১২ বছরে ৯০ বিমানবন্দর গড়েছেন মোদী, উন্নয়ন নাকি চোখে ধুলা?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার গত এক দশকের বেশি সময়ে দেশজুড়ে বিমানবন্দর নির্মাণে নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছে। ১২ বছর আগে মোদী ক্ষমতায় আসার সময় দেশে সচল বিমানবন্দরের সংখ্যা ছিল ৭৪টি। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৪-এ। আগামী পাঁচ বছরে আরও ৫০টি বিমানবন্দর চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। সরকার এই সাফল্যকে ভারতের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, প্রকৃত সমস্যা বিমানবন্দর নির্মাণে নয়, বরং সেগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থতায়। ১২ বছরে দ্বিগুণের বেশি বিমানবন্দর সম্প্রতি ভারতের সরকারি প্রচার বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে দাবি করে, মোদী সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হলো বিমান চলাচল খাতে ব্যাপক সম্প্রসারণ। এর সর্বশেষ উদাহরণ নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ১৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই বিমানবন্দরকে দিল্লির দ্বিতীয় প্রধান আকাশপথ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে বছরে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও ২০৪০ সালের মধ্যে সেটিকে ৭ কোটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ সংখ্যা গত বছর সিঙ্গাপুরের প্রধান বিমান
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার গত এক দশকের বেশি সময়ে দেশজুড়ে বিমানবন্দর নির্মাণে নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছে। ১২ বছর আগে মোদী ক্ষমতায় আসার সময় দেশে সচল বিমানবন্দরের সংখ্যা ছিল ৭৪টি। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৪-এ। আগামী পাঁচ বছরে আরও ৫০টি বিমানবন্দর চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
সরকার এই সাফল্যকে ভারতের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, প্রকৃত সমস্যা বিমানবন্দর নির্মাণে নয়, বরং সেগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থতায়।
১২ বছরে দ্বিগুণের বেশি বিমানবন্দর
সম্প্রতি ভারতের সরকারি প্রচার বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে দাবি করে, মোদী সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হলো বিমান চলাচল খাতে ব্যাপক সম্প্রসারণ। এর সর্বশেষ উদাহরণ নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
১৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই বিমানবন্দরকে দিল্লির দ্বিতীয় প্রধান আকাশপথ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে বছরে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও ২০৪০ সালের মধ্যে সেটিকে ৭ কোটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ সংখ্যা গত বছর সিঙ্গাপুরের প্রধান বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াতকারী মোট যাত্রীর সমান।
তবে দিল্লির বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত হলেও এটি আসলে প্রতিবেশী উত্তর প্রদেশ রাজ্যে অবস্থিত।
মোদী প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় শুধু উত্তর প্রদেশেই ১০টি নতুন বিমানবন্দর বা টার্মিনালের উদ্বোধন করেছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের শুরুতে একদিনেই ছয়টি প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। সেই উদ্বোধনের এক মাসের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল নির্বাচন।
অনেক বিমানবন্দরই পাচ্ছে না যাত্রী
সরকারের সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন, নতুন বিমানবন্দরগুলোর একটি বড় অংশ রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে, বাস্তব প্রয়োজনের জন্য নয়।
উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরের মতো অনেক ছোট শহরে নির্মিত বিমানবন্দর কখনো নিয়মিত ফ্লাইটই পায়নি। কোথাও কয়েকটি ফ্লাইট চালুর পর সেগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে।
সাহারানপুর মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি মাঝারি আকারের শহর। সেখানে বিমানবন্দর স্থাপনকে শুরু থেকেই অত্যন্ত আশাবাদী পরিকল্পনা বলে মনে করেছিলেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তবে সমালোচনার জবাবে সরকারপন্থিরা বলছেন, সব বিমানবন্দরের উদ্দেশ্য এক নয়। ছোট শহরের বিমানবন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের ব্যস্ত কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে।
সাহারানপুর বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা মাত্র ৫০ হাজার। নির্মাণ ব্যয়ও ছিল মাত্র ৫৭ লাখ ডলার, যা মুম্বাইয়ের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের দামের কাছাকাছি।
এছাড়া আঞ্চলিক রুটে বিমান চলাচল উৎসাহিত করতে সরকার বিমান সংস্থাগুলোর জন্য ভর্তুকি কর্মসূচিও চালু করেছে। এই কর্মসূচির কিছু প্রকল্প ব্যর্থ হলেও বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যও এসেছে।
আসল সমস্যা: বিমানবন্দরে পৌঁছানোই কঠিন
জানা গেছে, ভারতের বিমানবন্দর নীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো যোগাযোগব্যবস্থা। নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিল্লির কেন্দ্র থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। যানজট না থাকলেও সেখানে পৌঁছাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
বিমানবন্দর উদ্বোধনের দিন সেখানে যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল ব্যক্তিগত গাড়ি বা ব্যয়বহুল ভাড়া গাড়ি।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বিমানবন্দরটিকে সড়ক, রেল, মেট্রো ও আঞ্চলিক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত একটি ‘বহুমুখী পরিবহন কেন্দ্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে উদ্বোধনের সময় সেখানে রেললাইন ছিল না, মেট্রো ছিল না, এমনকি কার্যকর গণপরিবহনও ছিল না।
সমালোচকেরা কটাক্ষ করে বলছেন, দিল্লির দুই বিমানবন্দরকে সরকার যেভাবে ‘সমন্বিত বিমান পরিবহন ব্যবস্থা’ বলছে, সেটি অনেকটা উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সমন্বয়ের মতো।
মুম্বাইতেও একই অবস্থা
শুধু নয়ডা নয়, মুম্বাইয়ের দ্বিতীয় বিমানবন্দরেও একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে। গত বড়দিনে চালু হওয়া বিমানবন্দরটিতে যাত্রীদের অনেক সময় এক ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে একটি ট্যাক্সি পাওয়ার জন্য।
প্রথম কয়েক মাস বিমানবন্দরে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কও ঠিকমতো কাজ করতো না। ফলে অনলাইনে গাড়ি ডাকার সেবাও ব্যবহার করা যেত না। বিমানবন্দরের বেতার ইন্টারনেট সেবাও ছিল অনির্ভরযোগ্য।
ফলে যাত্রীদের প্রশ্ন- বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখান থেকে বের হওয়া যাবে কীভাবে?
পুরোনো বিমানবন্দরেও নেই মেট্রো
সরকার চাইলে নতুন বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে সময়ের অজুহাত দিতে পারে। কিন্তু বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদের বিমানবন্দর চালু হয়েছে প্রায় ১৮ বছর আগে। এখনো কোনো বিমানবন্দরেই সরাসরি মেট্রো সংযোগ নেই।
কখনো কখনো কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বয়হীনতাকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু নয়ডার ক্ষেত্রে সেই যুক্তিও দুর্বল। কারণ উত্তর প্রদেশে ২০১৭ সাল থেকে মোদীর দলই ক্ষমতায় রয়েছে।
মেট্রো আছে, সংযোগ নেই
বিমানবন্দরের মতোই মেট্রো রেলও ভারতের আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিপুল ব্যয়ে নতুন মেট্রো প্রকল্প চালু হয়েছে। অনেকগুলোর মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের।
কিন্তু সমস্যাটা একই জায়গায়- স্টেশনে পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত বাস সার্ভিস নেই, হাঁটার উপযোগী ফুটপাত নেই, সংযোগ সড়ক দুর্বল। ফলে বহু মানুষ মেট্রো ব্যবহার করতে আগ্রহ হারান। এমনকি, ভারতের কিছু ছোট শহরে এমন মেট্রো নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে প্রকৃত যাত্রীসংখ্যা পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।
‘আধুনিকতার প্রদর্শন’ নাকি বাস্তব উন্নয়ন?
বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবন্দর ও মেট্রো- দুটিই রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় প্রকল্প। এগুলো দৃশ্যমান উন্নয়নের প্রতীক, উদ্বোধনের সময় বড় প্রচারণা করা যায় এবং ভোটারদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যায়। কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণের পর সেটিকে কার্যকর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। এদিক থেকে মোদীকে একপ্রকার ব্যর্থই বলা চলে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
এসএএইচ
What's Your Reaction?