স্মরণীয় মুসলিম মনীষী
মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি (১৮৭২-১৯৪৪) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান বিপ্লবী, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং প্রখ্যাত আলেম। তিনি কেবল একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, বরং ছিলেন এক প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও সংস্কারক। তার জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া কর্মকাণ্ড ইতিহাসের পাতায় তাঁকে কিংবদন্তি করে রেখেছে। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি ১৮৭২ সালের ১০ মার্চ পাঞ্জাবের শিয়ালকোট জেলার চিয়ানুওয়ালি গ্রামে একটি শিখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের চার মাস আগেই তিনি পিতৃহীন হন। তার বাল্যকালের নাম ছিল ভূটা সিং। পড়াশোনার একপর্যায়ে তিনি মাওলানা উবায়দুল্লাহ রচিত ‘তুহফাতুল হিন্দ’ বইটি পাঠ করেন, যা তার চিন্তাজগতে আমূল পরিবর্তন আনে। এরপরে তিনি শাহ ইসমাইল শহীদের ‘তাকবিয়াতুল ঈমান’ ও ‘আহওয়ালুল আখেরাত’ গ্রন্থ দুটি পড়ে ইসলামের তওহিদ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করে মাত্র ১৫ বছর বয়সে, ১৮৮৭ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সিন্ধুর বিখ্যাত সুফি সাধক হাফিজ মুহাম্মদ সিদ্দিক (রহ.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তার নামানুসা
মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি (১৮৭২-১৯৪৪) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান বিপ্লবী, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং প্রখ্যাত আলেম। তিনি কেবল একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, বরং ছিলেন এক প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও সংস্কারক। তার জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া কর্মকাণ্ড ইতিহাসের পাতায় তাঁকে কিংবদন্তি করে রেখেছে। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি ১৮৭২ সালের ১০ মার্চ পাঞ্জাবের শিয়ালকোট জেলার চিয়ানুওয়ালি গ্রামে একটি শিখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের চার মাস আগেই তিনি পিতৃহীন হন। তার বাল্যকালের নাম ছিল ভূটা সিং। পড়াশোনার একপর্যায়ে তিনি মাওলানা উবায়দুল্লাহ রচিত ‘তুহফাতুল হিন্দ’ বইটি পাঠ করেন, যা তার চিন্তাজগতে আমূল পরিবর্তন আনে। এরপরে তিনি শাহ ইসমাইল শহীদের ‘তাকবিয়াতুল ঈমান’ ও ‘আহওয়ালুল আখেরাত’ গ্রন্থ দুটি পড়ে ইসলামের তওহিদ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করে মাত্র ১৫ বছর বয়সে, ১৮৮৭ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সিন্ধুর বিখ্যাত সুফি সাধক হাফিজ মুহাম্মদ সিদ্দিক (রহ.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তার নামানুসারেই নিজের নামের সঙ্গে ‘সিন্ধি’ উপাধিটি যুক্ত করেন। ইসলামের জ্ঞান অর্জনে গভীর পিপাসা নিয়ে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি তৎকালীন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান (রহ.)-এর সান্নিধ্য লাভ করেন। শায়খুল হিন্দের স্নেহ, দীক্ষা এবং তার বিপ্লবী রাজনৈতিক দর্শন উবায়দুল্লাহ সিন্ধিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় সৈনিকে পরিণত করে। দেওবন্দে তিনি আরবি ভাষা, তাফসির, হাদিস এবং ইসলামী আইনের ওপর গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধির জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও রোমাঞ্চকর অধ্যায় হলো ‘রেশমি রুমাল আন্দোলন’। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে উপমহাদেশকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি ১৯১৫ সালে কাবুলে গমন করেন। সেখানে তিনি তুর্কি ও জার্মান মিশনের সঙ্গে আলোচনা করে একটি বৈপ্লবিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বাইরের শক্তির সহায়তায় ভারতের ভেতর থেকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ গড়ে তোলা। তিনি সাংকেতিক ভাষায় হলদে রঙের রেশমি কাপড়ে শায়খুল হিন্দের কাছে গোপন চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে ‘রেশমি রুমাল’ হিসেবে পরিচিত। দুর্ভাগ্যবশত ব্রিটিশ গোয়েন্দারা এই চক্রান্ত ফাঁস করে দিলে আন্দোলনটি ব্যর্থ হয়। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ১৯১৬ সালে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। শুরু হয় তার দীর্ঘ ২৩ বছরের নির্বাসিত জীবন। তিনি কাবুল, তুরস্ক এবং মক্কাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রবাসজীবন অতিবাহিত করেন। এই সময়কালেও তিনি ব্রিটিশবিরোধী চেতনা প্রচারে অবিচল ছিলেন। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৯৩৮ সালে তিনি পুনরায় ভারতে ফিরে আসেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি তার লেখা এবং বক্তৃতার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন। অবশেষে ১৯৪৪ সালের ২১ আগস্ট এই মহান বিপ্লবী মৃত্যুবরণ করেন। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি ছিলেন একাধারে বিপ্লবী ও শিক্ষাবিদ। তিনি হায়দরাবাদে ‘দারুর রাশাদ’ নামে একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন এবং ১৯০৯ সালে ‘জামিয়াতুল আনসার’-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের অর্থনৈতিক নীতির মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করে ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
What's Your Reaction?