হরমুজ সংকটে ভেনেজুয়েলার তেল কি ভারতকে বাঁচাতে পারবে?   

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে ভারত। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে ভেনেজুয়েলার তেল। চলতি মাসে ভেনেজুয়েলা ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে ভারতে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।  এদিকে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ আগামী সপ্তাহে ভারত সফরে যেতে পারেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সফরে তেল রপ্তানি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ভেনেজুয়েলার তেল? দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার কাছে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলের মজুত। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাবে, দেশটিতে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ। তবে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৭ সালে

হরমুজ সংকটে ভেনেজুয়েলার তেল কি ভারতকে বাঁচাতে পারবে?   
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে ভারত। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে ভেনেজুয়েলার তেল। চলতি মাসে ভেনেজুয়েলা ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে ভারতে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।  এদিকে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ আগামী সপ্তাহে ভারত সফরে যেতে পারেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সফরে তেল রপ্তানি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ভেনেজুয়েলার তেল? দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার কাছে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলের মজুত। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাবে, দেশটিতে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ। তবে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পের বড় অংশ জাতীয়করণ করেন। এর ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রভাব কমে যায় এবং তেল আয় সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যয় করা শুরু হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা দেশটির তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ প্রায় বন্ধ করে দেয়।  বর্তমানে মার্কিন কোম্পানি শেভরন ভেনেজুয়েলায় উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয় একমাত্র বড় মার্কিন তেল কোম্পানি। তারা রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সঙ্গে যৌথভাবে দৈনিক প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে। এছাড়া প্রায় দুই দশক পর আবারও ভেনেজুয়েলায় ফেরার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে এক্সনমোবিল। হরমুজ সংকটে ভারতের চাপ ভারতের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকই সাধারণত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। একই পথে আসে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও (এলএনজি)। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাত তীব্র হওয়ায় হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে ভারত বড় ধরনের জ্বালানি ঝুঁকিতে পড়েছে। ভারত সম্প্রতি সাত বছর পর আবার ইরান থেকে তেল আমদানি শুরু করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হওয়ার পর এপ্রিল মাসে সীমিত পরিসরে সেই আমদানি পুনরায় শুরু হয়। তবে চলমান সংঘাত ও ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে মে মাসে আবারও সেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে সৌদি আরব থেকেও ভারতের তেল আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এপ্রিল মাসে যেখানে দৈনিক প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল আসত, মে মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে। ভারতীয় কর্মকর্তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌ নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। বর্তমানে ওই অঞ্চলে অন্তত ১৩টি ভারতীয় জাহাজ আটকে আছে বলে জানা গেছে। হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপকূলের কাছে ভারত-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। একটি ভারতীয় পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আগুন লাগার পর ওমানের জলসীমায় ডুবে যায়। হামলাটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেন ভারতকে লক্ষ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র? ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে ভারত রাশিয়া থেকে বেশি তেল কেনা শুরু করে। এতেই অসন্তুষ্ট হয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ভারতীয় অর্থ রাশিয়ার যুদ্ধ তহবিলকে শক্তিশালী করছে।  ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফেব্রুয়ারিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ভারত ধীরে ধীরে রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে বেশি তেল কিনবে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চাইছেন ভারত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করুক। আগামী ২৩ থেকে ২৬ মে ভারত সফরে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সফরে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।  রুবিও বলেছেন, ‘ভারত যত বেশি জ্বালানি কিনতে চাইবে, আমরা তত বেশি বিক্রি করতে চাই। ভেনেজুয়েলার তেল নিয়েও বড় সুযোগ রয়েছে।’ বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে একদিকে ইরানের প্রভাব কমানো, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার তেল খাতকে আবার মার্কিন বলয়ে আনা দুটো লক্ষ্যই অর্জন করতে চায় তারা।  ভেনেজুয়েলার তেলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক  ভারতের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি সম্পর্ক নতুন নয়। ২০০৮ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। ২০১০ সালে ভারতীয় কনসোর্টিয়াম ওরিনোকো অয়েল বেল্টের কারাবোবো-১ প্রকল্পে অংশীদারিত্ব পায়। ২০১২ সালে চীনকে ছাড়িয়ে এশিয়ায় ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা হয়ে ওঠে ভারত। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কঠোর হওয়ার আগে ভেনেজুয়েলা ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী। ভারতের রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের গুজরাটের জামনগর রিফাইনারিতে ভেনেজুয়েলার অতিভারী ও সালফারসমৃদ্ধ অপরিশোধিত তেল দক্ষতার সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত করা যায়।  তবে ভারতের সব রিফাইনারি এই ধরনের ভারী তেল পরিশোধনে সক্ষম নয়। তারপরও চলতি মাসে ভেনেজুয়েলা ভারতকে দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল তেল সরবরাহ করেছে, যা এপ্রিল মাসে ছিল প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ব্যারেল। এর আগের নয় মাস ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে কোনো তেল আমদানি করেনি। বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানি বেড়ে দৈনিক প্রায় ৪৯ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে ডেলসি রদ্রিগেজ ও মার্কো রুবিওর ভারত সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সফর ভবিষ্যতে ভারত-ভেনেজুয়েলা তেল বাণিজ্য আরও বাড়ানোর পথ তৈরি করতে পারে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow