হামের প্রাদুর্ভাব: শিশুদের মানসিক বিকাশে বাড়ছে ঝুঁকি
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে কেউ না কেউ। হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তিনদিন অনলাইন ও তিনদিন অফলাইন বা সশরীরে ক্লাস নেওয়ার জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। হামের এই পরিস্থিতিতে শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে। তাদের মানসিক বিকাশে বাড়ছে ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শিশু নয়—অভিভাবকদের আতঙ্কও শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলে। সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর বা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার তথ্য পরিবারে ভীতি সৃষ্টি করে, যা শিশুর মনোজগতে ছাপ ফেলে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩৫ জনে। এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ২১৮ জন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ হাজার ৩২৫ জন। এছাড়া হাম সন্দেহে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হ
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে কেউ না কেউ। হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তিনদিন অনলাইন ও তিনদিন অফলাইন বা সশরীরে ক্লাস নেওয়ার জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
হামের এই পরিস্থিতিতে শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে। তাদের মানসিক বিকাশে বাড়ছে ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শিশু নয়—অভিভাবকদের আতঙ্কও শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলে। সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর বা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার তথ্য পরিবারে ভীতি সৃষ্টি করে, যা শিশুর মনোজগতে ছাপ ফেলে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩৫ জনে। এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ২১৮ জন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ হাজার ৩২৫ জন। এছাড়া হাম সন্দেহে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৬ হাজার ৯১১ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ২৩ হাজার ২২৫ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
হাম নিয়ে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি ছয় মাস বয়সী সাহিল। তারা বাবা শিমুল জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথমে সর্দি কাশি ও জ্বর। চোখ খুলতে পারে না। পরে র্যাশ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে নিয়ে আসার পর বলল, হাম। ভর্তি রাখছে। এখন বেশিরভাগ সময় জ্বর থাকে অনেক। বাচ্চার মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। রাতে কাউকে ঘুমাতে দেয় না, কান্নাকাটি করে।’
আরও পড়ুন
হামের প্রকোপ না কমা পর্যন্ত স্কুল বন্ধ চেয়ে রিট, শুনানি সোমবার
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু
বান্দরবানে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা আমদানি করা হয়নি: প্রধানমন্ত্রী
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার আনিকা তাহেরা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার ১৪ মাসের বাচ্চা হামে আক্রান্ত হয়েছিল। প্রথমে জ্বর, ঠাণ্ডা ছিল বেশ কয়েকদিন। তখন কিছু খেতে চাইতো না। এরপর ঘামাচির মতো র্যাশ উঠছিল। জ্বর খুব বেশি ছিল না, ৯৯ আবার কখনো ১০০ বা ১০১। তবে নাকে সর্দি ছিল অনেক।
শিশুর আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, জ্বর থাকাকালীন খুব খিটখিটে মেজাজ ছিল। আমার কাছে ছাড়া অন্য কারো কাছে যেতে চাইতো না। অন্য কোনো বাড়তি খাবারও খেতে চাইতো না। ওষুধ খাওয়াতে গেলে ওর মধ্যে একটা ভয় কাজ করতো। ড্রপ দেখলেই কান্নাকাটি শুরু করে দিত।
যোগাযোগ করা হলে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. সাদিয়া আফরিন বলেন, হামের সমস্যায় শিশুরা যখন দীর্ঘদিন স্কুলে যেতে পারে না বা বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা কমে যায়, তখন তাদের সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক শিশু ঘরে বন্দি হয়ে পড়ায় মোবাইল বা ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত হয়ে যেতে পারে। এর ফলে মুড সুইং, খিটখিটে আচরণ, এমনকি হতাশার লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, একটি শিশুর বিকাশের জন্য স্কুল শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, বরং এটি তার সামাজিক ও মানসিক গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। খেলাধুলা, সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব কিছুই শিশুর সুস্থ বিকাশে ভূমিকা রাখে। কিন্তু রোগের আতঙ্কে যখন এসব সীমিত হয়ে যায়, তখন শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
করণীয় কী?
ডা. সাদিয়া আফরিনের মতে, হামের মতো রোগ প্রতিরোধযোগ্য। সময়মতো টিকা নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সরকারিভাবে পরিচালিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার ও আশপাশের মানুষদের সচেতন করা প্রয়োজন, বিশেষ করে যারা তথ্যের অভাবে পিছিয়ে আছে।
তিনি বলেন, ‘শুধু নিজের সন্তান নয়, আশপাশের সব শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সবাই নিরাপদ থাকলেই একটি শিশু সত্যিকার অর্থে নিরাপদ থাকবে।’
আরও পড়ুন
শুধু টিকা দিয়েই শিশুদের হাম প্রতিরোধ সম্ভব
হামের উপসর্গ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে আরও এক শিশুর মৃত্যু
কুমিল্লায় হামের প্রকোপ বাড়ছে, আরও এক শিশুর মৃত্যু
কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ২৮
এছাড়া, কোনো শিশু আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দেন— শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা, তাদের ভয় বা উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া, নিয়মিত রুটিন বজায় রাখা এবং ঘরের ভেতরে বিকল্প খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত রাখা। সব মিলিয়ে, সচেতনতা, সময়মতো টিকাদান এবং মানসিক সহায়তা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসির মারুফ জাগো নিউজকে বলেন, হামের কয়েক বছর পর এর একটি জটিলতা হিসেবে সাবঅ্যাকিউট স্ক্লেরোজিং প্যানেনসেফালাইটিস (এসএসপিই) নামে একটি রোগ হতে পারে। এটি মূলত একটি স্নায়ুবিক (নিউরোলজিক্যাল) রোগ। মস্তিষ্কে প্রভাব পড়ার কারণে কিছু মানসিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—ডিপ্রেশন, মনোযোগ কমে যাওয়া, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, ভুলে যাওয়া, চিন্তাশক্তির দুর্বলতা ইত্যাদি।
এসইউজে/এমএমএআর
What's Your Reaction?