‘হান্টাভাইরাস’ বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্ক, কতটা ভয়ংকর

আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে বিলাসবহুল এক ভ্রমণ মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। এমভি হন্ডিয়াস ক্রুজে শিপে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া রহস্যময় সংক্রমণে তিনজনের মৃত্যু এবং একাধিক যাত্রীর গুরুতর অসুস্থতা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে এক পরিচিত হলেও কম আলোচিত ভাইরাসের নাম হান্টাভাইরাস। হঠাৎ আতঙ্ক, পুরোনো ভাইরাস হান্টাভাইরাস নতুন কিছু নয়। এটি একটি জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ পশু থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। অনেকটা করোনার মতোই এটি আরএনএ ভাইরাস, যা দ্রুত মিউটেশন ঘটাতে পারে। সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহে এই ভাইরাস বাস করে এবং তাদের মলমূত্র, লালা বা দেহাবশেষ থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৫ সালে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে, যখন অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী এই সংক্রমণে মারা যান বলে খবর প্রকাশিত হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই ভাইরাসটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে। এবার সমুদ্রের মাঝখানে একটি প্রমোদতরিতে সম্ভাব্য সংক্রমণ আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যেভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস হান্টাভাইরাস সরাসরি বাতাসে ভাসমান ধুলিকণার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে যেখানে ইঁদুরের উপস্থ

‘হান্টাভাইরাস’ বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্ক, কতটা ভয়ংকর

আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে বিলাসবহুল এক ভ্রমণ মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। এমভি হন্ডিয়াস ক্রুজে শিপে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া রহস্যময় সংক্রমণে তিনজনের মৃত্যু এবং একাধিক যাত্রীর গুরুতর অসুস্থতা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে এক পরিচিত হলেও কম আলোচিত ভাইরাসের নাম হান্টাভাইরাস।

হঠাৎ আতঙ্ক, পুরোনো ভাইরাস

হান্টাভাইরাস নতুন কিছু নয়। এটি একটি জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ পশু থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। অনেকটা করোনার মতোই এটি আরএনএ ভাইরাস, যা দ্রুত মিউটেশন ঘটাতে পারে। সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহে এই ভাইরাস বাস করে এবং তাদের মলমূত্র, লালা বা দেহাবশেষ থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

২০২৫ সালে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে, যখন অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী এই সংক্রমণে মারা যান বলে খবর প্রকাশিত হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই ভাইরাসটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে। এবার সমুদ্রের মাঝখানে একটি প্রমোদতরিতে সম্ভাব্য সংক্রমণ আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

jago

যেভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস

হান্টাভাইরাস সরাসরি বাতাসে ভাসমান ধুলিকণার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে যেখানে ইঁদুরের উপস্থিতি বেশি, সেখানে ঝুঁকি বাড়ে। গুদামঘর, খামার বা পুরোনো বাড়িতে জমে থাকা ধুলা ও ময়লার মাধ্যমে এই ভাইরাস সহজেই ছড়াতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংক্রমণের শুরুতে এর লক্ষণ খুব সাধারণ- জ্বর, মাথাব্যথা, পেশির ব্যথা, দুর্বলতা। ফলে অনেক সময় রোগটি ধরা পড়ে না। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

শরীরে যেভাবে আঘাত হানে

ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর প্রথমে ফুসফুস ও কিডনিকে আক্রমণ করে। ধীরে ধীরে এটি শ্বাসনালিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ তৈরি করে। এর ফলে দেখা দেয় হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ যেখানে রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, ফুসফুসে পানি জমে যায় এবং দ্রুত জীবনসংকট দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু অঞ্চলে এই ভাইরাসের কারণে হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম, দেখা যায়, যা কিডনির ক্ষতি এবং রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, এইচপিএস আক্রান্তদের মৃত্যুহার প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে এই ভাইরাসকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

চিকিৎসার সীমিত উপায়

হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা এখনো নেই। চিকিৎসা বলতে মূলত উপসর্গ অনুযায়ী সাপোর্টিভ কেয়ার দেওয়া হয়-বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ। গুরুতর অবস্থায় রোগীকে ভেন্টিলেটর বা উন্নত লাইফ সাপোর্টে রাখতে হয়।

সংক্রমণের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে ১ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই দীর্ঘ ‘নীরব সময়’ ভাইরাসটিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

যারা ইঁদুরের সংস্পর্শে বেশি থাকেন- যেমন কৃষক, গুদাম শ্রমিক বা গ্রামীণ পরিবেশে বসবাসকারী মানুষদের তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তবে সাধারণ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক আতঙ্কের কারণ কম হলেও সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়?

হান্টাভাইরাস সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। তবে আর্জেন্টিনা ও চিলিতে খুব বিরল কিছু ক্ষেত্রে এমন সংক্রমণের নজির পাওয়া গেছে। ক্রুজের ঘটনাটি তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যাত্রীরা বিভিন্ন দেশে ফিরে যাওয়ায় সংক্রমণ ছড়িয়েছে কি না, তা জানতে সময় লাগবে।

এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, সব বিপদ চোখে দেখা যায় না। হান্টাভাইরাস বিরল হলেও মারাত্মক হতে পারে। তাই প্রয়োজন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করা এবং সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।

সূত্র: সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি

এসএকেওয়াই

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow