হামের টিকা সংকট নাকি অবহেলা, প্রাদুর্ভাবের নেপথ্যে কী?
দেশে সন্দেহজনক হাম আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৮৮৩ জন হয়েছে। এর মধ্যে ১২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। হামের এই প্রাদুর্ভাব গত দুই দশকের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি। গত বছর টিকার ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং টিকা কেনার দীর্ঘসূত্রতাকে দুষলেও বস্তুতপক্ষে সমস্যা কোথায় এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, ২০২৩ সালে টিকাদানে শতভাগ সাফল্য অর্জন করে সরকার। ২০২৪ সালে এসে এটা ৯৭ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৯৩ শতাংশে নেমে আসে। শিডিউল অনুযায়ী ২০২৪-২৫ সালে টিকা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল কিন্তু হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকাদানের কাজে নিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা দীর্ঘসময় কর্মবিরতি করে আন্দোলন করেন। এসবের কারণে কিছুটা ভাটা পড়ে টিকাদানে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতের ৩৮টি অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হওয়ায় সরাসরি রাজস্ব খাত থেকে টিকা কিনতে গিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাধার সম্মুখীন হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর বাইরেও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিশুর জন্মের নবম মাসে হাম-রুবেলার প্রথম ডোজ এবং ১৬তম মাসে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া
দেশে সন্দেহজনক হাম আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৮৮৩ জন হয়েছে। এর মধ্যে ১২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। হামের এই প্রাদুর্ভাব গত দুই দশকের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি। গত বছর টিকার ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং টিকা কেনার দীর্ঘসূত্রতাকে দুষলেও বস্তুতপক্ষে সমস্যা কোথায় এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে টিকাদানে শতভাগ সাফল্য অর্জন করে সরকার। ২০২৪ সালে এসে এটা ৯৭ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৯৩ শতাংশে নেমে আসে। শিডিউল অনুযায়ী ২০২৪-২৫ সালে টিকা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল কিন্তু হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকাদানের কাজে নিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা দীর্ঘসময় কর্মবিরতি করে আন্দোলন করেন। এসবের কারণে কিছুটা ভাটা পড়ে টিকাদানে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতের ৩৮টি অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হওয়ায় সরাসরি রাজস্ব খাত থেকে টিকা কিনতে গিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাধার সম্মুখীন হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
এর বাইরেও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিশুর জন্মের নবম মাসে হাম-রুবেলার প্রথম ডোজ এবং ১৬তম মাসে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া লাগে। এরপর শিডিউলে আর কোনো টিকা নেই। দুই ডোজের মাঝখানে সময়ের ব্যবধানে অনেকে ভুলে যান দ্বিতীয় টিকা দিতে। অথবা অবহেলা করে দেন না। আবার এখনও দেশের একটা জনগোষ্ঠী আছে, যারা টিকাদানে অনাগ্রহী। এটাকে বিদেশিদের ফাঁদ বলে মনে করে।
এসবের কারণে এবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যখাতের নানা সীমাবদ্ধতায় নতুন সরকার সামাল দিতেও হিমশিম খাচ্ছে। তবে, তারা এরই মধ্যে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করে কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
গত সপ্তাহে ইপিআই কর্মসূচির উপপরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘টিকার সংকট নেই। সরবরাহ আছে। তবে মজুত সীমিত।’
হাম সন্দেহে হাসপাতালে ৯৮৮৩
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ২২৪ জনের। মারা গেছে একজন। এছাড়া সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৩৬ জন। হাম সন্দেহে মারা গেছে ১০ জন।
১৫ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত হাম শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৯৮ জনের। সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৯ হাজার ৮৮৩ জন। হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ২১ জন এবং সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে ১২৮ জন।
নতুন ভ্যারিয়েন্ট কি না?
হামের টিকা পাওয়া না পাওয়া বা সংকটের আলোচনার মধ্যে উঠে এসেছে, টিকা দেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে ৬৫ শতাংশ শিশু। সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ৬৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে হাম পজিটিভ রোগী পাওয়া গেছে ৩৪টি। সেই হিসাবে আক্রান্তের হার প্রায় ৫৪ শতাংশ।
এর বাইরেও সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে এলে বা হামে মারা গেছে বললেও পরীক্ষায় দেখা যায়, ৬ শতাংশের এক শতাংশ প্রকৃতপক্ষে হামে আক্রান্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোগতত্ত্ববিদ তারেকুল ইসলাম লিমন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা মিসেলস বা হামের নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্ট কি না? এটা আমরা জানি না। এটা গবেষণার দাবি রাখে।’
আরও পড়ুন
হামের টিকা সংকট ও অপুষ্টিতে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি
হামের সংক্রমণ ঠেকাতে যে পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০ উপজেলায় দেওয়া হচ্ছে হামের টিকা
জেলায় জেলায় চলছে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি
সমস্যা কোথায়?
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম বা মিজলসের টিকা দুটি। প্রথম টিকাটি দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। এর আগে দেওয়া হয় না। কারণ বাচ্চারা মায়ের পেট থেকেই কিছু বিশেষ এন্টিবডি নিয়ে জন্মায়, যা হামের মতো কিছু অসুখ থেকে তাকে সুরক্ষা দেয়। ৯ মাসের আগে টিকা দিলে ওই এন্টিবডিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ৬ থেকে ৯ মাস বয়সের মধ্যে জন্মসূত্রে পাওয়া ওই এন্টিবডি কিছুটা কমে আসে। তখন প্রথম ডোজের টিকা দিতে হয়। প্রথম ডোজের টিকা দিলে ৯৫ শতাংশ শিশুর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। দ্বিতীয় ডোজটি দেওয়া হয় ১৬ মাস বয়সে। ওটা বুস্টার ডোজ। তাতে ৯৭ শতাংশ শিশুর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়।
তাদের দাবি, বাকি ৩ শতাংশ শিশুর আক্রান্তের শঙ্কা বেড়ে যায় যদি ভাইরাল ব্যাপকতা বেশি হয়, যেটা মহামারিতে হয়। দুই বছরের নিচের বাচ্চারা যদি টিকার আওতায় না থাকে, দুটি ডোজ কমপ্লিট না করে তাহলে তারা ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হতে পারে। এই অধিক সংখ্যক আক্রান্তের কারণে ভাইরাসের শক্তি বেড়ে যায় এবং ব্যাপকতাও বেড়ে যায়। ফলে টিকা নেওয়া শিশুরাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। ২ থেকে ৭ বছরের শিশুদের মধ্যে এর আশঙ্কা অপেক্ষাকৃত বেশি। শুধু শিশু নয় বয়স্ক ব্যক্তি, ক্যানসার আক্রান্ত রোগী, ডায়াবেটিস রোগী, গর্ভবতী নারী অর্থাৎ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তারাও ঝুঁকিতে পড়ে।
চিকিৎসকদের মতে, ব্যাপক হারে টিকা দেওয়া গেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ৩ শতাংশ শিশুও এর সুবিধা পায়। এটাকে বলে হার্ড ইমিউনিটি। কারণ ভাইরাসের শক্তি কমায় রোগের ব্যাপকতাও কমে যায়। এ কারণেই আমরা দেখি পোলিও টিকা শতভাগ কার্যকর না হলেও কোনো কোনো দেশ শতভাগ পোলিওমুক্ত হয়ে যেতে পারে। তাই টিকার আওতা যথেষ্ট না হলে কম বেশি সবাই ঝুঁকিতে পড়বে।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘হুট করে হাম সংক্রমণ বাড়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। শিশুর ৯ মাস ও ১৬ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের মা-বাবাদের টিকা দেওয়ার প্রতি অনীহা রয়েছে। এছাড়া টিকাদান কেন্দ্রে সমস্যা আছে। সব জায়গায় টিকা থাকে না। আবার শিশুদের সর্দি-কাশি থাকলেও টিকা দেয় না। পরে আর অনেকে বাচ্চাদের নিয়ে যান না, গেলে টিকা পান না এমন জটিলতা তৈরি হয়।’
আরও পড়ুন
হাম রোধে সাড়ে ৫ বছর ক্যাম্পেইন চলেনি, মজুত করা হয়নি টিকা
জনবল সংকটে হামের টিকাদান কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা-ভোগান্তি
সিলেটে হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হাজারো শিশু
৫ বছরের কম বয়সী সব শিশু পাবে, আগে নেওয়া থাকুক বা না থাকুক
তিনি বলেন, ৫-৬ বছর পরপর এরকম প্রকোপ বাড়ে। যার কারণে সরকার থেকে পাঁচ বছর পরপর বুস্টার দেওয়া হয়। ২০২০ এ দেওয়া হয়েছে। গত বছর দেওয়ার কথা ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়তো বুঝতে পারেনি। তাই তারা সে আয়োজন করেনি।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের লক্ষ্মণ মূলত জ্বর ও র্যাশ। কিন্তু অনেক বাচ্চা র্যাশ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু তাদের হাম না। ছোট বাচ্চাদেরও হচ্ছে। সাধারণত ৬ মাসের ওপরে বাচ্চাদের হয়। কিন্তু এবার ছোটদেরও হচ্ছে। এটা চরম সংক্রামক, হাঁচি-কাশিতে ছড়ায়। এবারের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক। কারও ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া হতে পারে। পেটে বা লিভারে ইনফেকশন হতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। যক্ষ্মা পর্যন্ত দেখা দেয়।
আরও পড়ুন
সচেতনতার অভাব ও সিস্টেম দুর্বলতায় হামের বিস্তার
নবজাতকের হাম আতঙ্ক, যা করবেন অভিভাবক
হু হু করে বাড়ছে হামের রোগী, ভোগাচ্ছে অবকাঠামো-জনবল সংকট
ওপি বাতিলের সিদ্ধান্তে আরও ‘অসুস্থ’ স্বাস্থ্যখাত
হামে করণীয়
হাম নিয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, হাম বর্তমানে শিশুদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে যারা ছোটবেলায় টিকা নেয়নি তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে কিছু ক্ষেত্রে বড়দের মধ্যেও এ রোগ শনাক্ত হচ্ছে। রোগের শুরুতে সাধারণত জ্বর থাকে তিন–চারদিন। এরপর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি (র্যাশ) দেখা দেয়। এর সঙ্গে তীব্র শরীর ব্যথা, বমি ভাব, খেতে না পারা—এসব উপসর্গ থাকতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জটিলতাও দেখা দিচ্ছে, বিশেষ করে সর্দি-কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, সময়মতো টিকা নেওয়াই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দেশে বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি ও টিকার সংকটের জন্য পূর্ববর্তী সরকারগুলোকে দায়ী করেন। সর্বশেষ সোমবার জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্যের নোটিশের জবাবে তিনি জানিয়েছেন, গত সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলা টিকার কোনো ক্যাম্পেইন না হওয়ায় এবং টিকা মজুতে অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে বর্তমানে শিশুরা প্রাণঝুঁকিতে পড়েছে। তবে বর্তমান সরকার জরুরি ভিত্তিতে ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতি চার বছর পরপর হাম-রুবেলা টিকার ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও গত সাড়ে পাঁচ বছর ধরে তা হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমানে তাদের মধ্যেই হামের প্রাদুর্ভাব বেশি। এছাড়া পূর্ববর্তী সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, ফলে হামসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ টিকার মজুতে মারাত্মক সংকট দেখা দেয়।
এসইউজে/এমএমএআর/ এমএফএ
What's Your Reaction?
