হাবিব হেলালের পাঁচটি কবিতা

ধোঁয়াশার মৎস্য সংসার ঠোঁটের নদীজুড়ে মদির নিঃশ্বাসচিবুক ছোঁয়া রোদে তুমি স্নান করোস্মৃতির হরফে আমি পঙক্তি সাজাই ​ধুলোয় আঁকা তোমার রোজকার গ্রাফিতিখুঁজে পাইজ্যোৎস্নালোকেআকুল পাথার ধোঁয়াশার মৎস্য সংসার, অভিমানে লীন... ​স্বতন্ত্র নদী নেই কোনোহৃত শৈশব—নাটাই-সুতোয় বন্দি সুরেলা নক্ষত্র ​নিরালা দুপুরে ওড়ার তৃষ্ণা খুব;একমুঠো আকাশ দাওমেঘমল্লারে ডানা হতে চাই... ***** শৈল্পিক অ্যানাটমি নিঃসঙ্গ প্রজাপতি ডানা ঝাপটায়কচ্ছব-সমকাল;ঢেউয়ে ঢেউয়ে ওড়ে দগ্ধ পরাগ ঠোঁটের ভাঁজে স্মৃতির নুন... আয়নায় হলুদ বিভাচিনে নিই নিজেরই ভাঙা-মুখএখানে কেউ নেইশুধু আয়ুর খসখসানি একমুঠো রোদের তৃষ্ণা বুকেকথারা তরল, গলতে গলতেসময় শুষে নেয় চেনা আদল মৃত্যুর যে শৈল্পিকব্যবচ্ছেদেনিজেকেই শাণ দিই যাপিত দহনে... ***** বিকেল বিষণ্ন নদী মৌন-মুখর শিল্পের গ্রামআমি আঁকছিএকজোড়া বিষণ্ন-নদী আফাল’র জলবৃত্তে প্রোথিত—তেজস্বী ঢেউবাউলের আঙুলেধুকপুক করে জ্যোৎস্নার রিদম মুঠোয় তুলে বানভাসি ‘রু’হাওরের প্রান্তরেখায়বসে একাঠোঁটের তৃষ্ণাজুড়েগেঁথে যাই পঙ্‌ক্তির-বেদনা... ***** জন্মান্ধ নদী, জলরং ডানা বুকের বাঁ-পাশে একটা জন্মান্ধ নদীমরমি অবগাহনে আমি কুড়াই সুখ;দৃষ্টি

হাবিব হেলালের পাঁচটি কবিতা

ধোঁয়াশার মৎস্য সংসার

ঠোঁটের নদীজুড়ে মদির নিঃশ্বাস
চিবুক ছোঁয়া রোদে তুমি স্নান করো
স্মৃতির হরফে আমি পঙক্তি সাজাই

​ধুলোয় আঁকা তোমার রোজকার গ্রাফিতি
খুঁজে পাই
জ্যোৎস্নালোকে
আকুল পাথার

ধোঁয়াশার মৎস্য সংসার, অভিমানে লীন...

​স্বতন্ত্র নদী নেই কোনো
হৃত শৈশব—
নাটাই-সুতোয় বন্দি সুরেলা নক্ষত্র

​নিরালা দুপুরে ওড়ার তৃষ্ণা খুব;
একমুঠো আকাশ দাও
মেঘমল্লারে ডানা হতে চাই...

*****

শৈল্পিক অ্যানাটমি

নিঃসঙ্গ প্রজাপতি ডানা ঝাপটায়
কচ্ছব-সমকাল;
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ওড়ে দগ্ধ পরাগ

ঠোঁটের ভাঁজে স্মৃতির নুন...

আয়নায় হলুদ বিভা
চিনে নিই নিজেরই ভাঙা-মুখ
এখানে কেউ নেই
শুধু আয়ুর খসখসানি

একমুঠো রোদের তৃষ্ণা বুকে
কথারা তরল, গলতে গলতে
সময় শুষে নেয় চেনা আদল

মৃত্যুর যে শৈল্পিক
ব্যবচ্ছেদে
নিজেকেই শাণ দিই যাপিত দহনে...

*****

বিকেল বিষণ্ন নদী

মৌন-মুখর শিল্পের গ্রাম
আমি আঁকছি
একজোড়া বিষণ্ন-নদী

আফাল’র জলবৃত্তে প্রোথিত
—তেজস্বী ঢেউ
বাউলের আঙুলে
ধুকপুক করে জ্যোৎস্নার রিদম

মুঠোয় তুলে বানভাসি ‘রু’
হাওরের প্রান্তরেখায়
বসে একা
ঠোঁটের তৃষ্ণাজুড়ে
গেঁথে যাই পঙ্‌ক্তির-বেদনা...

*****

জন্মান্ধ নদী, জলরং ডানা

বুকের বাঁ-পাশে একটা জন্মান্ধ নদী
মরমি অবগাহনে আমি কুড়াই সুখ;
দৃষ্টির কার্নিশে অনন্য নিখাদ রূপ
ভেজা চুলে ঝরে নক্ষত্রচূর্ণ—উজান স্রোত

শতাব্দী-প্রাচীন অরণ্যে তোমার বিচরণ
বহতার ঘ্রাণে মিশে থাকে আফিমের ঘোর;
তৃষ্ণার লোমকূপে জাগে স্পর্শের বিস্ময়—
জল থেকে জলোচ্ছ্বাসে তোমার আলিঙ্গনে
ভেঙে পড়ে সভ্যতার সমস্ত প্রাচীর

গেরুয়া আঁচলে আমি নিথর, সমর্পিত;
গোপন আখ্যানে অক্ষর আজ নির্বাক
অথচ তুমি যখন আসো কবিতা হয়ে
—নক্ষত্র-পায়ে হেঁটে, আলোর নিঃশব্দে;
আমার অন্ধ কলম আঁকে জলরং ডানা

উড়ে বসে প্রেমশক্তি ঘ্রাণাতুর ঠোঁটে
দৃষ্টিহীন হৃদয়ে ফোটে জ্যোৎস্নালোক;
গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা ঘনালে ধীরে
তুমি আসো বিরহে, মুছে যায় সব অন্ধকার
শিউলি-ফোটা চোখে ফিরে আসে প্রণয়-পুরাণ...

*****

মৃত্যুর আগে মরে যাওয়ার রিহার্সেল

​আমার দাদি বলতেন—যে মাটি বেশি সহে
সে মাটিতেই গোর দেয় মানুষ
আমরা সহেছি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম;
ভেবেছি সহ্যই সাহস
এখন বুঝি, সহ্যের আরেক নাম ধীরে ধীরে মরা

​হাটে গেলে দেখি
বাজারি দর বাড়ে, শব্দের অবমূল্যায়ন ঘটে প্রতিদিন;
যে মানুষ সত্য বলে, তার দোকান ওঠে আগে
বাকিরা বেচে হাসি, মিথ্যা আর মৌসুমি আনুগত্য

​আমাদের প্রেম এক জীর্ণ সাবলেট;
দেওয়ালে পূর্বসূরির ঘাম আর স্বপ্নের ধুলো
থেকেছি কিছুদিন
তারপর নোটিশ এসেছিল জানালায়
আমরা শুধু পড়ার সময় পাইনি

​মধ্যরাতের স্ক্রোল-ডাউনে
মৃত্যু আর রাষ্ট্রীয় উল্লাস মিলেমিশে একাকার;
দৃষ্টিজুড়ে ভেসে ওঠে দুটো খবর:
কেউ মরেছে; অথবা দেশ ভালো আছে
কোনটা মিথ্যে—তা আর আলাদা করতে পারি না;
আমরা শুধু রাতভর ভুলে যাওয়ার মহড়া দিই

​মা বলেন—মাথা নিচু রাখো
বাবা বলেন—সময় বুঝে চলো
সবাই ঠিকই বলেন, আমিও জানি
তবুও রাতে একা বসে বুকের ভেতর অবাধ্য কণ্ঠ
এখনো বলে ওঠে—এটা ঠিক না

ভেতরের সুর যেদিন চুপ হবে
সেদিন আমার নামের পাশে কেবল একটি তুচ্ছ তারিখ বসবে;
বাকি সব—
গোরস্তানের নীরবতা।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow