যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক অভিযানের ১০০ দিন পেরিয়ে গেছে। দেশ দুটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করা নয়, বরং তার নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোকে দুর্বল করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করা। অন্যদিকে তেহরানের প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি : যে কোনো মূল্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা নিশ্চিত করা।
আজ, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও তা অত্যন্ত ভঙ্গুর। মাঝেমধ্যেই হামলার ঘটনা ঘটছে। হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি এবং লেবাননেও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ফলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও শান্তি এখনো দূরের বাস্তবতা।
উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি
এই যুদ্ধ ইরানের জন্য ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ৩ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করায় দুই দশক ধরে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পারমাণবিক স্থাপনাগুলো নতুন করে হামলার শিকার হয়েছে। জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগে থেকেই চাপে থাকা অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্কও আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তবে যুদ্ধ শুধু ইরানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অঞ্চলে অবস্থিত বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। উপসাগরীয় দেশগুলো এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যা তারা কখনোই চায়নি। ফলে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছাতার ওপর তাদের আস্থাও আগের মতো দৃঢ় নেই।
সামরিক দুর্বলতা থেকে অর্থনৈতিক চাপ
যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। হামলার পরপরই ইরান সেখানে নৌ-চলাচল সীমিত করে দেয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিমান অভিযান ও নৌ-অবরোধের মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তেহরান সীমিত সংখ্যক জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই সংকট মোকাবিলায় ওয়াশিংটন তার মিত্রদের প্রত্যাশিত সমর্থন পায়নি। ইউরোপীয় দেশগুলো সংঘাতকে নিজেদের সরাসরি দায়িত্বের বাইরে বলে মনে করেছে। ফলে ইরানের কাছে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতারও প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টিকে থাকার রাজনীতি
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দ্রুততার সঙ্গে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়। নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বার্তা দেয়।
তেহরানের দৃষ্টিতে যুদ্ধের মূল প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকবে কি না? সে বিচারে তারা নিজেদের সফল মনে করছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকারের পতন ঘটাতে পারেনি। ইরানি নেতৃত্বের মতে, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সময়ের সঙ্গে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন হলে সেটি অপূরণীয় হতো।
আঞ্চলিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
বর্তমানে ইরান বেঁচে থাকার এই অভিজ্ঞতাকে আঞ্চলিক প্রভাব পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। বিশেষ করে লেবানন সংকটের সমাধানের সঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতাকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে তেহরান। এর মাধ্যমে নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার একটি অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চায় দেশটি।
সিরিয়ায় প্রভাব হারানো এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আঞ্চলিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইরানের লক্ষ্য এখন অবশিষ্ট কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবকে কার্যকর রাখা।
পারমাণবিক প্রশ্ন আরও জটিল
তবে যুদ্ধের সবচেয়ে উদ্বেগজনক উত্তরাধিকার হতে পারে পারমাণবিক ইস্যু। ইরানের প্রচলিত সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা যে বড় ধরনের হামলা ঠেকাতে পারেনি, তা দেশটির ক্ষমতাকেন্দ্রে নতুন এক যুক্তিকে শক্তিশালী করেছে; পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে হয়তো এই হামলা হতো না।
এই ধারণা যদি আরও শক্তিশালী হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ পারমাণবিক আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সমঝোতার পথ তখন আরও সংকুচিত হতে পারে।
সামনে কোন পথ?
যুদ্ধ আপাতত ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও রাজনৈতিক প্রতিবাদকে আড়াল করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরোধের ভাষ্য এখন জনপরিসরে প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় অর্থনীতি, সুশাসন এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলো আবারও সামনে আসবে।
ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয়টি উপলব্ধি করে, আর নিরাপত্তা কাঠামো অনেক সময় অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত ও বিদেশি চাপকে একই ধরনের হুমকি হিসেবে দেখে। এই দ্বন্দ্বই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে দেশটি আরও কঠোর দমননীতির দিকে যাবে, নাকি পুনর্মিলন ও সংস্কারের পথে হাঁটবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই, যে নেতৃত্ব রাষ্ট্রের টিকে থাকাকেই বিজয় মনে করে, তারা কি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? নাকি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা খুঁজতে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে ঝুঁকবে?
পরবর্তী ১০০ দিন হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করবে।