মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রথিতযথা আলেম, সংস্কারক, শিক্ষাবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ এবং অন্যতম ধর্মীয় অভিভাবক। তিনি ১৮৯৬ সালে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া থানার গওহরডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল মুন্সী মুহাম্মদ আবদুল্লাহ, যিনি ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
শামসুল হক ফরিদপুরীর অন্তরে শৈশব থেকেই শিক্ষা ও ধর্মীয় জীবনের প্রতি গভীর আকর্ষণ জন্মায়। প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি ইসলামী শিক্ষার উন্নত অধ্যয়নের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহরানপুর জেলার মজাহির উলুম এবং ভারতের বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে ধর্মীয় শিক্ষা, তাসাওয়ুফ, হাদিস, ফিকহ ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি ভারতের বিখ্যাত আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জন ও খিলাফত লাভ করেন।
শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি নিজ মাতৃভূমি বাংলায় ফিরে এসে ধর্মীয় শিক্ষাদান ও সমাজ সংস্কারে নিবেদিত হন। তিনি হাদিস, তাফসির ও ফিকহ বিষয়ে অধ্যাপনায় অতুলনীয় অবদান রাখেন। ফরিদপুরী ১৯২৮ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পরবর্তীকালে ১৯৩৫ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র যেমন—বড় কাটারা মাদ্রাসা, লালবাগ মাদ্রাসা, ফরিদাবাদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।
১৯৩৭ সালে তিনি নিজের গৃহগ্রামে গওহরডাঙ্গায় জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম খাদেমুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। এটি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হয়। তিনি শুধু মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেই থেমে থাকেননি, ১৯৪০ সালে খাদেমুল ইসলাম জামাত নামে একটি সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলেন, যার লক্ষ্য ছিল ইসলামী আদর্শকে সমাজে বাস্তবায়ন ও মানুষের নৈতিক জীবনধারা গড়তে সহায়তা করা। একই সময়ে তিনি আঞ্জুমান-ই-তাবলিগ-উল-কোরআন প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে খ্রিষ্টান প্রচার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে পারে।
শামসুল হক ফরিদপুরীর কর্মকাণ্ড শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের লাইনে সীমাবদ্ধ ছিল না—তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, নৈতিক পুনর্জাগরণ ও আত্মিক উৎকর্ষে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং একটি ইসলামী গঠিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন। এ ছাড়া তিনি তাবলিগ জামাত আন্দোলনের প্রসারেও অবদান রাখেন এবং সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।
মাওলানা ফরিদপুরী বাংলা ভাষায় প্রায় একশরও বেশি গ্রন্থ লিখেছেন এবং অনুবাদ করেছেন, যেগুলোর মধ্যে হাক্কানি তাফসীর, জীবনের পরিচয়, চরিত্র গঠন, বোহেশতি জেওয়ার এবং বুখারি শরিফ উল্লেখযোগ্য।
শামসুল হক ফরিদপুরীর ব্যক্তিগত জীবন যথেষ্ট পরিমিত ও খাঁটি ছিল। অহংকার, আত্মগৌরব, জাগতিক লালসা—সব তার জীবনে বিরল ছিল; বরং তিনি সবসময়ই খোদাভীতি, পরহেজগারি ও দীন-নিষ্ঠার সঙ্গে জীবনযাপন করেন। তিনি মানুষের মাঝে নৈতিকতা ও শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়ে যুগে যুগে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন।
১৯৬৯ সালের ২১ জানুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন এবং গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার উত্তরসূরি হিসেবে যেমন ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজও চলমান, তেমনি তার অনুপ্রেরণার আলোতে বহু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি দ্বীনের সেবা, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে নিয়োজিত।