‘২৪’ ভারী, ‘৭১’ হালকা, রাবির সেই চিত্রকর্ম নিয়ে যা বললেন শিল্পী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনীতে একটি শিল্পকর্ম ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিল্পকর্মটিতে একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের ওপর দাঁড়িপাল্লা দেখানো হয়েছে। এক পাশে লাল রঙে লেখা ‘৭১’, অন্য পাশে কালচে রঙে ‘২৪’। তবে দুই পাল্লার ভারসাম্য সমান নয়। ‘২৪’ লেখা পাল্লাটি নিচের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। ফলে দৃশ্যত মনে হচ্ছে, ১৯৭১ সালের চেয়ে ২০২৪-এর ওজন বেশি। রোববার (১০ আগস্ট) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: রং তুলিতে মুক্ত স্বদেশ’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মটি সামনে আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এর প্রতীকী অর্থ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অনেকের প্রশ্ন, শিল্পকর্মটির মাধ্যমে কি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে? তবে শিল্পীর দাবি, তার বক্তব্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত। শিল্পকর্মটি নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তির ব্যাখ্যা দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বরাবর লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন শিল্পী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিকস ডিজাইন ব

‘২৪’ ভারী, ‘৭১’ হালকা, রাবির সেই চিত্রকর্ম নিয়ে যা বললেন শিল্পী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনীতে একটি শিল্পকর্ম ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিল্পকর্মটিতে একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের ওপর দাঁড়িপাল্লা দেখানো হয়েছে। এক পাশে লাল রঙে লেখা ‘৭১’, অন্য পাশে কালচে রঙে ‘২৪’। তবে দুই পাল্লার ভারসাম্য সমান নয়। ‘২৪’ লেখা পাল্লাটি নিচের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। ফলে দৃশ্যত মনে হচ্ছে, ১৯৭১ সালের চেয়ে ২০২৪-এর ওজন বেশি।

রোববার (১০ আগস্ট) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: রং তুলিতে মুক্ত স্বদেশ’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মটি সামনে আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এর প্রতীকী অর্থ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

অনেকের প্রশ্ন, শিল্পকর্মটির মাধ্যমে কি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে? তবে শিল্পীর দাবি, তার বক্তব্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

শিল্পকর্মটি নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তির ব্যাখ্যা দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বরাবর লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন শিল্পী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিকস ডিজাইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী দীপ্ত দিপন দেবনাথ।

লিখিত বক্তব্যে দীপ্ত দিপন দেবনাথ বলেন, দাঁড়িপাল্লার দুই পাশে ‘৭১’ ও ‘২৪’ লেখা থাকলেও এর মাধ্যমে তিনি দুই সময়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বের তুলনা করতে চাননি। বরং দাঁড়িপাল্লাকে তিনি একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা পক্ষের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

শিল্পীর ভাষ্য, এমন একটি গোষ্ঠী রয়েছে, যারা মুক্তিযুদ্ধকে কখনো সমর্থন করেনি। তারা নিজেদের স্বার্থে ২০২৪ সালকে ১৯৭১ সালের চেয়ে বড় করে দেখাতে চায়। দাঁড়িপাল্লার ভারসাম্যহীনতার মাধ্যমে সেই প্রবণতার সমালোচনাই তিনি তুলে ধরেছেন।

চিত্রকর্মে ‘২৪’ লেখা পাল্লার সঙ্গে থাকা ইট-পাথরের টুকরোগুলোও এই বক্তব্যের প্রতীক বলে জানান শিল্পী। তার মতে, এসব ইট-পাথর দিয়ে বোঝানো হয়েছে, কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থে ‘২৪’-এর দিকে অতিরিক্ত ওজন চাপিয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে, ‘৭১’ লেখা পাল্লায় বাড়তি কোনো উপাদান রাখা হয়নি। শিল্পীর দাবি, ১৯৭১ সালের গুরুত্ব বোঝাতে তার কাছে অতিরিক্ত কোনো প্রতীকের প্রয়োজন হয়নি।

শিল্পী তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে নন। তার আপত্তি তাদের বিরুদ্ধে, যারা ২০২৪-কে ১৯৭১ সালের চেয়ে বড় করে দেখাতে চায়।

লিখিত বক্তব্যে দীপ্ত দিপন দেবনাথ বলেন, ‘আমি ২৪-এর বিরুদ্ধে নই। কিন্তু যারা ২৪-কে ৭১-এর চেয়ে বড় করে দেখতে চায়, ২৪-কে ৭১-এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তাদের বিরুদ্ধেই আমার এই চিত্রকর্মটি আঁকা।’

চিত্রকর্মটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই শিল্পীর লিখিত ব্যাখ্যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পৌঁছেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘চিত্রকর্মটি নিয়ে একটি লিখিত ব্যাখ্যা পেয়েছি। শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।’

তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আলাদাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত বা মন্তব্য করেছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

চিত্রকর্মটি ঘিরে বিতর্কের মূল কারণ শিল্পীর অভিপ্রায় ও দর্শকের দৃশ্যমান পাঠের পার্থক্য। একজন শিল্পী কোনো প্রতীক যে অর্থে ব্যবহার করেন, দর্শক সেটিকে সবসময় একইভাবে দেখবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

এই শিল্পকর্মেও ‘২৪’ লেখা পাল্লার নিচের দিকে ঝুঁকে থাকা এবং সেখানে ইট-পাথরের উপস্থিতি থেকেই ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেকের কাছে এতে ২০২৪ সালকে ১৯৭১ সালের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা প্রতীয়মান হয়েছে।

অন্যদিকে, শিল্পীর ব্যাখ্যা বলছে ঠিক উল্টো কথা। তাঁর দাবি, চিত্রকর্মটির উদ্দেশ্য ২০২৪-কে বড় করে দেখানো নয়; বরং যারা ১৯৭১-এর চেয়ে ২০২৪-কে বড় করে দেখাতে চায়, তাদের সেই প্রবণতার সমালোচনা করা।

ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীতে একটি শিল্পকর্মই এখন পরিণত হয়েছে আলোচনার কেন্দ্রে। শিল্পীর ব্যাখ্যার পর বিতর্ক কতটা নিরসন হয়, নাকি চিত্রকর্মটির দৃশ্যমান উপস্থাপনাই নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow