বাংলাদেশে করব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রগতিশীল করনীতির ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নীতিগতভাবে এটি একটি ন্যায়সংগত কাঠামো-যেখানে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি কর দেবেন এবং রাষ্ট্র সেই রাজস্ব জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করবে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতির নৈতিক ভিত্তি তখনই টেকসই হয়, যখন করদাতারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যূনতম সেবা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা পান। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের বেসরকারি চাকুরিজীবীরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই ন্যূনতম নিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রেই পান না। ফলে করব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আজকের বাস্তবতায় বেসরকারি চাকুরিজীবীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শিল্প, বাণিজ্য, ব্যাংকিং, প্রযুক্তি, টেলিকম, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাত-সব জায়গায় তাদের শ্রম, দক্ষতা ও সততার বিনিময়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং অর্থনীতির চাকা সচল থাকছে। কিন্তু করনীতির কাঠামোতে তাদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হওয়ায় তৈরি হচ্ছে বৈষম্য ও অসাম্যবোধ। এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়-একটি সামাজিক ও নৈতিক সংকটও বটে।
১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী বেসরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত খাতে নির্দিষ্ট অঙ্ক পর্যন্ত করমুক্ত ব্যয়ের সুযোগ রাখা হয়েছিল। তখন বাড়িভাড়ায় ৩ লাখ টাকা, চিকিৎসায় ১ লাখ ২০ হাজার এবং যাতায়াতে ৩০ হাজার টাকা মিলিয়ে মোট ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত করছাড়ের সুযোগ ছিল। পরবর্তীতে কর আইন ২০২৩-এ এই সীমা পরিবর্তন করে নির্ধারণ করা হয়, মোট বেতন আয়ের তিন ভাগের এক ভাগ অথবা সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তারমধ্যে যেটি কম। কিন্তু বাস্তবে এই পরিবর্তন কোনো উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক ফল আনেনি। কারণ, গত এক দশকে মুদ্রাস্ফীতি, শহরাঞ্চলে বাসাভাড়া বৃদ্ধি, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের অস্বাভাবিক উস্ফলন, কোনোটিই এই কাঠামোতে প্রতিফলিত হয়নি।
আরও হতাশাজনক বিষয় হলো, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটেও একই কাঠামো বহাল রাখা হয়েছিল। সর্বোচ্চ করছাড় মাত্র ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হলেও শর্তটি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে ‘৫ লাখ বা মোট আয়ের তিন ভাগের এক ভাগ, তারমধ্যে যেটি কম, সেটিই মুক্ত খরচ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।’ ফলে কাগজে কলমে সীমা বাড়লেও বাস্তবে অধিকাংশ বেসরকারি চাকুরিজীবীর জন্য করচাপ আগের মতোই রয়ে গেছে।
এই করনীতি সরকারি ও বেসরকারি চাকুরিজীবীদের মধ্যে স্পষ্ট বৈষম্য তৈরি করছে। সরকারি কর্মচারীরা সরকারি বাসভবন, যানবাহন, চিকিৎসা সুবিধা, শিক্ষা সুবিধা, বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা করমুক্তভাবে ভোগ করেন। অথচ বেসরকারি চাকুরিজীবীরা একই শহরে একই বাজারে বসবাস করেও এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাঁদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত, সবই ব্যক্তিগত ব্যয়ে বহন করতে হয়। বাস্তব অর্থে তারা দ্বিগুণ চাপের মধ্যে থাকেন, একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়, অন্যদিকে কর কর্তন।
বাংলাদেশে নিয়মিত করদাতাদের বড় অংশ কর দেন উৎসে কর কর্তনের (টিডিএস) মাধ্যমে। অর্থাৎ তাদের কর ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বেসরকারি চাকুরিজীবীরা এই শ্রেণির সবচেয়ে বড় অংশ। মাস শেষে বেতন পরিশোধের সময় তাদের কর কেটে নেওয়া হয়। অন্যদিকে কর নেটের বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠী কার্যত কর ব্যবস্থার বাইরে থেকেই যাচ্ছে। ফলে চাপ বাড়ছে সেইসব মানুষের ওপর, যারা নিয়মিত ও বাধ্যতামূলকভাবে কর দেন।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের অর্থ অর্ডিন্যান্সে করহার পরিবর্তনের ফলে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত করদাতাদের প্রকৃত কর বোঝা ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ বাস্তবে বেতন বৃদ্ধি স্থবির, চাকরির নিরাপত্তা অনিশ্চিত, এবং আয় বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত। বিপরীতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে এবং মূল্যস্ফীতির হার ছিলো ৮.২৯ শতাংশ। কর হার বৃদ্ধির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৫ সালের জুলাই মাস থেকে, অনেক চাকুরিজীবী আগের বছরের তুলনায় কম বেতন হাতে পেয়েছেন শুধুমাত্র অতিরিক্ত কর কর্তনের কারণে। এটি এক ধরনের নীতিগত বৈপরীত্য, যেখানে সৎ করদাতারা পুরস্কৃত হওয়ার বদলে শাস্তি পাচ্ছেন।
বাংলাদেশে করদাতার সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত কম। কর নেট সম্প্রসারণ করে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সম্ভব হলেও বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী নীতি। এর ফলে করদাতাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে, কর প্রদানে অনীহা তৈরি হবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ বিদেশমুখী হবে। ইতোমধ্যে দেশের বহু তরুণ ও মধ্যবয়সী পেশাজীবী বিদেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এই মেধাপ্রবাহ দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।
আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি খাতের করদাতাদের জন্য বাস্তবসম্মত সংস্কার আনা জরুরি। এতে একদিকে করদাতারা স্বস্তি পাবেন, অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে বৈষম্যও অনেকটা কমবে। প্রস্তাবনাগুলো হলো—
• সর্বনিম্ন করমুক্ত আয়সীমা ৬,০০,০০০ টাকা নির্ধারণ।
• ব্যক্তিপর্যায়ে সর্বোচ্চ করহার ৩০% থেকে কমিয়ে ২০% নির্ধারণ।
• বাড়িভাড়া বাবদ বছরে ৪,৮০,০০০ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত ব্যয় অনুমোদন।
• চিকিৎসা খাতে বছরে ৩,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত ব্যয় অনুমোদন।
• যাতায়াত খাতে বছরে ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত ব্যয় অনুমোদন।
• সন্তানদের শিক্ষা ও পিতা-মাতার ভরণপোষণ বাবদ বছরে মূল বেতনের ১০% অথবা সর্বোচ্চ ২,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত ব্যয় অনুমোদন।
• গোষ্ঠী বীমা পলিসি হইতে কর্মচারী কর্তৃক প্রাপ্ত অর্থ বা সুবিধাকে করমুক্ত ঘোষণা করা।
• যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত কোনো দাতব্য তহবিলে করদাতা যাকাত হিসেবে চাঁদা বা দান প্রদান করলে তা করমুক্ত আয় হিসেবে ঘোষণা করা।
• সামাজিক সুরক্ষার স্কিম হিসেবে বেসরকারি খাতের করদাতাদের মোট প্রদেয় করের ১০% করে সরকারী পেনশনার স্কিম খাতে বিনিয়োগ করে করদাতাদের বয়স ৬০ অতিক্রম করলে সেই টাকা তাদের মাসিক পেনশন হিসেবে ফেরত দেওয়া।
• শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে প্রাপ্ত আয়কে করমুক্ত আয় হিসেবে অনুমোদন দেওয়া।
সর্বসাকুল্যে বছরে ১১,০০,০০০ টাকা অথবা মোট আয়ের দুই ভাগের এক ভাগ (যেটি কম) করমুক্ত ব্যয় হিসেবে অনুমোদন করা যেতে পারে। এছাড়া করমুক্ত সীমা ৬,০০,০০০ টাকা নির্ধারণ এবং সর্বোচ্চ করহার ২০% করা হলে করদাতা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত কর ছাড় এবং করহার কার্যকর করা হলে স্বল্পমেয়াদে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায় কিছুটা কমতে পারে। তবে কর নেট সম্প্রসারণ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে বর্তমানের তুলনায় আরও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। কারণ তখন কেউ নিজেকে বঞ্চিত মনে করবে না; বরং নাগরিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর পরিশোধ করে রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে এবং যারা বর্তমানে কর প্রদান করছেন তারা অন্যকে কর প্রদানে উৎসাহিত করবে, এভাবেই করের নেট সম্প্রসারিত হবে।
একই সঙ্গে কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়লে করদাতাদের আস্থা আরও দৃঢ় হবে। কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও হয়রানিমুক্ত করা গেলে নতুন করদাতাদের অন্তর্ভুক্তি দ্রুত হবে। পাশাপাশি কর ফাঁকি কমবে এবং সবাই ন্যায্যভাবে করের আওতায় আসবে। ফলে রাজস্ব প্রবাহ স্থিতিশীল হবে এবং উন্নয়নমূলক খাতে রাষ্ট্রের ব্যয় করার সক্ষমতাও বাড়বে।
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে সম্মানিত হয়, যখন নাগরিকরা নিজেদের কেবল ‘করদাতা’ নয়, বরং ‘অধিকারপ্রাপ্ত অংশীদার’ মনে করেন। কর প্রদান যেন ভয় বা বাধ্যবাধকতা না হয়ে গর্বের বিষয় হয়-এমন পরিবেশ তৈরি করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন ন্যায়সংগত করনীতি, মানবিক সংস্কার এবং করদাতাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্র যদি করদাতাদের কেবল রাজস্বের উৎস হিসেবে দেখে, তবে আস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি করদাতাদের সম্মান দেয় এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন করে, তবে কর সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে এবং অর্থনীতি দাঁড়াবে পারস্পরিক দায়িত্ব ও সম্মানের ভিত্তিতে। এখনই সময়-বৈষম্যমূলক কাঠামো ভেঙে ন্যায়সংগত কর সংস্কারের পথে হাঁটার।
ফয়সাল ইসলাম এফসিএ, আর্থিক খাতের বিশ্লেষক