তত্ত্ব বা গোলকধাঁধায় পরিণত করেন গল্পকে। তবে সৈয়দ হক লাতিন এই কথাশিল্পীর মতো অত বিদ্রোহাত্মক নন, এ ব্যাপারে তিনি মধ্যপন্থা নীতির অনুসারী। তিনি গল্প নিয়ে নিরীক্ষা চালালেও গল্পের শরীরে মৌলিক কোনো পরিবর্তনের পক্ষপাতী নন; বর্তমানে কাহিনিহীন যে-গল্প লেখার চল গল্পকারদের কারো কারো লেখায় পাওয়া যায়, সৈয়দ হক নিরীক্ষার ক্ষেত্রে অতটা অগ্রসর হওয়ার পক্ষপাতী নন। গল্পের শরীর নিয়ে তিনি ভাবেন, পরিবর্তন আনেন- সবই করেন গল্পকে ঠিক রেখে। গল্পের শরীরে গল্প থাকবে না অত বড় পরিবর্তনের পক্ষে তিনি নন; তবে তিনি রূপক-প্রতীককে সাফল্যের সাথে ব্যবহার করেছেন গল্পে। তার নিরীক্ষার যে ফলাফল প্রথমেই পাঠকের চোখে ধরা পড়ে তা হলো, যে-সমস্ত গল্পে বর্ণনা বা বিশ্লেষণ বেশি থাকে সেগুলোকে তিনি ‘গল্পপ্রবন্ধ’ বলতে চান, কখনও কখনও ‘গল্পপট’। বোর্হেসেরও বহু গল্পকে প্রবন্ধ বলে ভুল হতে পারে, আসলে এগুলো ছদ্ম বা নকল প্রবন্ধ রূপে এক একটি বুদ্ধিদীপ্ত গল্প। জলেশ্বরীর গল্প বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন ‘আমরা’ প্রেক্ষণবিন্দু। অর্থাৎ পুরো গল্পটি বর্ণনা করেছেন ‘আমরা’ শব্দ ব্যবহার করে। এই আমরা নামক সামূহিক সত্তা উত্তম পুরুষের মতো ব্যবহৃত হয়েছে গল্পে, লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণের সঙ্গে জলেশ্বরীর অধিবাসীদের দৃষ্টিকোণ মিশ্রিত হয়ে গড়ে উঠেছে আমরা সামূহিক যৌথ দৃষ্টিকোণ এবং এই দৃষ্টিকোণ থেকে উন্মোচিত হয়েছে জলেশ্বরীবাসীর ভাঙাগড়াময় রূপান্তরশীল জীবনপ্যাটার্ন। 


জলেশ্বরীর গল্পে সংলাপ খুব কম ব্যবহার করা হয়েছে। গল্পের বর্ণনাকারী হিসেবে বহুবচনের ব্যবহার গল্পকে একটি ভিন্নমান দিলেও বহু বর্ণনাকারীর সমবায়ী উল্লেখ সৃষ্টিশীল সাহিত্যের জন্য একনায়কতন্ত্রের মতো। একের যে সিদ্ধান্ত বহুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তাতে অন্যদের চিন্তার স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যায়। সাহিত্য চিন্তাকে প্রকাশ করে- অন্যের চিন্তা বা মতের প্রকাশকে ব্যাহত করে না। এ-ছাড়া গল্প শুরুর আগে কয়েকটি গল্পে তিনি ব্যবহার করেছেন ভূমিকার মতো মুখবন্ধ। কিছু বর্ণনার মাত্রা হয়েছে দীর্ঘ, প্রাতিষ্ঠানিক রীতিকে অমান্য করেছেন- অবশ্য এই বিদ্রোহ-ই শেষপর্যন্ত তাঁর গল্পকে করেছে রক্ষা, তাঁকে বাঁচিয়েছে প্রথাগত গল্প-বলা রীতির দাসত্ব থেকে। তিনি হয়তো পুরো বিদ্রোহী হতে পারেন নি, কিন্তু আংশিক যে-কাজ শুরু করেছেন তার গুরুত্ব কম নয়। এ-কথা জানতেন, পুরনো রীতির দাসত্ব ও অনুকরণে সৃষ্টি করা যায় না নতুন কিছু। গল্পে ব্যবহারের জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন কিছু প্রতীক, যেগুলো বারবার ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর গল্পে এবং বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে গল্পের শরীরে। এমন কিছু প্রতীক হলো, (ক) জলেশ্বরী, (খ) বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন ও তাঁর সুযোগ্য সন্তান শামসুদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধের ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তোলার জন্য এ-দুজনও বারবার গল্পে এসেছেন (গ) জ্যোৎস্না। অসংখ্য গল্পে সৈয়দ হক ব্যবহার করেছেন এই প্রতীক, এটা তাঁর গল্পের পটভূমির মধ্যে যুক্ত করেছে বাড়তি সৌন্দর্য, (ঘ) আধকোষা। এটি জলেশ্বরীর নদী। এই প্রাকৃতিক অনুষঙ্গটি ব্যবহার করেছেন অসংখ্য গল্পে (ঙ) শাহ সৈয়দ কুতুবুদ্দিনের মাজার। ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে জলেশ্বরীর প্রায় সমস্তÍ গল্পে ব্যবহৃত হয়েছে এটি (চ) সৈয়দ আবদুস সুলতান। ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে গল্পের শরীরে পৌনঃপুনিক উল্লেখিত ও (ছ) হানিফ ভাইয়ের হোটেল বা মিষ্টির দোকান- বহু গল্পে আড্ডার কেন্দ্র হিসেবে ঘুরে ফিরে ব্যবহৃত হয়েছে এই হোটেল।

অসংখ্য শ্রেণি-পেশার মানুষ ভিড় করেছে সৈয়দ হকের কথাসাহিত্যে, বিশেষত গ্রামবিষয়ক ছোটগল্পে। ভবিষ্যৎবক্তা, দোকানদার, চা বিক্রেতা, কাপড় বিক্রেতা, আলু-পটল বিক্রেতা, দিনমজুর, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, গোর্জোদার, লাঠিয়াল, গাড়োয়ান, শিক্ষক, মাঝি প্রভৃতি শ্রেণি-পেশার মানুষকে পাওয়া যায় সৈয়দ হকের ছোটগল্পে। এদের প্রত্যেকেই তাদের বৈশিষ্ট্য ও ভূমিকা নিয়ে গল্পগুলোতে ভাস্বর এবং প্রত্যেকে যেন বাঙালির জীবন্ত  সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি। তিনটি গল্পে ঔপনিবেশিক শাসনামলে আন্দোলন সংগ্রাম ও মানুষের হত হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে, গল্পগুলো হলো নেপেন দারোগার দায়ভার, সোনার মা বর্গুন বিবি ও জ্যোৎস্নায় নুরলদীনের নিঃসঙ্গতা। ঔপনিবেশিকদের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন স্বনামধন্য কৃষ্ণাঙ্গ ধর্মযাজক ডেসমন্ড টুটু, 
ঔপনিবেশিকরা যখন আমাদের দেশে এল, তখন তাদের হাতে ছিল বাইবেল আর আমাদের হাতে জমি। ওরা বলল চোখ বন্ধ করো, প্রভুকে ভাবো। আমরা চোখ বন্ধ করলাম। তারপর চোখ খুলে দেখি আমাদের হাতে বাইবেল আর ওদের হাতে জমি। 
এই তিনটি গল্পের মধ্যে প্রথম ও শেষোক্ত গল্প দুটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালপর্ব নিয়ে লেখা এবং সোনার মা বর্গুন বিবি গল্পটি পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনপর্বের। নেপেন দারোগার দায়ভার গল্পটির সূচনা-বিন্দু শহরে হলেও মূল পটভূমি গ্রাম।

জলেশ্বরী একটি খরাপীড়িত অঞ্চল, এখানকার মানুষের বড় একটি অংশ দরিদ্র, যদিও বর্তমানে মানব-উন্নয়ন সূচক ও অর্থনৈতিক নানা পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে সে দারিদ্রের প্রকোপ নির্মূল হওয়ার পথে। তবুও বৃহত্তর রংপুরের কৃষকের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মঙ্গা শব্দটি। এখন এর প্রকোপ নেই বললেই চলে, তবে মঙ্গার স্মৃতি এখনও এ-অঞ্চলের মানুষ ভুলতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যশস্যের বেশিরভাগ উৎপাদন হয় উত্তরাঞ্চল থেকে, এ-অঞ্চলকে বলা হয় বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার। একটা সময়ে বছরের আশ্বিন-কার্তিক মাসে কাজের অভাবে কৃষি শ্রমিক কিংবা কৃষিজীবী মানুষ সম্পূর্ণ বেকার হয়ে বসে থাকত। তাদের ঘরে সঞ্চিত খাদ্য শেষ হয়ে এলে তারা মহাজন, জোতদার কিংবা দাদন ব্যবসায়ীর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াত শস্য কিংবা নগদ অর্থ কর্জের জন্য, আর একবার মহাজন, জোতদার বা দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ করলে দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক শ্রম বা ফসলের ভাগ দিয়ে ঋণ শোধ করতে হতো। ফলে এই দরিদ্র মানুষেরা ক্রমেই দুর্বিষহ অবস্থায় পতিত হতো। বৃহত্তর রংপুরে এই নীরব দুর্ভিক্ষকেই মঙ্গা বলে। সৈয়দ হকের কিছু গল্পে এই খরা ও অভাবের নির্মম-কঠিন রূপ প্রকাশিত। খরার একটি কঠোর রূপ দেখা যায় প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান গল্পে। নিষ্ঠুর, কঠিন, রূঢ় ও দয়ামায়াহীন এক প্রতিবেশের চিত্র পাওয়া যায় এখানে। ক্ষুধার্ত যেখানে মানবিক সহানুভূতি প্রত্যাশা করে সেখানে ক্ষুধা নিয়ে একদল লোক মেতে উঠে জঘন্য বেনিয়াবৃত্তিতে। এ-গল্প শুধু একটি গ্রাম বা জনপদেরই প্রতিনিধিত্ব করে না বরং বিশ্ব ভূগোলের ক্ষুধা পরিস্থিতির নির্মম চিত্রও তুলে ধরে। মনোহর একজন দিনমজুর ও প্রধান চরিত্র মনোহরকে পাওয়া যাচ্ছে না গল্পে। একজন দিনমজুর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই গ্রামীণ পরিপার্শ্ব তার সাথে উঠে এসেছে। দরিদ্রতার প্রকট রূপ এই গল্পে ভাস্বর, সব মানুষই চায় তার সন্তান যেন ভালোভাবে খেয়ে-পরে বড় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু অভাবের কারণে মনোহরের সংসারে নিত্য অনটন, নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। অভাব ও দরিদ্রতার বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য দ্বিতীয়বার স্থান পরিবর্তন করে সে। এক ক্ষুধার্ত যুবকের গল্প বুকের মধ্যে আশাবৃক্ষ। গল্পের প্রধান চরিত্র ক্ষুধার্ত যুবক যখন হানিফ ভাইয়ের দোকানে আসে তখন দোকান বন্ধ করার সময় হয়ে গেছে। তাকে দেখেই হানিফ বুঝতে পেরেছে এর পকেটে কোনো পয়সা নেই । পয়সাই তাহলে সব! জলেশ্বরীর এত জাগ্রত যে মাজার, বাবা কাউকে নিরাশ করেন না, খালি হাতে ফেরান না, এ-সবই গুজবকথা। বাবা কুতুবউদ্দিনের মাজারেও হাত তুলে কোনো লাভ নেই যদি না দশ-বিশ টাকা তার দানের বাকসে না দেওয়া যায়। হানিফও তাকে সাহায্য না করে বিদায় করার চেষ্টা করে। যুবকটি যে অপ্রকৃতিস্থ আচরণ করে সেটা তার ক্ষুধার জন্য। তার মধ্যবিত্ত মানসিকতার জন্য সে ক্ষুধার কথা কাউকে বলতেও পারে নি, খাবার চাইতেও পারে না কারো কাছে ।

বাঙালি মুসলমান পরিবারে সৈয়দ হকের জন্ম, ফলে এ-সমাজের গড়ন ও বিকাশের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত স্বচ্ছ তাঁর কাছে। এ সমাজের জীবন-যাপন রীতি, প্রাত্যহিকতা, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয় অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে উঠে এসেছে এই কথাকারের কলমে। কথাসাহিত্য নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে জারিত না হলে তা বিশ্বাসযোগ্য মাত্রা পায় না। এ-জন্য নিবিড় জীবনাভিজ্ঞতা লেখকের জন্য প্রাথমিক শর্ত। সৈয়দ হকের শৈশবের পুরোটা এবং কৈশোরের কিছুটা সময় কেটেছে গ্রামে, শুধু তা-ই নয়, সারাজীবন গ্রামের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ফলে এ অঞ্চলের গ্রামের জীবন ও সংস্কৃতির জ্ঞান ছিল তাঁর নখদর্পণে। জলেশ্বরীর প্রতিটি গল্পে মূর্ত হয়েছে এ অভিজ্ঞতারই বাস্তব রূপ।


৩.
কাহিনি বর্ণনায় উপরি কাঠামোয় সৈয়দ হক ব্যবহার করেছেন ‘ছাঁচ’। জলেশ্বরীর গল্পে এই ছাঁচ হয়েছে ‘আমরা’ সমষ্টিবাচক শব্দ ও জনপদ হিসেবে ‘জলেশ্বরী’ শব্দটি স্বয়ং। অসংখ্য গল্পে তিনি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করেছেন এমন বহু ছাঁচ যা কাহিনি নির্মাণকে দিয়েছে নতুনত্বের ব্যঞ্জনা। এই ছাঁচের ব্যবহারের জন্য কাহিনিকে মনে হয় অগতানুগতিক ও স্বতন্ত্র। তাঁর বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই ছিল নিরন্তর নিরীক্ষা প্রবণতা, সন্তুষ্ট থাকতে পারেন নি গল্পের প্রথাগত বয়ান-রীতিতে। গল্প বলার পদ্ধতির নামকরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নামের ব্যবহার থেকেও এটি প্রমাণিত হয়। কখনও গল্প বলাকে বলেছেন ‘সৃজনশীল সাংবাদিকতা’, কখনও বলেছেন ‘গল্পপ্রবন্ধ’ আবার কখনও ‘গল্পপট’ অর্থাৎ নিরন্তর ভাংচুর ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে তাঁর গল্পচিন্তা। যেন তিনি খানিকটা সন্দিহান যে বাঙালি পাঠক খুব বেশি নিরীক্ষাধর্মী গল্পকে না জানি কেমনভাবে নেয়। অথচ বিশ্বগল্পের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার দুর্গম পথে হেঁটেছেন গল্পকাররা। লাতিন কথাসাহিত্যের খোঁজ নিলে বিস্মিত হতে হয়। গল্পের শরীরে কোনো পরীক্ষা করতেই যেন বাদ রাখেন নি তারা। লাতিন ছোটগল্প বিশ্বছোটগল্পের ইতিহাসে উৎকর্ষের অনন্য উদাহরণ। আলেহো কার্পেন্তিয়ার (১৯০৪-১৯৮০), হুয়ান রুলফো, হোর্হে লুইস বোর্হেস ও গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ কথাসাহিত্য তথা ছোটগল্পে সৃজনশীল নিরীক্ষার যে ছাপ রেখেছেন তা বিস্ময়কর। সেই তুলনায় সৈয়দ হকের নিরীক্ষা খুবই মামুলি ধরনের। তবুও এই নিরিখের বিবেচনায় একটি সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে যে সৈয়দ হক একজন প্রকরণ-সচেতন কথাকার। সাহিত্যের প্রচলিত ঘরানার পুনরাবৃত্তিমূলক রচনায় গাঁ ভাসিয়ে দেন নি, ছিলেন একজন অভিযাত্রীর মতো, আবিষ্কার করতে চেয়েছেন একেরপর এক নতুন ভূখণ্ড। গল্পকারের তাস (১৯৫৪) গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বুকের মধ্যে আশাবৃক্ষ (২০১৪) পর্যন্ত অতিক্রান্ত হয়েছে ষাটটি বছর। সৈয়দ হকের গল্পের এই বিশ্লেষণ থেকে বলা যায় তাঁর গল্পকার জীবনের প্রাথমিক পর্ব (১৯৫৪ থেকে ১৯৬৯) ও মধ্যপর্ব সৃষ্টিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই দুটি পর্বেই লিখতে পেরেছিলেন সাহিত্যিক জীবনের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলো। আবার প্রাথমিক ও মধ্যপর্ব এ দুটির মধ্যে তুলনায় মধ্যপর্ব উৎকর্ষের দিক থেকে অধিক ফলদায়ক। মধ্যপর্বে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮১) ও জলেশ্বরীর গল্পগুলো তাঁর সেরা গল্পগ্রন্থ। এই গ্রন্থ দুটিতে আছে এমন কিছু ছোটগল্প যা সৈয়দ হককে গল্পকার হিসেবে অমর করে রাখবে। প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান গল্পগ্রন্থের গ্রন্থ শিরোনামের গল্প ছাড়াও পূর্ণিমায় বেচাকেনা, নেপেন দারোগার দায়ভার ও মানুষ গল্প অনন্য সৃষ্টিশীলতার উদাহরণ। তাঁর গল্পকার জীবনের মধ্যপর্বের পুরোটা সময়ে ব্যস্ত ছিলেন জলেশ্বরীপর্ব নির্মাণে। জলেশ্বরী নিয়ে কথাসাহিত্য রচনার সময় তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন এক স¦তন্ত্র দিগন্তকে রূপদান করতে যাচ্ছেন। তাই এ পর্বে সবচেয়ে বেশি লিখেছেন জলেশ্বরীকে নিয়ে। এগুলোর মধ্যে কিছু গল্পের স্থায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল- ভালো করে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে, জলেশ্বরীর দুই সলিম, কোথায় ঘুমোবে করিমন বেওয়া, সাহেবচান্দের ঈদ-ভোজন ও জমিরুদ্দিনের মৃত্যু বিবরণ প্রভৃতি অত্যন্ত শক্তিশালী গল্প। অপরদিকে প্রথমপর্বে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে আনন্দের মৃত্যু (১৯৬৮) একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এ-গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে কয়েকটি স্থায়িত্ব পাওয়ার মতো অনন্য গল্প; যেমন নাম, গ্রন্থ শিরোনামীয় আনন্দের মৃত্যু, পরাজয়ের পর, কালামাঝির চড়নদার ও যদি জানতে চান প্রভৃতি। এছাড়া প্রথম গল্পগ্রন্থের তাস গল্পটি, আবদুল খালেকের আবার রাজনীতি এবং আপদের বৃষ্টি, করুণার বৃষ্টি গল্পও তাঁর অনন্য সৃষ্টি।

৪.
সৈয়দ হক নিরীক্ষাপ্রবণ শিল্পী হওয়ায় প্রথাগত গল্পবিচারের রীতি-পদ্ধতি দিয়ে সব সময় বিচার করা যায় না তাকে। গল্প বয়ানে অতিকথন আছে, কিছু গল্প শুরুর আগে তিনি দিয়েছেন এক বিস্তারিত গৌরচন্দ্রিকা। জলেশ্বরীর দুই সলিম, ভালোবাসা ও আপদের বৃষ্টি ও করুণার বৃষ্টি গল্প দীর্ঘ ভূমিকার পর শুরু হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক নিরিখে এগুলো রীতি বহির্ভূত হলেও সৃষ্টিশীলতার বৈচিত্র্যময় দিগন্তে তা অপরিসীম সম্ভাবনার দ্যোতক। এই দিগন্ত ছুঁয়ে দেখার স্পর্ধা না-দেখালে অধরা থেকে যায় নিজস্বতা সৃষ্টির প্রয়াস। সৈয়দ হক কখনও থেমে ছিলেন না, থেমে ছিলেন না নতুনত্ব সৃষ্টির অপ্রথাগত দায় থেকে। এই দায়ের পীড়ন তিনি বোধ করেছেন গল্প সৃষ্টির প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত, তাই তো কখনই ক্লান্ত বোধ করেন নি নিরীক্ষায়। তার শৈলী, শিল্পিতা, রচনারীতি- বহু আখ্যানেই ভিন্ন, মেলে না একটার সাথে আরেকটার। পূর্ববঙ্গকেন্দ্রিক ছোটগল্প বর্গের)  ঐতিহাসিক বিকাশে, নিরীক্ষাবিষয়ক অগ্রযাত্রার ধারায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর (১৯২২-১৯৭১) পর যে কয়টি নাম আসবে তাঁদের অন্যতম সৈয়দ শামসুল হক। ইউরোপমুখী শিল্পরীতিতে আকণ্ঠ নিমগ্ন থেকে, দক্ষিণ এশীয় বা এ-অঞ্চলে প্রচলিত গল্পবলার নিজস্ব ধারা থেকে প্রায় কোনো আয়ুধ না নিয়েও তিনি গ্রামের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে যেভাবে তুলে এনেছেন তার গল্পে তা তুলনাহীন। তিনি সম্ভবত সেই অনন্য ব্যতিক্রমী যিনি বাংলা সাহিত্যের ভূগোলে সৃষ্টি করেছেন আলাদা এক জনপদ।

সৈয়দ হকের গল্পে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে উঠে এসেছে। তার গল্পের বয়ানরীতি ও চরিত্রের মধ্যে পাওয়া যায় একজন দরদি শিল্পীর মমতার ছাপ। নির্মোহের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে, আবার কখনও সব আড়াল ভেঙে দিয়ে তিনি বুনে চলেন গল্পের ছক। প্রথাকে ভাঙার এক অনুচ্চকিত প্রত্যয় ধীরলয়ে কিন্তু বিরতিহীন থেকেছে গল্প জীবনের দ্বিতীয় পর্ব অর্থাৎ জলেশ্বরী হতে। এই ব্যতিক্রমী নিষ্ঠায় ছোটগল্প অর্জন করেছে আলাদা এক মাত্রা- যা বাংলা সাহিত্যে একান্ত সৈয়দ হকীয়।।


লেখক পরিচিতি

খালিদ সাইফ জন্ম ১৪ চৈত্র ১৩৮১ বঙ্গাব্দ, ঈশ্বরদী, পাবনা। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রাম ও ঈশ্বরদী শহরে। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা সেখানেই। উচ্চমাধ্যমিক ঢাকায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। খণ্ডকালীন শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু। বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক। কর্মস্থান গুলশান। ভ্রমণ ও বই পড়তে ভালোবাসেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ
কবিতা : প্রজ্ঞার শহরে একদিন (২০০৬)
প্রবন্ধ : নির্মাণ ও বিনির্মাণ (২০০৭)
অনুবাদ : জালালুদ্দিন রুমি : প্রেমের কবিতা (২০০৮)
কিশোর উপন্যাস : পাহাড়পুরের গুপ্তধন (২০১২)
ছোটগল্প: সুর ও অসুরের গল্প (২০১৭)
অনুবাদ : জালালুদ্দিন রুমি : নির্বাচিত কবিতা (২০১৮)
জীবনী : আল রাজি : নাস্তিক না আস্তিক (২০২৪)
গবেষণা : সৈয়দ শামসুল হকের ছোটগল্প : বৈচিত্র্য ও শিল্পশৈলী (২০২৫)


 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow