সোর্সদের সাক্ষী বানিয়ে মাদক-নগদ টাকা গায়েবের অভিযোগ ডিবির বিরুদ্ধে

নওগাঁয় মাদকবিরোধী অভিযানে ৩৮ কেজি গাঁজা ও মাদক বিক্রির নগদ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধারের পর ২০ কেজি গাঁজা জব্দ তালিকায় উল্লেখ করার অভিযোগ উঠেছে জেলা গোয়েন্দা শাখার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিনার আলীর বিরুদ্ধে। গত ১ এপ্রিল দিনগত রাতে সদর উপজেলার কীর্ত্তিপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে সোর্সদের সাক্ষী দেখিয়ে এই গাঁজা ও নগদ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে ওই এলাকায়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা। নওগাঁ সদর মডেল থানায় করা এজাহার অনুযায়ী, গত ১ এপ্রিল দিনগত রাত ১টা ৫০ মিনিটে উপজেলার কীর্ত্তিপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা। অভিযানে সুমন হোসেনের বসতবাড়ির শোবার ঘরের খাটের নিচে থেকে চার পোটলা গাঁজা উদ্ধারসহ তাকে আটক করা হয়। পরে রাত ২টা ৪০ মিনিটে উদ্ধারকৃত গাঁজা ইলেকট্রিক ও টর্চ লাইটের আলোতে উপস্থিত সাক্ষীদের দেখিয়ে ডিবি পুলিশের কাছে থাকা ডিজিটাল ওয়েট মেশিনে পরিমাপ করলে ২০ কেজি ওজন দৃশ্যমান হয়। এ পরিমাণ গাঁজা জব্দের বিষয়টি উল্লেখ করে কীর্

সোর্সদের সাক্ষী বানিয়ে মাদক-নগদ টাকা গায়েবের অভিযোগ ডিবির বিরুদ্ধে

নওগাঁয় মাদকবিরোধী অভিযানে ৩৮ কেজি গাঁজা ও মাদক বিক্রির নগদ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধারের পর ২০ কেজি গাঁজা জব্দ তালিকায় উল্লেখ করার অভিযোগ উঠেছে জেলা গোয়েন্দা শাখার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিনার আলীর বিরুদ্ধে। গত ১ এপ্রিল দিনগত রাতে সদর উপজেলার কীর্ত্তিপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে সোর্সদের সাক্ষী দেখিয়ে এই গাঁজা ও নগদ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে ওই এলাকায়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।

নওগাঁ সদর মডেল থানায় করা এজাহার অনুযায়ী, গত ১ এপ্রিল দিনগত রাত ১টা ৫০ মিনিটে উপজেলার কীর্ত্তিপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা। অভিযানে সুমন হোসেনের বসতবাড়ির শোবার ঘরের খাটের নিচে থেকে চার পোটলা গাঁজা উদ্ধারসহ তাকে আটক করা হয়। পরে রাত ২টা ৪০ মিনিটে উদ্ধারকৃত গাঁজা ইলেকট্রিক ও টর্চ লাইটের আলোতে উপস্থিত সাক্ষীদের দেখিয়ে ডিবি পুলিশের কাছে থাকা ডিজিটাল ওয়েট মেশিনে পরিমাপ করলে ২০ কেজি ওজন দৃশ্যমান হয়। এ পরিমাণ গাঁজা জব্দের বিষয়টি উল্লেখ করে কীর্ত্তিপুর গ্রামের মো. প্রতীক ও মো. নিশাত হোসেন ও পাইকপাড়া গ্রামের মোছা. নারগিসের থেকে জব্দ তালিকায় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পুলিশ সাক্ষী হিসেবে জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর করেন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আবু কালাম আজাদ।

নওগাঁ জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মিনার আলী, উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আসাদুজ্জামান, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আবু কালাম আজাদ, কনস্টেবল নাহিদুল ইসলাম, ইউসুফ আলী ও আতিকুর ইসলামসহ ডিবি পুলিশের সঙ্গীয় ফোর্স মাদকবিরোধী এই অভিযান পরিচালনা করেন। পরে এ মামলায় দিনগত রাত ৪টা ৫ মিনিটে নওগাঁ সদর মডেল থানায় বাদী হয়ে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনে মামলা করেন উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মিনার আলী।

অনুসন্ধানে ডিবি পুলিশের করা এই মাদক মামলায় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। কাগজে কলমে এ অভিযান দিনগত রাত ১টা ৫০ মিনিট থেকে ২টা ৪০ মিনিটের মধ্যে দেখানো হলেও এটি হয়েছে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১টার মধ্যে। ঘটনাস্থল পাইকপাড়া থেকে অন্তত দেড় কিলোমিটার দূরে কীর্ত্তিপুর এলাকা। অথচ সেখানকার দুইজনকে জব্দ তালিকায় সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখা গেছে কীর্ত্তিপুর গ্রামের সাক্ষী প্রতীক ডিবি পুলিশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সোর্স হিসেবে কাজ করেন। এসআই মিনার আলীর একাধিক মামলায় সাক্ষী হিসেবে প্রতীককে রাখতে দেখা গেছে। এই প্রতীকেরই বন্ধু নিশাত হোসেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একজন প্রতিবেদককে জানান, ঘটনার দিন রাতে পাইকপাড়ায় অভিযান পরিচালনার আগে কীর্ত্তিপুর এলাকা থেকে প্রতীক ও নিশাতকে সঙ্গে নেন এসআই মিনার আলী। রাত সাড়ে ১১টার দিকে পাইকপাড়ায় পৌঁছালে মাদক ব্যবসায়ী সুমনের বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি শুরু করেন। উদ্ধার করা হয় ৩৮ কেজি গাঁজাসহ মাদক বিক্রির নগদ ৬০ হাজার টাকা। যা নিয়ে চলে দেনদরবার। একপর্যায়ে নগদ টাকা ও ১৮ কেজি গাঁজা জব্দ তালিকা থেকে সরিয়ে শুধুমাত্র ২০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের বিষয়টি মামলায় উল্লেখ করার শর্তে মাদক ব্যবসায়ী সুমনের সঙ্গে রফাদফা হয়। সেটি সহজেই প্রমাণ করতে নিজের বিশ্বস্ত সোর্স প্রতীক ও তার বন্ধু নিশাতকে সাক্ষী করেন এসআই মিনার আলী। নাটকীয়ভাবে বানানো হয় ২০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের অভিযানের একটি ভিডিওচিত্র।

এসআই মিনারের বিভিন্ন মামলায় কীভাবে বারবার সাক্ষী হচ্ছেন জানতে চাইলে প্রতীক বলেন, ডিবি অফিসের সঙ্গে আমার একটা সুসম্পর্ক আছে। তাই স্যার আমাকে তাদের বিভিন্ন মামলায় সাক্ষী করেন। এ পর্যন্ত অন্তত চারটি মামলায় আমি ডিবির সাক্ষী। তবে ওই রাতে ঠিক কত কেজি গাঁজা মিনার স্যার উদ্ধার করেছিলেন সেটি ওজনের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না। এরপরেও জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর করেছি। কোথাও অনিয়ম হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

সাক্ষী নিশাত হোসেন বলেন, বন্ধু প্রতীকের অনুরোধে ওই রাতে আমার সিএনজি বের করেছিলাম। সেই সিএনজি নিয়েই ডিবি পুলিশের কয়েকজন কীর্ত্তিপুর থেকে আমাদের পাইকপাড়ায় নিয়ে গেছেন। এরপর মাদক ব্যবসায়ী সুমনের বাড়ি তল্লাশির সময় আমাকে কয়েকজন ডিবি পুলিশের সাথে পাইকপাড়া থেকে এক কিলোমিটার দূরে পার্শ্ববর্তী নিয়নপুর এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নিয়নপুরে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে মাদক পাওয়া গেছে জানিয়ে আবারও আমাকে পাইকপাড়ায় ফেরত এনে জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। ২০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের তথ্য জানানো হয়েছিল।

জব্দ তালিকার স্বাক্ষর অনুযায়ী পাইকপাড়ার সাক্ষী নারগিসের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল করা হলে রিসিভ করেন তার স্বামী আবুল কালাম। তিনি বলেন, ওই রাতে আমার স্ত্রী ঘুমিয়ে ছিল। হুট করে রাতে বাড়ির সামনে এসে ডাকাডাকি করে আমার স্ত্রীকে উঠিয়ে জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর নিয়েছে। কত কেজি মাদক উদ্ধার হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মিনার আলী জাগো নিউজকে বলেন, পাইকপাড়া গ্রামে ওই রাতে কাউকে পাওয়া সম্ভব নয়। এটা জেনেই প্রতীক ও নিশাতকে ঘটনাস্থলে সঙ্গে নিয়ে গেছি। তাদের সামনেই পুরো অভিযান হয়েছে। এরপর জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর নিয়েছি। ৩৮ কেজি গাঁজা ও নগদ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধারের অভিযোগটি সঠিক নয়।

একই ব্যক্তিকে বার বার বিভিন্ন মামলায় সাক্ষী করানো কতটুকু আইনসম্মত জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতীক এর আগে আমার একটি মামলায় সাক্ষী ছিল। তাকে একাধিক মামলায় সাক্ষী করানো দোষের কিছু নয়। এটা আইনসম্মতভাবেই হয়েছে। পুরো অভিযানের ভিডিও রেকর্ডেড আছে বলেও দাবি করেন তিনি।

নওগাঁ জেলা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক (ওসি ডিবি) হাসিবুল্লাহ হাবিব জাগো নিউজকে বলেন, কাউকে সাক্ষী বানানোর জন্য দেড় কিলোমিটার দূর থেকে পাইকপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। ঘটনাস্থলেই প্রতীক ও নিশাত উপস্থিত ছিল। তাই তাদের সাক্ষী হিসেবে জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। প্রতীক আগের কোনো মামলায় সাক্ষী থাকলে সেটির প্রমাণ চান তিনি।

তিনি বলেন, মাদকবিরোধী ওই অভিযানে এসআই মিনার আলী ছাড়াও একজন ইন্সপেক্টর নিজে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখানে হেরফের করার সুযোগ নেই। কেউ প্রমাণ করতে পারলে পুলিশের চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও জানান ডিবির এই পরিদর্শক।

নওগাঁর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, একই ব্যক্তি ডিবির বিভিন্ন মাদক মামলায় বারবার সাক্ষী হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো। মাদকবিরোধী ওই অভিযানে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সত্যতা পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরমান হোসেন রুমন/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow