২০২৬ সালের বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ কোনগুলো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম বিশ্বে সক্রিয় সংঘাতের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবু এই অস্থিরতার মধ্যেও কিছু দেশ শান্তি ও নিরাপত্তার দিক থেকে ব্যতিক্রম হয়ে আছে। আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কী কারণে তাদের দেশগুলো এত শান্তিপূর্ণ এবং সেখানে বসবাসের অভিজ্ঞতা কেমন। সাম্প্রতিক গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই) অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় বিশ্ব আরও কম শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৯৯টি দেশের শান্তি পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, যা টানা ১২তম বছরের বৈশ্বিক অবনতির ইঙ্গিত দেয়। তবে এই নেতিবাচক প্রবণতার মধ্যেও কয়েকটি দেশ তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে। ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান স্টিভ কিলেলিয়া বলেন, যদিও বিশ্বে শান্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে, শীর্ষে থাকা দেশগুলোর ওপর এর তেমন প্রভাব পড়েনি। ১৬৩টি দেশকে সামরিক ব্যয়, চলমান সংঘাত, হত্যাকাণ্ডের হার এবং নিরাপত্তাবোধসহ ২৩টি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। যেসব দেশ শীর্ষে থাকে, সেগুলোতে সাধারণত সহিংসতা কম, প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর, সামাজিক আস্থা বেশি, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে

২০২৬ সালের বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ কোনগুলো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম বিশ্বে সক্রিয় সংঘাতের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবু এই অস্থিরতার মধ্যেও কিছু দেশ শান্তি ও নিরাপত্তার দিক থেকে ব্যতিক্রম হয়ে আছে। আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কী কারণে তাদের দেশগুলো এত শান্তিপূর্ণ এবং সেখানে বসবাসের অভিজ্ঞতা কেমন।

সাম্প্রতিক গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই) অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় বিশ্ব আরও কম শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৯৯টি দেশের শান্তি পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, যা টানা ১২তম বছরের বৈশ্বিক অবনতির ইঙ্গিত দেয়।

তবে এই নেতিবাচক প্রবণতার মধ্যেও কয়েকটি দেশ তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান স্টিভ কিলেলিয়া বলেন, যদিও বিশ্বে শান্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে, শীর্ষে থাকা দেশগুলোর ওপর এর তেমন প্রভাব পড়েনি।

১৬৩টি দেশকে সামরিক ব্যয়, চলমান সংঘাত, হত্যাকাণ্ডের হার এবং নিরাপত্তাবোধসহ ২৩টি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। যেসব দেশ শীর্ষে থাকে, সেগুলোতে সাধারণত সহিংসতা কম, প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর, সামাজিক আস্থা বেশি, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো এবং জীবনমান উন্নত।

বিশ্বের পাঁচটি সবচেয়ে নিরাপদ দেশের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা কেমন অনুভূত হয় এবং কীভাবে সেই পরিবেশ বজায় থাকে।

১. আইসল্যান্ড

২০০৮ সাল থেকে টানা শীর্ষে থাকা আইসল্যান্ড ২০২৬ সালেও বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশের মর্যাদা ধরে রেখেছে। টানা ১৯তম বছরের মতো প্রথম অবস্থানে রয়েছে দেশটি।

২০২৬ সালে দেশটির শান্তি সূচক ২ শতাংশ উন্নত হয়েছে। সহিংস বিক্ষোভ কমে যাওয়ায় এই উন্নতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিজিট আইসল্যান্ডের প্রধান ওডনি আর্নারসদোত্তির বলেন, আইসল্যান্ডে শান্তি আমাদের চারপাশের প্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে। তবে এটি আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজের সচেতন এক সিদ্ধান্তও।

তার মতে, লিঙ্গসমতা, শক্তিশালী জনসেবা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, আমরা জানি, এমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বাস করতে পারা কত বড় সৌভাগ্যের বিষয়। তাই একটি উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বজায় রাখা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আইসল্যান্ডের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হোটেল রাঙ্গার বিপণন ব্যবস্থাপক এইরুন আনিতা গিলফাদোত্তির বলেন, ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় আইসল্যান্ড বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে খুব বেশি জড়িয়ে পড়ে না।

দেশটিতে ঘুরতে গেলে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে না গিয়ে ধীরে ধীরে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া আইসল্যান্ডের বিখ্যাত উষ্ণ প্রস্রবণভিত্তিক স্নান সংস্কৃতিও উপভোগ করার আহ্বান জানান।

২. নিউজিল্যান্ড

২০২৫ সালে তৃতীয় স্থানে থাকলেও ২০২৬ সালে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে নিউজিল্যান্ড। এটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ।

অস্ত্র আমদানি কমে যাওয়ায় দেশটির অবস্থান আরও উন্নত হয়েছে।

নিউজিল্যান্ডের নাগরিক ও এনজেড গোল্ডেন ভিসার প্রতিষ্ঠাতা ওয়ারউইক উডলি বলেন, বিশ্বের অন্য জায়গা থেকে এত দূরে থাকার কারণে নিউজিল্যান্ড অনেক ভূরাজনৈতিক সংকট থেকে দূরে থাকতে পেরেছে।

তিনি আরও বলেন, এখানকার মানুষ সাধারণত শান্ত স্বভাবের। তারা ঝামেলা তৈরির চেয়ে নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে।

তার মতে, নিরাপত্তা এখানে এতটাই স্বাভাবিক যে মানুষ বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তাও করে না।

অধিকাংশ মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেই না। এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে এটি এখানে কোনো বড় উদ্বেগের বিষয় নয় বলে জানান তিনি।

৩. সুইজারল্যান্ড

২০২৫ সালে পঞ্চম স্থানে থাকা সুইজারল্যান্ড ২০২৬ সালে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে।

কম অপরাধপ্রবণতা এবং দীর্ঘদিনের সামরিক নিরপেক্ষতার নীতি দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশে পরিণত করেছে।

জেনেভাভিত্তিক নির্বাহী কোচ ও লেখক কর্নেলিয়া চো বলেন, এখানকার মানুষ অন্যদের জন্য জায়গা করে দিতে প্রস্তুত থাকে। এর ফলে এক ধরনের আস্থা তৈরি হয় যে সবাই সাধারণত সঠিক কাজটাই করবে।

তিনি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সুইজারল্যান্ডে তিনি দুবার মানিব্যাগ হারিয়েছেন। একবার একজন অচেনা ব্যক্তি সেটি ডাকযোগে ফিরিয়ে দেন, এমনকি ভেতরের টাকাও অক্ষত ছিল।

আরেকবার রেলস্টেশনে তার ক্রেডিট কার্ড পড়ে গেলে একজন ব্যক্তি ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেটি বাতিল করার ব্যবস্থা করেন, যাতে প্রতারণা না হয়।

চোর মতে, এ ধরনের ছোট ছোট ঘটনা নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে, যার মূল্য অপরিসীম।

৪. স্লোভেনিয়া

প্রথমবারের মতো ২০২৬ সালে শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছে স্লোভেনিয়া।

কম সামরিক ব্যয় এবং উচ্চ নিরাপত্তা মান দেশটির সাফল্যের প্রধান কারণ।

লুবলিয়ানার বাসিন্দা এবং ইন্ট্রেপিড ট্রাভেলের পূর্ব ইউরোপ অঞ্চলের অপারেশন ব্যবস্থাপক জেরনেয়া জভের বলেন, স্লোভেনিয়ার মানুষ সম্প্রদায়কে খুব গুরুত্ব দেয় এবং প্রকৃতির সঙ্গে অনেক সময় কাটায়। আমি মনে করি এ কারণেই আমাদের মধ্যে এক ধরনের স্থিরতা ও প্রশান্তি রয়েছে।

তিনি জানান, প্রায় প্রতিটি সপ্তাহান্তই তিনি হাইকিং, সাইক্লিং, স্কিইং কিংবা পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে থাকেন।

জভের বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যখন সংঘাত ও অনিশ্চয়তা চলছে, তখন স্লোভেনিয়াকে নিজের দেশ বলতে পারা সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়।

৫. আয়ারল্যান্ড

২০২৬ সালের তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে আয়ারল্যান্ড।

কম সহিংসতা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতে সীমিত সম্পৃক্ততার কারণে দেশটি উচ্চ অবস্থান ধরে রেখেছে।

পশ্চিম কর্কের হোটেল ‘নেটিভ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ডিডি রোনান বলেন, আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস মানুষকে বৈষম্যের ক্ষতি এবং অন্যদের প্রতি উদার ও আতিথেয়তাপূর্ণ হওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেছে।

তার মতে, অতিথিপরায়ণতার এই সংস্কৃতির শিকড় বহু শতাব্দী পুরোনো ব্রেহন আইনে নিহিত, যেখানে ভ্রমণকারী ও অপরিচিতদের খাদ্য ও আশ্রয় দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল।

রোনান বলেন, এটি আমাদের রক্তে মিশে আছে।

আয়ারল্যান্ডের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিও শান্তির অনুভূতিকে শক্তিশালী করে। দেশটি বিদেশি যুদ্ধে বা সামরিক জোটে অংশ নেয় না।

তিনি বলেন, বিশ্ব যখন অস্থিরতায় ভরা, তখন আটলান্টিক মহাসাগরের দূরবর্তী একটি দ্বীপে থাকা, যেখানে সুন্দর সংগীত, প্রকৃতি আর বইয়ের সঙ্গ আছে, সেটি সত্যিই প্রশান্তিদায়ক।

বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের বিপরীতে এসব দেশ দেখিয়ে দিচ্ছে, সামাজিক আস্থা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow