সোনালি প্রজন্মের শেষ মিশন বেলজিয়ামের

ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল বেলজিয়াম আবারও প্রস্তুত বিশ্বকাপ মঞ্চ কাঁপাতে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ হবে ‘রেড ডেভিলস’দের ১৫তম বিশ্বকাপ অভিযান এবং টানা চতুর্থবারের মতো তারা খেলবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে। ৪৮ দলের সবচেয়ে বড় এই বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের লক্ষ্য শুধু নকআউট পর্বে ওঠা নয়, বরং ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের সাফল্যকে ছাড়িয়ে ইতিহাস গড়া। কাতার ২০২২-এর গ্রুপ পর্ব থেকে হতাশাজনক বিদায়ের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। তবে এবার নতুন কোচ রুডি গার্সিয়ার অধীনে নতুন উদ্দীপনায় এগোচ্ছে বেলজিয়াম। অভিজ্ঞতা আর তরুণ শক্তির মিশেলে গড়া দলটি আবারও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে মুখিয়ে আছে। রুডি গার্সিয়ার হাতে নতুন অধ্যায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দোমেনিকো তেদেস্কোকে সরিয়ে বেলজিয়ামের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফরাসি কোচ রুডি গার্সিয়াকে। জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এটি তার প্রথম বড় দায়িত্ব হলেও ক্লাব ফুটবলে রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। লিলকে ২০১০-১১ মৌসুমে লিগ ওয়ান ও কোপ দ্য ফ্রান্স জেতানো ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য। এছাড়া রোমা, মার্সেই, লিওঁ এবং নাপোলির মতো ক্লাবেও কোচিং করিয়েছেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় পরীক্ষ

সোনালি প্রজন্মের শেষ মিশন বেলজিয়ামের

ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল বেলজিয়াম আবারও প্রস্তুত বিশ্বকাপ মঞ্চ কাঁপাতে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ হবে ‘রেড ডেভিলস’দের ১৫তম বিশ্বকাপ অভিযান এবং টানা চতুর্থবারের মতো তারা খেলবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে। ৪৮ দলের সবচেয়ে বড় এই বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের লক্ষ্য শুধু নকআউট পর্বে ওঠা নয়, বরং ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের সাফল্যকে ছাড়িয়ে ইতিহাস গড়া।

কাতার ২০২২-এর গ্রুপ পর্ব থেকে হতাশাজনক বিদায়ের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। তবে এবার নতুন কোচ রুডি গার্সিয়ার অধীনে নতুন উদ্দীপনায় এগোচ্ছে বেলজিয়াম। অভিজ্ঞতা আর তরুণ শক্তির মিশেলে গড়া দলটি আবারও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে মুখিয়ে আছে।

রুডি গার্সিয়ার হাতে নতুন অধ্যায়

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দোমেনিকো তেদেস্কোকে সরিয়ে বেলজিয়ামের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফরাসি কোচ রুডি গার্সিয়াকে। জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এটি তার প্রথম বড় দায়িত্ব হলেও ক্লাব ফুটবলে রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।

লিলকে ২০১০-১১ মৌসুমে লিগ ওয়ান ও কোপ দ্য ফ্রান্স জেতানো ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য। এছাড়া রোমা, মার্সেই, লিওঁ এবং নাপোলির মতো ক্লাবেও কোচিং করিয়েছেন তিনি।

দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল ইউক্রেনের বিপক্ষে উয়েফা নেশনস লিগ প্লে-অফ। প্রথম লেগে ৩-১ ব্যবধানে হারের পর ফিরতি ম্যাচে রোমেলু লুকাকুর জোড়া গোলে ৩-০ জিতে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বেলজিয়াম। সেই ম্যাচ থেকেই দলটিতে নতুন আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে।

পরবর্তীতে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে গ্রুপ ‘জে’-তে অপরাজিত থেকে উত্তর আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করে রেড ডেভিলসরা। আট ম্যাচে পাঁচ জয় ও তিন ড্রয়ে তারা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়। শেষ ম্যাচে লিচেনস্টাইনকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে বেলজিয়াম।

বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বেলজিয়ামের সূচি

গ্রুপ `জি‘তে বেলজিয়ামের সঙ্গী মিশর, ইরান এবং নিউজিল্যান্ড।

গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামের ম্যাচগুলো:

* ১৫ জুন, বেলজিয়াম বনাম মিশর, ভেন্যু: সিয়াটল স্টেডিয়াম
* ২১ জুন, বেলজিয়াম বনাম ইরান, ভেন্যু: লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম
* ২৬ জুন, নিউজিল্যান্ড বনাম বেলজিয়াম, ভেন্যু: বিসি প্লেস, ভ্যাঙ্কুভার

অভিজ্ঞ তারকাদের শেষ বিশ্বকাপ?

বেলজিয়ামের ২৬ সদস্যের দলে আছেন অভিজ্ঞ কেভিন ডি ব্রুইনা, থিবো কোর্তোয়া, থমাস মুনিয়ে, অ্যাক্সেল উইটসেল এবং রোমেলু লুকাকুর মতো তারকারা। অনেকের কাছেই এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ।

বিশেষ করে ডি ব্রুইনা ও লুকাকুর জন্য এটি হয়তো শেষ সুযোগ দেশকে বিশ্বকাপের শিরোপার খুব কাছে নিয়ে যাওয়ার। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ দলে ডাক পেয়েছেন তরুণ মাতিয়াস ফার্নান্দেজ-পার্দো।

বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের ইতিহাস

* কনফেডারেশন: উয়েফা
* প্রথম বিশ্বকাপ: উরুগুয়ে ১৯৩০
* সর্বশেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২
* সেরা ফলাফল: তৃতীয় স্থান (রাশিয়া ২০১৮)
* মোট অংশগ্রহণ: ১৫ বার
* টানা বিশ্বকাপ: ৪টি (২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)

বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সামগ্রিক পরিসংখ্যান

* ম্যাচ: ৫১
* জয়: ২১
* ড্র: ১০
* হার: ২০
* গোল করেছে: ৬৯
* গোল হজম: ৭৪

প্রথম বিশ্বকাপের গল্প

১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপেই অংশ নেয় বেলজিয়াম। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩-০ এবং প্যারাগুয়ের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। তবুও বিশ্বকাপের পথিকৃৎ দেশগুলোর একটি হিসেবে ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয় বেলজিয়াম।

কাতার ২০২২: স্বপ্নভঙ্গের আসর

রাশিয়া ২০১৮-তে তৃতীয় হওয়ার পর কাতারে বেলজিয়ামকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার ধরা হয়েছিল। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। প্রথম ম্যাচে কানাডাকে ১-০ গোলে হারালেও এরপর মরক্কোর কাছে ২-০ ব্যবধানে হারে তারা। শেষ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়।

এই ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই কার্যত শেষ হয়ে যায় বেলজিয়ামের বিখ্যাত ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর যুগ।

বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সর্বোচ্চ গোলদাতা

বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা দুজন: রোমেলু লুকাকু ও মার্ক উইলমটস: ৫ গোল

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু। এরপর ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে পানামা ও তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলসহ মোট চার গোল করেন। বর্তমানে বেলজিয়ামের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা লুকাকু।

১৯৯৮ ও ২০০২ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড মার্ক উইলমটস। ২০০২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করেছিলেন তিনি।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন এনজো শিফো

বেলজিয়ামের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন কিংবদন্তি মিডফিল্ডার এনজো শিফো। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপে তিনি খেলেছেন মোট ১৭টি ম্যাচ। অসাধারণ পাসিং, ভিশন এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতায় তিনি ছিলেন বেলজিয়ামের মধ্যমাঠের প্রাণভোমরা।

স্মরণীয় বিশ্বকাপ মুহূর্ত: ১৯৮৬ ও ২০১৮

মেক্সিকো ১৯৮৬

১৯৮৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়াম প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে ওঠে। শেষ ষোলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ৪-৩ গোলে হারানোর ম্যাচটি এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হয়।

কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শেষ চারে ওঠে তারা। যদিও সেমিফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার কাছে ২-০ গোলে হেরে যায় বেলজিয়াম।

রাশিয়া ২০১৮

এটাই বেলজিয়ামের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ অভিযান। গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত খেলার পর শেষ ষোলোতে জাপানের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্যভাবে ৩-২ ব্যবধানে জয় পায় তারা।

কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে পুরো বিশ্বকে চমকে দেয় রেড ডেভিলসরা। যদিও সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ১-০ ব্যবধানে হারে তারা। পরে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে তৃতীয় হয় বেলজিয়াম।

বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় জয়

* ৩-০ বনাম এল সালভাদর (১৯৭০)
* ৩-০ বনাম পানামা (২০১৮)
* ৫-২ বনাম তিউনিসিয়া (২০১৮)

নতুন ইতিহাসের স্বপ্ন

কেভিন ডি ব্রুইনার সৃজনশীলতা, লুকাকুর গোল করার ক্ষমতা এবং কোর্তোয়ার অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে বেলজিয়াম এবারও বড় স্বপ্ন দেখছে। তবে বাস্তবতা হলো, এটি সম্ভবত তাদের সোনালি প্রজন্মের শেষ বিশ্বকাপ।

রুডি গার্সিয়ার দল যদি নিজেদের সামর্থ্যের পুরোটা দেখাতে পারে, তাহলে ২০১৮ সালের সাফল্যকে ছাড়িয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। ইউরোপের এই দলটি এবার বিশ্বকাপে শুধু অংশ নিতে নয়, ইতিহাস গড়তেই আসছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow