স্বরূপের সন্ধানে: চর্যাগীতি থেকে বাঙালি মুসলমানের ভাবজগৎ

রত্না মাহমুদা আনিসুজ্জামান (১৯৩৭-২০২০) বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি-চর্চার ক্ষেত্রে অনন্য প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের জাতীয় অধ্যাপক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও বুদ্ধিজীবী। বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিহাস সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি, গভীর গবেষণামনস্কতা এবং প্রাঞ্জল বিশ্লেষণী ভাষার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যচর্চাকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছেন। তাঁর রচনায় বাঙালির সমাজজীবন, সংস্কৃতি, ধর্মীয় চেতনা ও জাতিসত্তার নানা দিক সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর ‘স্বরূপের সন্ধানে’ বইটির পাঠ-প্রতিক্রিয়া জানাতে নিখুঁত চিত্রায়ণ আমার অনুভবকে আরও তীব্র করে তুলেছে। বিশেষ করে সমাজ ও সময়ের প্রেক্ষাপট যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। বইটি আমার চিন্তাজগতে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন ঘটিয়েছে। আনিসুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ ‘স্বরূপের সন্ধানে’ বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও ইতিহাসের গভীর অনুসন্ধিৎসু পাঠ। এতে সংকলিত ‘চর্যাগীতির সমাজচিত্র’, ‘মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য: সমাজের কিছু চিত্র’, ‘বা

স্বরূপের সন্ধানে: চর্যাগীতি থেকে বাঙালি মুসলমানের ভাবজগৎ

রত্না মাহমুদা

আনিসুজ্জামান (১৯৩৭-২০২০) বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি-চর্চার ক্ষেত্রে অনন্য প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের জাতীয় অধ্যাপক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও বুদ্ধিজীবী। বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিহাস সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি, গভীর গবেষণামনস্কতা এবং প্রাঞ্জল বিশ্লেষণী ভাষার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যচর্চাকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছেন। তাঁর রচনায় বাঙালির সমাজজীবন, সংস্কৃতি, ধর্মীয় চেতনা ও জাতিসত্তার নানা দিক সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর ‘স্বরূপের সন্ধানে’ বইটির পাঠ-প্রতিক্রিয়া জানাতে নিখুঁত চিত্রায়ণ আমার অনুভবকে আরও তীব্র করে তুলেছে। বিশেষ করে সমাজ ও সময়ের প্রেক্ষাপট যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। বইটি আমার চিন্তাজগতে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন ঘটিয়েছে।

আনিসুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ ‘স্বরূপের সন্ধানে’ বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও ইতিহাসের গভীর অনুসন্ধিৎসু পাঠ। এতে সংকলিত ‘চর্যাগীতির সমাজচিত্র’, ‘মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য: সমাজের কিছু চিত্র’, ‘বাঙালি মুসলমান লেখকদের ভাবজগৎ (১৮৭০-১৯২০)’ এবং ‘স্বরূপের সন্ধানে’ প্রবন্ধগুলোর মধ্যদিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধারার সঙ্গে বাঙালির সমাজ-সংস্কৃতি ও মানসগঠনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। চর্যাগীতির অন্তর্নিহিত সমাজচিত্র থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের সামাজিক বাস্তবতা এবং বাঙালি মুসলমানের ভাবজগৎ—সবকিছুকে তিনি ইতিহাস ও সংস্কৃতির আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন। ভূমিকায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে ও স্থানে, বিভিন্ন উপলক্ষে ও ভাষায় লেখা এই প্রবন্ধ চতুষ্টয়ের মধ্যে সামান্য যোগসূত্র আছে। সবকটি রচনাতেই আমি সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তার রচনাকালের সমাজকে অবলোকন করতে চেয়েছি।’ (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ভূমিকা)

আনিসুজ্জামান চর্যাপদের আবিষ্কার-প্রসঙ্গকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎসসন্ধানী ইতিহাসের অনন্য অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর আলোচনায় প্রতিভাত হয় যে, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নেপাল-অভিযান কেবল কয়েকটি পুঁথির সন্ধানই দেয়নি, উন্মোচিত করেছিল বাঙালির ভাষা-ঐতিহ্যের সুদূর অতীতকে। ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামকরণের মধ্যদিয়ে চর্যাগীতিকে প্রাচীন বাংলা ভাষার নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়, তা বাংলা সাহিত্যের আদি স্রোতধারাকে নতুন ব্যাখ্যায় অনুধাবনের সুযোগ সৃষ্টি করে। সংস্কৃত টীকাসহ পুঁথিগুলোর প্রকাশ চর্যাগীতির সাহিত্যিক, দার্শনিক ও সমাজ-সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আরও সুসংহত করেছে। আনিসুজ্জামানের দৃষ্টিতে চর্যাপদ নিছক ধর্মীয় সাধনসংগীত নয়; মধ্যযুগীয় বাঙালি সমাজমানস, জীবনবোধ ও সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার অন্তর্লিখিত দলিল।

চর্যাগীতির সমাজচিত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পুঁথিসাহিত্যের উদ্দেশ্যে তৃতীয়বার নেপালে গিয়ে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাচর্যবিনিশ্চয় নামে পদ-সংকলন, সরোরুহবজ্রের দোহাকোষ এবং কৃষ্ণাচার্যের দোহাকোষের পুঁথি আবিষ্কার করেন ১৯০৭ সালে। সবগুলোরই সংস্কৃত টীকা পাওয়া গিয়েছিল। ন’ বছর পর তাঁর সম্পাদনায় টীকা ও মূলসহ পুথিগুলো এবং পূর্বে সংগৃহীত ডাকার্ণব একসঙ্গে বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ থেকে প্রকাশিত হয় ‘হাজার হাজার পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে। এ নামকরণের মধ্যেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দুটি সিদ্ধান্তের পরিচয় মেলে: তাঁর সংগৃহীত সবকটি পুঁথিই লিখিত হয়েছিল বাংলা ভাষায়, সবগুলোই রচিত হয়েছিল আনুমানিক দশম শতাব্দীতে।’ (আনিসুজ্জামান, ২০০৯:১৩)

আনিসুজ্জামানের এ মূল্যায়ন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসচর্চাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। চর্যাপদের পুঁথি-আবিষ্কার বাংলা ভাষার প্রাচীনত্বকে যে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি দিয়েছে, তা বাঙালির সাহিত্যিক আত্মপরিচয় নির্মাণে গভীর তাৎপর্য বহন করে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় সংস্কৃত টীকাসহ গ্রন্থপ্রকাশ চর্যাগীতির প্রামাণিকতা ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ গুরুত্বকে আরও দৃঢ় করেছে। আনিসুজ্জামানের বিশ্লেষণ এ কারণে কেবল তথ্যনির্ভর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা নয়, পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতির উৎস-অন্বেষণের মননশীল ভাষ্য। তাঁর অভিমত চর্যাগীতিকে বাঙালির সাহিত্যিক উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক চেতনার আদিতম স্বাক্ষর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

আনিসুজ্জামান চর্যাগীতির সমাজচিত্র বিশ্লেষণে এর ভাষার স্বরূপ সম্পর্কে অনুসন্ধানী প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, চর্যাগীতি ‘সান্ধ্যভাষা’ বা সাংকেতিক ভাষায় রচিত, যেখানে শব্দগুলো সরাসরি অর্থে নয়, বিশেষ পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে সাধারণ শব্দের ভেতরেও আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক অর্থ লুকিয়ে থাকে, যেমন হরিণ চিত্তের প্রতীক এবং হরিণী জ্ঞানের মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ ব্যাখ্যা চর্যাগীতির অন্তর্নিহিত সমাজ ও সাধনচিন্তার জটিলতাকে উন্মোচন করে। ‘চর্যাগীতির সমাজচিত্র নিয়ে আনিসুজ্জামানের মনে কিছু প্রশ্নের উত্তর বের করেছেন অনুসন্ধানী ভাষায়, যেমন: প্রথমত মনে রাখতে হবে যে চর্যাগীতি সান্ধ্যভাষায় (উদ্ধৃত: মুনিদত্তের টীকা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৩১৩: ৮) অর্থাৎ সাংকেতিক ভাষায় লেখা। সেখানে সম্ভবত শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে বিশেষ পারিভাষিক অর্থে। যেমন: হরিণ হলো চিত্ত, হরিণী জ্ঞান-মুদ্রা।’ (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ১৪)

আনিসুজ্জামানের এ ব্যাখ্যা চর্যাগীতির ভাষাগত জটিলতা ও প্রতীকী নির্মাণকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। মুনিদত্তের টীকার ভিত্তিতে ‘সান্ধ্যভাষা’ ধারণা প্রমাণ করে যে চর্যাগীতি সরল বর্ণনা হিসেবে নয় সাংকেতিক আধ্যাত্মিক ভাষ্য। তাই তাঁর বিশ্লেষণ চর্যাগীতির সমাজচিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গভীর অর্থস্তর উন্মোচনে সহায়তা করে এবং পাঠককে নতুন ব্যাখ্যাগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।

আনিসুজ্জামান চর্যাগীতির সমাজচিত্র বিশ্লেষণে এর পদের সময়, স্থান ও রচনাগত ঐক্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, প্রাপ্ত পঞ্চাশটি বা সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ একক সময় বা একই স্থানের রচনা নয়; ফলে এগুলোতে একটি অভিন্ন সামাজিক পরিমণ্ডলের চিত্র রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করা যায় না। ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে এগুলোকে একটি অঞ্চলের রচনা হিসেবে অনুমান করা হলেও, কবিদের অভিজ্ঞতার জগৎ যে বিস্তৃত ছিল, তা তাঁদের জীবন-সম্পর্কিত কিংবদন্তি থেকেই আভাস পাওয়া যায়। তাই তো লেখক বলেছেন, ‘দ্বিতীয়ত এই পঞ্চাশটি বা সাড়ে ছেচল্লিশটি-পদ একই সংগ্রহে পাওয়া গেলেও তা একই কালের লেখা নয়, একই স্থানের লেখা বলেও কোনো প্রমাণ নেই। সুতরাং এতে যে অভিন্ন পরিমণ্ডলের চিত্র অংকিত হয়েছে, একথা জোর করে বলা যায় না। বস্তুত ভাষাতত্ত্বের সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই এগুলো এক অঞ্চলের রচনা বলে অনুমান করা হচ্ছে; কবিদের অভিজ্ঞতার জগৎ যে এর বাইরে দূরবিস্তৃত ছিল, তার সাক্ষ্য তাঁদের জীবনী-সম্পর্কিত কিংবদন্তিতেই পাওয়া যাবে।’ (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ১৪-১৫)

লেখকের এ যুক্তি চর্যাগীতির ইতিহাস ও সমাজচিত্র বিশ্লেষণে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেছে। তিনি একরৈখিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে ভাষাতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক প্রমাণের ভিত্তিতে সতর্ক অনুমানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যা গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা বাড়ায়। একই সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন, সাহিত্যিক পাঠের বাইরে জীবনী ও কিংবদন্তি চর্যাগীতির কবিদের অভিজ্ঞতার বিস্তার বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে তাঁর বক্তব্য চর্যাগীতির সমাজচিত্রকে বহুমাত্রিক ও বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিতে অনুধাবনের সুযোগ সৃষ্টি করে। তিনি চর্যাগীতির সমাজচিত্রকে ইতিহাসের অন্যান্য প্রামাণ্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, চর্যাগীতির ‘সান্ধ্যভাষা’ বা সাংকেতিক আবরণ এবং পণ্ডিতদের মতভেদ থাকা সত্ত্বেও যেখানে সরাসরি ইঙ্গিত পাওয়া যায়; সেখানে সেগুলো সমকালীন সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উন্মোচন করে। তাই ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে সমন্বিত পাঠ করলে চর্যাগীতি থেকে মধ্যযুগীয় সমাজের বাস্তব চিত্র স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা সম্ভব। লেখক বলেছেন, ‘চর্যাগীতির সংবাদকে যদি অন্য উপায়ে জ্ঞাত ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে আমরা মিলিয়ে নিতে পারি, তাহলে স্বীকার করতে হবে যে, সান্ধভাষার আবরণ বা পণ্ডিতদের মতভেদ যেসব অংশে নেই, সেসব অংশে যোগ দিলে সে যুগের সমাজজীবনের যথেষ্ট উপাদান পাওয়া যাবে। চর্যাগীতির সংবাদকে যদি অন্য উপায়ে জ্ঞাত ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে আমরা মিলিয়ে নিতে পারি, তাহলে স্বীকার করতে হবে যে, সান্ধভাষার আবরণ বা পণ্ডিতদের মতবিরোধ বহু শতাব্দীর ব্যবধানেও জীবনের সত্যকে আড়াল করতে পারেনি!’ (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ১৫)

লেখকের এ দৃষ্টিভঙ্গি চর্যাগীতিকে এককভাবে সাহিত্যিক পাঠে সীমাবদ্ধ না রেখে ইতিহাস-নির্ভর বিশ্লেষণের দিকে নিয়ে যায়। তিনি দেখিয়েছেন, সান্ধ্যভাষার আড়াল থাকলেও চর্যাগীতির অন্তর্নিহিত জীবনসত্য বহু শতাব্দী পরেও মুছে যায়নি। ফলে অন্যান্য ঐতিহাসিক উপাদানের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করলে চর্যাগীতি সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনধারার নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

‘চর্যাগীতিতে বাস্তব সভ্যতার যে পরিচয় আছে, সেখানেও প্রাক-আর্যসংস্কৃতির অবদানে প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায়। চর্যায় কৃষিকর্মের উল্লেখ নেই বটে, কিন্তু তন্তুবায় ও ব্যাধের জীবনযাত্রার পরিচয় সুস্পষ্ট। নানারকম নৌকার বর্ণনা আমরা পাই। পশুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ পাই হাতির। লাউ ও তাম্বুলের উল্লেখও লক্ষণীয়। এসব থেকে যদি বলা যায় যে, অস্ট্রেলীয়দের অবদানই ছিল চর্যাগীতিতে বিধৃত বাস্তব সভ্যতার প্রধান ভিত্তি, তাহলে খুব অসংগত হবে না।’ (আনুসজ্জামান, ২০০৯: ১৮)

আনিসুজ্জামানের মন্তব্য অনুযায়ী ভাষাবিজ্ঞানী ড. এনামুল হকের যুগবিভাজন-ধারণার সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের শ্রেণিবিন্যাস-সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি তুর্কি সুলতানি ও মোগল—এই দুই প্রশাসনিক যুগভিত্তিক বিভাজনের মাধ্যমে মুসলিম শাসনামলের সাহিত্যকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু লেখকের মতে, শুধু শাসনকালভিত্তিক ভাগ সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে না। কারণ সাহিত্য কোনো রাজনৈতিক যুগের গণ্ডিতে পুরোপুরি আবদ্ধ নয়; এর ভাষা, ভাব, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট আরও জটিল।

‘মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য: সমাজের কিছু চিত্র’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘ডক্টর এনামুল হক তাই তুর্কি সুলতানি যুগ ও মোগলাই যুগ নামে এই যুগকে ভাগ করেছেন। তিনের যোগফলে একালের সাহিত্যকে মুসলিম শাসনামলেের বাংলা সাহিত্য বলা যেতে পারে। তাতে অবশ্য এ যুগের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে না- হয়তো মধ্যযুগ বললেও নয়।’ (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ৩১)

তাঁর মতে এনামুল হকের শ্রেণিবিভাগ ঐতিহাসিকভাবে সুবিধাজনক হলেও সাহিত্যিক পরিচয় নির্ধারণে তা অপর্যাপ্ত। ফলে ‘মুসলিম শাসনামলের বাংলা সাহিত্য’ নামকরণও মধ্যযুগীয় সাহিত্যের স্বতন্ত্র লক্ষণ বা রূপকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না। তাই লেখকের মতে যুগকে কেবল রাজনৈতিক শাসনভিত্তিক নয়, সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে বিচার করা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

আনিসুজ্জামান এখানে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের কাঠামোগত ও মরমী বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, তৎকালীন সাহিত্য ছিল মূলত পদ্যনির্ভর, যেখানে যুক্তিনির্ভর গদ্যের চেয়ে ভক্তি ও আধ্যাত্মিক আবেগের প্রাধান্য ছিল বেশি। অনুবাদ সাহিত্য এবং পালাকাব্যের আধিপত্য প্রমাণ করে যে, মৌলিক সৃজনশীলতার চেয়ে ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ এবং কাহিনি বর্ণনাই ছিল সে যুগের প্রধান ঝোঁক। সর্বোপরি, এই সাহিত্যের মূল লক্ষ্য ছিল মানবিক অনুভূতির চেয়ে দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচার বা অধ্যাত্মতত্ত্ব প্রকাশ করা, যা তৎকালীন ধর্মকেন্দ্রিক সমাজবাস্তবতারই প্রতিফলন।

মধ্যযুগের সাহিত্য নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এ-যুগের সাহিত্য প্রায় সবই ছন্দোবদ্ধ। যুগের শেষে গদ্যের সূচনা হচ্ছে মাত্র—তার ব্যাপক ব্যবহার হয়নি, তা সাহিত্যিক গদ্যরীতি গড়ে ওঠেনি। বোঝা যায়, যুক্তিতর্কের চেয়ে আবেগ ও বিশ্বাস তখন বড়ো। এই ছন্দোবদ্ধ রচনার একটা বৃহৎ অংশজুড়ে আছে অনুবাদকর্ম। সংস্কৃত থেকে, ফারসি থেকে এবং হিন্দি থেকে অনুবাদ। বৈষ্ণব কবিতা এবং যুগশেষের শাক্ত কবিতা ছাড়া আর সবই প্রায় ছিল পালা জাতীয় কাব্য, কাহিনির জোগান দেওয়া যার লক্ষণ। সে কাহিনির এবং সে কালের গীতিকবিতারও উদ্দেশ্য আবার দেবদেবীর মহিমাকীর্তন করা অথবা অধ্যাত্মতত্ত্ব পরিস্ফুট করা।’ (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ৩১)

আনিসুজ্জামানের এ পর্যবেক্ষণ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের গঠন ও ভাবগত বৈশিষ্ট্যকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করে। তিনি দেখান এবং সে সময়ের সাহিত্য প্রধানত ছন্দনির্ভর এবং গদ্যের অনুপস্থিতির কারণে এখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ, বিশ্বাস ও ভক্তির প্রকাশই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে সাহিত্য কাহিনি ও পালা-কেন্দ্রিক হয়ে ধর্মকেন্দ্রিক সমাজচেতনার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এ ছাড়া সংস্কৃত, ফারসি ও হিন্দি থেকে অনুবাদধারার বিস্তার মধ্যযুগীয় সাহিত্যকে বহুসাংস্কৃতিক রূপ দেয়। তাই তাঁর বিশ্লেষণে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যকে ভাবনির্ভর, আখ্যানভিত্তিক ও ধর্মাশ্রিত একটি সাহিত্যধারা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে গদ্যরীতির বিকাশ তখনো প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল।

আনিসুজ্জামান ১৮৭০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে বাঙালি মুসলমান লেখকদের উত্থান ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন। এখানে দেখা যায়, এ সময়কালে প্রায় চল্লিশজন মুসলমান লেখক সাহিত্যক্ষেত্রে পরিচিতি লাভ করেন এবং ক্রমে তাঁদের ভৌগোলিক বিস্তার বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি তাঁদের শিক্ষা ও পেশাগত অবস্থানও উন্নততর হতে থাকে, বিশেষত সরকারি চাকরির সংযোগে। তবে সমগ্র সময়পর্বকে একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, এঁদের অধিকাংশই সাধারণ পারিবারিক পটভূমি থেকে আগত এবং তাঁদের মূল অবস্থান ছিল প্রেসিডেন্সি ও ঢাকা বিভাগকেন্দ্রিক। তিনি বলেন, ‘১৮৭০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে প্রায় চল্লিশজন মুসলমান লেখক পরিচিতি লাভ করেছিলেন সাহিত্যেক্ষেত্রে। যত দিন গেছে, ততই তাঁরা বিস্তৃততর ভৌগোলিক এলাকা থেকে আর্বিভূত হয়েছেন—উন্নততর গড় শিক্ষা এবং অধিকতর সরকারি চাকরির ভাগ নিয়ে। এই পঞ্চাশ বছরের সময়টা অখণ্ডভাবে দেখলে বোঝা যাবে যে, তাঁরা প্রায় সকলেই এসেছেন সাধারণ পরিবার থেকে এবং এসব পরিবারের অবস্থান ছিল প্রধানত প্রেসিডেন্সি ও ঢাকা বিভাগে।’ (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ৪৯)

বাঙালি মুসলমান লেখকগোষ্ঠীর সামাজিক উত্থানের একটি ঐতিহাসিক রূপরেখা প্রদান করে। তিনি তথ্যভিত্তিকভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে শিক্ষা, চাকরি ও আঞ্চলিক কেন্দ্রিকতা সাহিত্যিক বিকাশকে প্রভাবিত করেছে। এতে সাহিত্যচর্চাকে বিচ্ছিন্ন সৃজনশীলতা হিসেবে না দেখে সামাজিক কাঠামোর ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে, যা গবেষণাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির একটি শক্তিশালী দিক। তিনি লিখেছেন, ‘মুসলমানের স্বরূপ’-নির্ধারণের ক্ষেত্রে একক ও সর্বজনীন সংজ্ঞার পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন বৌদ্ধিক ও ঐতিহাসিক প্রবণতার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। লেখক দেখিয়েছেন, মুসলমান পরিচয়ের ব্যাখ্যা কখনো সুফিবাদের আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গে সীমাবদ্ধ হয়েছে, কখনো অতীত ইসলামি গৌরব-চেতনার স্মৃতিচর্চায় আবর্তিত হয়েছে, আবার কখনো রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রেক্ষিতে তুর্কি সুলতানকেন্দ্রিক সমর্থনে রূপ নিয়েছে। মুসলমানের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে যেয়ে একেকজন নিজের প্রবণতা-অনুযায়ী জোর দিয়েছিলেন একেকদিকের ওপরে। তাই কখনো এর অর্থ হয়েছে সুফিবাদে আস্থাজ্ঞাপন, কখনোবা ইসলামের অতীত গৌরব গাথা-স্মরণ, কখনো হয়তো তুরস্কের সুলতানের প্রতি শর্তহীন সমর্থন। (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ৫৩)

লেখকের অবস্থানকে বলতে পারি, ইতিহাস ও পরিচয়চর্চার বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেয়। তিনি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শকে প্রাধান্য না দিয়ে মুসলমান পরিচয়ের বিভিন্ন পাঠকে বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। এতে ধর্মীয় পরিচয়ের একরৈখিক ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা উন্মোচিত হয় এবং বিষয়টি একটি সমালোচনামূলক ও গবেষণাধর্মী পরিসরে উন্নীত হয়। আনিসুজ্জামানের ভাষায় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের বাংলা সাহিত্যে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের নিষ্ঠুর চিত্র ফুটিয়ে তোলে। তৎকালীন অনেক হিন্দু সাহিত্যিক তাঁদের রচনায় মুসলিম চরিত্রগুলোকে নেতিবাচক বা হেয়ভাবে উপস্থাপন করতেন, যা শিক্ষিত ও উদারমনা মুসলমান সমাজের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। এ পক্ষপাতদুষ্ট সাহিত্যচর্চা কেবল শিল্পের মান ক্ষুণ্ন করেনি, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাসের দেওয়াল তৈরি করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পথে বিশাল বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিবর্জিত উদারপন্থী মুসলমান লেখকেরাও অভিযোগ করতে থাকলেন যে, হিন্দু লেখকদের রচনায় মুসলমান-চরিত্রে কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে বলে এ সাহিত্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পথে বড় অন্তরায়স্বরূপ। (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ৫৭)

​উদারপন্থী মুসলমান লেখকদের প্রতিবাদটি ছিল সাহিত্যের শৈল্পিক সততা ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। কোনো বিশেষ জাতিকে ধারাবাহিকভাবে কলঙ্কিত করা সাহিত্যের কাজ হতে পারে না; তাই তাঁদের এই যৌক্তিক অভিযোগটি বাংলা সাহিত্যকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ করে দিয়েছিল এবং সমালোচনার মাধ্যমেই সাহিত্যে একপক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গি দূর করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। পরবর্তীকালে নজরুলসহ অন্যান্য লেখকদের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে একটি অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিত্তি নির্মাণে সহায়তা করেছে।

তৎকালীন বাঙালি মুসলমানের জীবন ছিল ধর্মীয় আবেগ, আভিজাত্যের মোহ এবং আধুনিকতার চ্যালেঞ্জের জটিল সংমিশ্রণ। এখানে পাঁচটি ভাষার আবশ্যকতা মূলত একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংকটকে ফুটিয়ে তোলে, যেখানে পরকাল ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে আরবি-ফারসি, সর্বভারতীয় মুসলিম যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উর্দু এবং বৈষয়িক উন্নতির চাবিকাঠি হিসেবে ইংরেজিকে গ্রহণ করতে গিয়ে মাতৃভাষা বাংলা বারবার উপেক্ষিত বা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। লেখক মূলত দেখাতে চেয়েছেন যে, একজন বাঙালি মুসলমানকে একই সাথে তার ধর্মীয় শিকড়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সমকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে অস্বাভাবিক ভাষাগত বোঝার মধ্য দিয়ে যেতে হতো, যা তাদের শিক্ষাগত ও সামাজিক অগ্রযাত্রাকে মন্থর করে দিয়েছিল।

শিক্ষার প্রসঙ্গে ইংরেজি শিক্ষার আবশ্যকতার কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে বাঙালি মুসলমানদের ভাষা-সমস্যার কথা। লেখক-সাংবাদিকেরা বারংবার উল্লেখ করেন যে, অন্তত পাঁচটি ভাষার সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের পরিচয় সাধনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তার ধর্মীয় ভাষা আরবি, সংস্কৃতি ভাষা ফারসি, যোগাযোগের সাধারণ ভাষা উর্দু, সরকারি ভাষা ইংরেজি, আর মাতৃভাষা বাংলা। (আনিসুজ্জামান, ২০০৯: ৬৫)

এটি কেবল বাঙালি মুসলমানদের সংকট ছিল না, পাশাপাশি বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার অনন্য প্রস্তুতি। তৎকালীন বৈশ্বিক ও ভারতীয় প্রেক্ষাপটে টিকে থাকতে হলে একজন বাঙালি মুসলমানের জন্য ইংরেজি ছিল আধুনিকতার সেতু, আর আরবি-ফারসি ও উর্দু ছিল বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহ ও ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত থাকার সাংস্কৃতিক মাধ্যম। এ ভাষাগুলোর চর্চা তাদের কেবল সংকীর্ণ আঞ্চলিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, তাদের একাধারে ধর্মতাত্ত্বিক জ্ঞান ও আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বহুভাষিক অভিজ্ঞতাই তাদের নিজস্ব মাতৃভাষার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে এবং পরবর্তীকালে একটি আধুনিক ও আত্মসচেতন বাঙালি মুসলিম সমাজ গঠনে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

আনিসুজ্জামানের ‘স্বরূপের সন্ধানে’ বইটি বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, চিন্তা ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধর্মী প্রয়াস। এখানে তিনি ধর্ম, সমাজ, সাহিত্য ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে বাঙালি মুসলমানের মানসজগৎ গড়ে উঠেছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপান্তর ঘটেছে। বইটি কেবল তথ্যভিত্তিক বর্ণনা নয়; এটি একটি আত্মপরিচয় অনুসন্ধানী বৌদ্ধিক দলিল, যেখানে বাঙালি মুসলমানের সংকট, সম্ভাবনা ও ঐতিহাসিক গঠনপ্রক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

আজ ১৪ মে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী বাংলা জাতিসত্তার বৌদ্ধিক ইতিহাসে গভীর স্মরণক্ষণের দিন। আনিসুজ্জামান ছিলেন এমন একজন চিন্তাবিদ, যিনি বাঙালিত্বের ভিত্তিকে ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে তুলে ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ঐক্যবোধের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলা জাতিসত্তার বিকাশে তাঁর গবেষণা ও চিন্তাভাবনা আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি দেখিয়েছেন—বাঙালি পরিচয় কোনো সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা বহুত্ববাদী ও ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত একটি চেতনা।

লেখক: কবি ও গবেষক।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow