সোনার বাংলা: স্বপ্ন ছিল, পথ হারালাম কোথায়

বাংলাদেশের জন্ম একটি স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্ন ছিল শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়, একটি মানুষের মুক্তি, একটি জাতির আত্মমর্যাদা, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদার রাষ্ট্র নির্মাণ। ১৯৭১ সালে যারা জীবন দিয়েছিলেন, যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছিলেন, যারা সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন, তারা নিশ্চয়ই এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পত্তি হবে না। রাষ্ট্র হবে মানুষের, আর ক্ষমতা হবে জনগণের কাছে একটি আমানত। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে আমরা যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন আনন্দের পাশাপাশি একটি গভীর প্রশ্নও আমাদের তাড়া করে। এত সম্ভাবনা, এত পরিশ্রমী মানুষ, এত প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন এখনও সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারেনি? কোথায় আমাদের ভুল ছিল? কারা আমাদের পথ আটকে দিয়েছে? আর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, আমরা নিজেরাই কি কখনো নিজেদের পথের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াইনি? বাংলাদেশের ইতিহাস তাই শুধু সাফল্যের ইতিহাস নয়, এটি অসম্পূর্ণতারও ইতিহাস। এই অসম্পূর্ণতা কোনো এ

সোনার বাংলা: স্বপ্ন ছিল, পথ হারালাম কোথায়

বাংলাদেশের জন্ম একটি স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্ন ছিল শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়, একটি মানুষের মুক্তি, একটি জাতির আত্মমর্যাদা, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদার রাষ্ট্র নির্মাণ।

১৯৭১ সালে যারা জীবন দিয়েছিলেন, যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছিলেন, যারা সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন, তারা নিশ্চয়ই এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পত্তি হবে না। রাষ্ট্র হবে মানুষের, আর ক্ষমতা হবে জনগণের কাছে একটি আমানত।

কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে আমরা যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন আনন্দের পাশাপাশি একটি গভীর প্রশ্নও আমাদের তাড়া করে। এত সম্ভাবনা, এত পরিশ্রমী মানুষ, এত প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন এখনও সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারেনি? কোথায় আমাদের ভুল ছিল? কারা আমাদের পথ আটকে দিয়েছে? আর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, আমরা নিজেরাই কি কখনো নিজেদের পথের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াইনি?

বাংলাদেশের ইতিহাস তাই শুধু সাফল্যের ইতিহাস নয়, এটি অসম্পূর্ণতারও ইতিহাস। এই অসম্পূর্ণতা কোনো একটি সরকার, কোনো একটি রাজনৈতিক দল কিংবা কোনো একটি সময়ের সৃষ্টি নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দুর্নীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, স্বজনপ্রীতি, নির্বাচন নিয়ে অবিশ্বাস, প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ, সহিংসতা এবং পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণুতা আমাদের রাষ্ট্রচিন্তাকে বারবার দুর্বল করেছে। যে রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, কখনো কখনো সেই রাজনীতিই ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এখানে আমাদের আরও গভীর একটি প্রশ্ন করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়াল কেন? রাজনীতি তো হওয়ার কথা ছিল সমাজের সবচেয়ে মেধাবী, সৎ, দেশপ্রেমিক, যোগ্য ও সাহসী মানুষের জনসেবার ক্ষেত্র। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য, নীতির চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ, মেধার চেয়ে অর্থ ও পেশিশক্তি, সততার চেয়ে প্রভাব এবং জনসেবার চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার দক্ষতা বেশি মূল্য পেতে শুরু করেছে।

যখন ত্যাগী, জ্ঞানী ও নীতিবান মানুষের জায়গা সংকুচিত হয় এবং সুযোগসন্ধানী, দুর্নীতিগ্রস্ত, পেশিশক্তিনির্ভর কিংবা অযোগ্য ব্যক্তিরা অর্থ, প্রভাব, গোষ্ঠী ও ক্ষমতার আশ্রয়ে সামনে চলে আসে, তখন রাজনীতি আর সমাজকে নেতৃত্ব দেয় না, বরং সমাজের দুর্বলতাগুলোকেই প্রতিফলিত করতে শুরু করে।

আরও ভয়াবহ হলো, আমরা অনেক সময় এই অবক্ষয়কে শুধু মেনে নিই না, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে তাকে প্রশ্রয়ও দিই। যোগ্যতার বদলে ‘আমার লোক’, সততার বদলে ‘আমাদের লোক’, নীতির বদলে ‘আমাদের স্বার্থ’ যখন রাজনৈতিক মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে যায়, তখন অযোগ্য মানুষ ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে এবং যোগ্য মানুষ ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায়।

ফলে প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে রাজনীতিতে খারাপ মানুষ ঢুকছে কেন; আরও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছি যেখানে ভালো মানুষ রাজনীতিতে আসতে নিরুৎসাহিত হন, আর খারাপ মানুষ রাজনীতিকে নিজেদের জন্য সুযোগ হিসেবে দেখতে শুরু করেন?

রাজনীতিবিদরা আকাশ থেকে আসে না। তারা এই সমাজ থেকেই আসে। যে সমাজ যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যকে পুরস্কৃত করে, যে সমাজ অন্যায়কে নিজের লোকের অন্যায় বলে ক্ষমা করে, যে সমাজ দুর্নীতিবাজকে ঘৃণা করার বদলে তার ক্ষমতার কাছে মাথানত করে, সেই সমাজে শুধু রাজনীতিবিদ বদলালেই রাজনীতি বদলায় না। আমাদের রাজনৈতিক অবক্ষয়ের একটি বড় কারণ তাই রাজনীতির পাশাপাশি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক চরিত্রের মধ্যেও খুঁজতে হবে।

সমস্যা শুধু সংবিধানে নয়। সমস্যা শুধু সরকারে নয়। সমস্যা শুধু রাজনৈতিক দলে নয়। সমস্যা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্রেও।

এর পাশাপাশি ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার, উগ্রবাদ এবং জঙ্গিবাদের উত্থান বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গভীর সংকট তৈরি করেছে। ধর্ম এই দেশের মানুষের আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ধর্মের নামে উগ্রতা যখন রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা শুধু রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকেও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে টেনে আনে।

আবার জঙ্গিবাদ মোকাবিলার নামে যদি রাষ্ট্র নাগরিক স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার কিংবা রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে দুর্বল করে, তাহলেও সংকট আরও গভীর হয়। ফলে আমাদের বুঝতে হবে, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ যেমন বাংলাদেশের শত্রু, তেমনি তাদের মোকাবিলার নামে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র দুর্বল করাও কোনো সমাধান নয়।

বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে বারবার একটি মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী বা অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে শুধু বাইরের শক্তি নয়, দেশের অভ্যন্তরের রাজনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতার লড়াই, দুর্নীতি, উগ্রবাদ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসও ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রকৃত সম্ভাবনা অনেক সময় আড়ালে পড়েছে।

অথচ এই বাংলাদেশই আবার অন্য একটি গল্প লিখেছে। যে দেশের মানুষ একসময় দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেছে, সেই দেশের কৃষক খাদ্য উৎপাদনে অসাধারণ পরিবর্তন এনেছেন। যে দেশের নারীরা একসময় সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে ছিলেন, সেই দেশের নারীরা তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, ব্যবসা এবং নানা পেশায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।

কোটি কোটি মানুষ বিদেশে গিয়ে শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন। অসংখ্য সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে।

তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো, আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের কিছু সূচক অর্জন করতে পেরেছি, কিন্তু একই গতিতে রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে পারিনি। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু সেতু, রাস্তা, ভবন কিংবা মাথাপিছু আয়ের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না।

উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একজন সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা অনুভব করেন, যখন একজন নাগরিক তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ভয় পান না, যখন সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো দলের নয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে এবং যখন ক্ষমতাবান ব্যক্তিও আইনের ঊর্ধ্বে থাকেন না।

আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই। আমরা বারবার সরকার পরিবর্তনের কথা বলেছি, কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের কথা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনি। আমরা নেতৃত্ব পরিবর্তনের কথা বলেছি, কিন্তু নেতৃত্বের সংস্কৃতি পরিবর্তনের কথা ভুলে গেছি। আমরা নতুন আইন করেছি, কিন্তু আইন প্রয়োগের নৈতিকতা নিয়ে যথেষ্ট ভাবিনি। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছি, কিন্তু দুর্নীতিকে সুবিধা দেওয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারিনি।

তারপর এলো ২০২৪। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, রাজনৈতিক হতাশা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা একসময় রাজপথে বিস্ফোরিত হয়। একটি প্রজন্ম নতুন করে প্রশ্ন তুলল, রাষ্ট্র আসলে কার? ক্ষমতা কার জন্য? এবং স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন জনগণকে বারবার নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাস্তায় নামতে হবে?

এই জাগরণকে শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে ছোট করা হবে। এর গভীরে ছিল একটি বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষা। মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল যেখানে ক্ষমতার জবাবদিহি থাকবে, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন ও কার্যকর হবে এবং ভবিষ্যতের কোনো সরকার যেন অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে না পারে।

সেই প্রেক্ষাপটে জুলাই জাতীয় সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় ঐকমত্যের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রণীত এই সনদে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রস্তাব রাখা হয়। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের গেজেট প্রকাশ করা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কথা রাখা হয়।

এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সংশোধিত সরকারি ফল অনুযায়ী, জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে ৪ কোটি ৭২ লাখের বেশি ভোট এবং বিপক্ষে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ভোট পড়ে। অর্থাৎ জনগণের একটি সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছিল।

এখানে এসে বাংলাদেশের সামনে ইতিহাস একটি বিরল সুযোগ এনে দিয়েছিল। একটি জাগ্রত জনগণ, একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের একটি কাঠামো, এই তিনটি যদি একসঙ্গে কাজে লাগানো যেত, তাহলে অন্তত এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণের পথ তৈরি হতে পারত, যে বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা দলের একক সম্পত্তি নয়, বরং জনগণের বাংলাদেশ।

কিন্তু কোনো সনদ নিজে কোনো দেশকে পরিবর্তন করতে পারে না। সংবিধান পরিবর্তন করা যায়। আইন পরিবর্তন করা যায়। প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা যায়। ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে পুরোনো সমস্যাগুলো নতুন পোশাক পরে ফিরে আসতে পারে।

এই কারণেই জুলাই সনদের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক প্রশ্ন নয়, এটি একটি নৈতিক প্রশ্নও।

২০২৬ সালের নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক শক্তি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠনের মতো শক্তিশালী ম্যান্ডেট পেয়েছে। একই সময়ে জনগণ গণভোটে জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষেও বিপুল সমর্থন দিয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতা এবং সংস্কারের সম্ভাবনা, দুটোই একই সময়ে একটি সরকারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

এখানেই ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষা। কারণ ক্ষমতায় যাওয়ার আগে সংস্কারের কথা বলা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর নিজের ক্ষমতার সীমা মেনে নেওয়া অনেক কঠিন। যে সংস্কার ভবিষ্যতের সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখবে, সেই সংস্কার বাস্তবায়নের অর্থ হলো আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, তারাও নিজেদের ক্ষমতার ওপর ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিচ্ছেন।

এটাই রাজনৈতিক সততার প্রকৃত পরীক্ষা। বর্তমান বাস্তবতায় জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের পদ্ধতি, বিশেষ করে গণভোটের রায় এবং বাস্তবায়ন আদেশের সঙ্গে সংসদীয় ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যও প্রকাশ্যে এসেছে।

প্রশ্নটি তাই কোনো একটি দলকে অভিযুক্ত করার নয়, বরং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট কতটা এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন ইতিহাসের সামনে বড় পরীক্ষা।

জনগণ যদি পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেয়, তাহলে সেই পরিবর্তনের দায় কার? শুধু সরকারের? শুধু রাজনৈতিক দলের? শুধু সংসদের? নাকি আমাদের সবার?

কারণ একটি গণঅভ্যুত্থান কোনো জাতিকে চিরদিনের জন্য জাগ্রত রাখে না। একটি গণভোটও কোনো জাতির চরিত্র পরিবর্তন করে না। পরিবর্তনকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং নাগরিক নৈতিকতা।

আমাদের ভালো মনের মানুষ হতে হবে। এখানে ‘ভালো মানুষ’ বলতে শুধু ব্যক্তিগতভাবে সৎ মানুষ বোঝালে চলবে না। ভালো রাজনৈতিক মানুষ মানে যিনি ক্ষমতায় থেকেও বিরোধী মতের অধিকারকে সম্মান করবেন। ভালো প্রশাসক মানে যিনি রাজনৈতিক নির্দেশের চেয়ে রাষ্ট্রের আইনকে বড় মনে করবেন।

ভালো ব্যবসায়ী মানে যিনি রাষ্ট্রকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করবেন না। ভালো নাগরিক মানে যিনি নিজের দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও কথা বলতে পারবেন। আর ভালো নেতা মানে যিনি জানবেন, জনগণের ভোট তাকে রাষ্ট্রের মালিক করেনি, বরং জনগণের কাছে তাকে আরও বেশি জবাবদিহি করেছে।

এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে বেশি বদলাতে হবে। আমরা যদি শুধু একজনের পরিবর্তে আরেকজনকে ক্ষমতায় বসাই, কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র পরিবর্তন না করি, তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আমরা যদি একটি দলের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অন্য দলের স্বেচ্ছাচারকে মেনে নিই, তাহলে আমরা কোনো শিক্ষাগ্রহণ করিনি। আমরা যদি নিজের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তির অন্যায়কে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে আমাদের জাগরণ অসম্পূর্ণ।

বাংলাদেশ কোনো দলের নয়। বাংলাদেশ কোনো পরিবারের নয়। বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীরও নয়। বাংলাদেশ সেই মানুষের, যে এই দেশের মাটিতে জন্মেছে, এই দেশের জন্য শ্রম দিয়েছে, কর দিয়েছে, ভোট দিয়েছে, সন্তানকে এই দেশের ভবিষ্যৎ ভেবে বড় করেছে এবং প্রয়োজনে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে।

তাই ২০২৪-এর জাগরণের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যদি কিছু থেকে থাকে, তা হলো ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে ক্ষমতার সংস্কৃতি পরিবর্তন অনেক বেশি জরুরি।

আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ দরকার যেখানে ইসলাম ধর্ম পালনকারী মানুষ যেমন নিরাপদ থাকবেন, তেমনি অন্য ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষও সমান মর্যাদা পাবেন। যেখানে ধর্মকে সম্মান করা হবে, কিন্তু ধর্মের নামে রাজনীতি করে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। যেখানে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে, কিন্তু সেই অজুহাতে সাধারণ মানুষের স্বাধীনতাও কেড়ে নেওয়া হবে না। যেখানে সরকার শক্তিশালী হবে, কিন্তু সরকারের চেয়েও শক্তিশালী হবে আইন ও প্রতিষ্ঠান।

আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ দরকার যেখানে নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের পদ্ধতি নয়, জনগণের সার্বভৌমত্বের বাস্তব প্রকাশ। যেখানে সংসদ সরকারের হাতের যন্ত্র নয়, জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত স্থান। যেখানে বিচারব্যবস্থা ক্ষমতার দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে না। যেখানে পুলিশ কোনো দলের নয়, রাষ্ট্রের। যেখানে দুর্নীতি শুধু বক্তৃতায় নিন্দিত হবে না, বাস্তবে শাস্তিযোগ্য হবে।

আর এখানেই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। আমরা কেমন মানুষকে নেতৃত্বে আনছি? কাকে যোগ্য মনে করছি? কাকে অনুসরণ করছি? কাকে ক্ষমা করছি? কাকে প্রশ্ন করছি? আমরা কি নিজের দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও কথা বলতে পারি? আমরা কি শুধু প্রতিপক্ষের দুর্নীতি দেখতে পাই, নাকি নিজের ঘরের দুর্নীতিকেও দুর্নীতি বলতে পারি? যতদিন আমরা এই নৈতিক সাহস অর্জন করতে না পারব, ততদিন রাজনৈতিক সংস্কারের কোনো উদ্যোগই পুরোপুরি সফল হবে না।

কারণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই পরিচালিত হয়। সংবিধান মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু সংবিধানকে কার্যকর করেন মানুষ। আইন অন্যায়কে নিষিদ্ধ করে, কিন্তু আইন প্রয়োগ করেন মানুষ। নির্বাচন জনগণকে ক্ষমতা দেয়, কিন্তু সেই ক্ষমতার ব্যবহার করেন মানুষ। তাই মানুষের চরিত্র পরিবর্তন ছাড়া রাষ্ট্রের স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়।

আর একটি বিষয়ও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না: দেশের স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না; আর তা না হলে বাংলাদেশ আবারও অতীতের মতো একটি ‘‘bottomless basket” হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ দরকার যেখানে একজন নাগরিক তার সন্তানকে এই বলে বড় করতে পারবেন না যে, ‘ভালো মানুষ হয়ে কী হবে? এই দেশে ভালো থেকে টিকে থাকা যায় না।’ বরং তিনি বলতে পারবেন, ‘সৎ থেকো। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করো না। তোমার দেশকে ভালোবাসো। কারণ এই দেশ তোমারও।’

সোনার বাংলা কোনো কল্পকাহিনি নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মর্যাদা আছে, আইনের শাসন আছে, ন্যায়বিচার আছে, জবাবদিহি আছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশা আছে। আমরা সেই স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে গেছি, কিন্তু স্বপ্নটি এখনও মরে যায়নি।

১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছিল। ২০২৪ আমাদের আবার প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। জুলাই সনদ আমাদের সামনে রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সাজানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন আমাদের কাজ হলো সেই সম্ভাবনাকে ক্ষমতার আরেকটি খেলায় পরিণত না করা।

কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হবে যদি আমরা পুরোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত নতুন অন্যায়ের জন্য শুধু নতুন মুখ খুঁজে নিই।

বাংলাদেশের সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি কে, কোনো দল ক্ষমতায়, কিংবা কে আগামী নির্বাচনে জিতবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই বদলাতে চাই?

আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে ক্ষমতা জনগণের কাছে আমানত? আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ পরিচয়টি গুরুত্বপূর্ণ? আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে ধর্ম মানুষের নৈতিক শক্তি হবে, রাজনৈতিক বিভাজনের অস্ত্র নয়? আমরা কি এমন একটি দেশ চাই যেখানে উন্নয়ন শুধু ইট-পাথরের নয়, মানুষের চরিত্র ও প্রতিষ্ঠানেরও?

যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে শুধু অন্যকে বদলানোর অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। আমাদের নিজেদেরও বদলাতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রও তো মানুষেরই প্রতিচ্ছবি।

মানুষ সৎ হলে প্রতিষ্ঠানও একদিন সৎ হতে শেখে। মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে ক্ষমতাও একদিন জবাবদিহি করতে বাধ্য হয়। আর একটি জাতি যখন সত্যিকার অর্থে জেগে ওঠে, তখন কোনো ব্যক্তি, কোনো দল, কোনো পরিবার কিংবা কোনো শক্তিই তার ভবিষ্যৎকে চিরদিন নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

জুলাই আমাদের জাগিয়েছিল। এখন আমাদের দায়িত্ব জেগে থাকা। আর সেই জাগরণ যেন কোনো দলের জন্য না হয়, কোনো ব্যক্তির জন্য না হয়, কোনো ক্ষমতার জন্য না হয়। সেই জাগরণ হোক বাংলাদেশের জন্য। সেই বাংলাদেশ হোক মানুষের বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশই হোক আমাদের অসম্পূর্ণ সোনার বাংলা।

রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow