৯ বিশ্বকাপ ট্রফির মালিক ব্রাজিল-জার্মানি কেন পথ হারিয়ে ফেললো?

সুন্দর ফুটবলের ধারক বলা হয় ব্রাজিলকে। ফুটবল অভিধানে শব্দটি পরিচিত ‘জোগো বনিতো’ নামে। হলুদ জার্সিতে একটা সময় ব্রাজিল মানেই ছিল কেবল সাফল্য আর রূপকথার গল্প। যে গল্প শেষ হবার নয়। ইতিহাস ঘাটতে গেলে দেখা যাবে, ফুটবল বিশ্বকাপের বড় বড় যত রেকর্ড; তার অধিকাংশই ব্রাজিলের। তার ঠিক পরের নামটিই জার্মানি। ট্রফি সংখ্যায়ও তাদের সমান কাতারে নেই কেউ। ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছে ৫টি, জার্মানি ৪টি। অর্থাৎ দুই দল মিলেই তাদের শোকেসে সাজিয়ে রেখেছে ৯ ট্রফি। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বকাপ শুরু হলে এই দুই দলকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে ধরা হতো সবসময়। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আরও পড়ুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে স্পেনের কাছ থেকে ব্রাজিলকে নিতে হবে ৫টি শিক্ষা এবার ব্রাজিল-জার্মানি কেউই হট ফেবারিট ছিল না। কেন ছিল না, সেটা মাঠের ফুটবলেও প্রমাণ মিলেছে। ফুটবলের দুই পরাশক্তিকে বিদায় করে দিয়েছে তুলনামূলকভাবে কম সফল দুই দল। জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়েছে প্যারাগুয়ে আর ব্রাজিলকে ছিটকে দিয়েছে নরওয়ে। বিশ্বকাপের আগের ২২টি আসরের মধ্যে অন্তত ১৪ বার এই দুই দলের একটি ফাইনালে খেলেছে। তারা কেন এভাবে মুথ থুবড়ে

৯ বিশ্বকাপ ট্রফির মালিক ব্রাজিল-জার্মানি কেন পথ হারিয়ে ফেললো?

সুন্দর ফুটবলের ধারক বলা হয় ব্রাজিলকে। ফুটবল অভিধানে শব্দটি পরিচিত ‘জোগো বনিতো’ নামে। হলুদ জার্সিতে একটা সময় ব্রাজিল মানেই ছিল কেবল সাফল্য আর রূপকথার গল্প। যে গল্প শেষ হবার নয়।

ইতিহাস ঘাটতে গেলে দেখা যাবে, ফুটবল বিশ্বকাপের বড় বড় যত রেকর্ড; তার অধিকাংশই ব্রাজিলের। তার ঠিক পরের নামটিই জার্মানি। ট্রফি সংখ্যায়ও তাদের সমান কাতারে নেই কেউ। ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছে ৫টি, জার্মানি ৪টি।

অর্থাৎ দুই দল মিলেই তাদের শোকেসে সাজিয়ে রেখেছে ৯ ট্রফি। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বকাপ শুরু হলে এই দুই দলকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে ধরা হতো সবসময়। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এবার ব্রাজিল-জার্মানি কেউই হট ফেবারিট ছিল না। কেন ছিল না, সেটা মাঠের ফুটবলেও প্রমাণ মিলেছে। ফুটবলের দুই পরাশক্তিকে বিদায় করে দিয়েছে তুলনামূলকভাবে কম সফল দুই দল। জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়েছে প্যারাগুয়ে আর ব্রাজিলকে ছিটকে দিয়েছে নরওয়ে।

বিশ্বকাপের আগের ২২টি আসরের মধ্যে অন্তত ১৪ বার এই দুই দলের একটি ফাইনালে খেলেছে। তারা কেন এভাবে মুথ থুবড়ে পড়লো? কেন ব্রাজিল ও জার্মানি নিজেদের চেনা পথ হারিয়ে ফেললো? ভক্ত-সমর্থকরা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছেন।

jagonews

জার্মানির সমস্যা: পরিকল্পনার অভাব, দলে স্থিরতার সংকট
তরুণ কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের অধীনে জার্মানি অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে দল গড়েছিল। কিন্তু দল নির্বাচন ও একাদশ নিয়ে শুরু থেকেই ছিল প্রশ্ন।

দুই বছর পর আবারও প্রথম গোলরক্ষক হিসেবে ফিরে আসেন ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী দলের শেষ সদস্য ম্যানুয়েল নয়্যার। অথচ এর আগে অলিভার বাউমানের ওপরই আস্থা রেখেছিলেন নাগেলসমান। এই সিদ্ধান্তের ইতিবাচক ফল মেলেনি। টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপেও কোনো ম্যাচে ক্লিন শিট রাখতে পারেনি জার্মানি, আর দুইবারই গোলপোস্টে ছিলেন নয়্যার।

jago

ইনজুরিও বড় ধাক্কা হয়ে আসে। দলের অন্যতম গোলদাতা সার্জ জিনাব্রি উরুর চোটে বিশ্বকাপই খেলতে পারেননি। পরে ডিফেন্ডার নিকো শ্লটারবেকও টুর্নামেন্ট চলাকালীন গোড়ালির চোটে ছিটকে গেলে রক্ষণভাগ দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরেকটি আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিল জামাল মুসিয়ালার বদলে স্ট্রাইকার ডেনিজ উনডাভকে একাদশে রাখা। বদলি হিসেবে দারুণ পারফর্ম করা উনডাভ প্যারাগুয়ের বিপক্ষে শুরু থেকেই খেললেও একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। পাস সম্পন্ন করার হারও ছিল মাত্র ৬০ শতাংশ।

২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ফিলিপ লাম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ লিখেছেন, ‘আমরা বারবার শুধু সমস্যার উপসর্গের চিকিৎসা করছি। কখনো সিস্টেম, কখনো একাদশ, কখনো খেলোয়াড়ের পজিশন বদলাচ্ছি। কিন্তু জার্মানি আসলে কীভাবে খেলতে চায়, সেটাই যেন পরিষ্কার নয়।’

তার মতে, অতীতে জার্মানির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তোলা। সেই পরিচয়ই এখন হারিয়ে গেছে।

দায়িত্ববোধের ঘাটতির উদাহরণও দেখা যায় টাইব্রেকারের আগে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, লিওন গোরেৎসকা, ভালডেমার অ্যান্টন, নাথানিয়েল ব্রাউন ও মালিক থিয়াও পেনাল্টি নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আগে কখনও পেনাল্টি না নেওয়া জনাথন তাহকে দায়িত্ব নিতে হয়, আর তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

jago

ব্রাজিলের ব্যর্থতা: অতীতের গৌরবের ওপর নির্ভরতা
ব্রাজিলের ব্যর্থতার কেন্দ্রেও ছিল দল নির্বাচন। প্রায় তিন বছর পর জাতীয় দলে ফিরে আসেন ৩৪ বছর বয়সী নেইমার। গত মৌসুমে তিনি ৬ গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করলেও দুর্দান্ত ফর্মে থাকা চেলসির স্ট্রাইকার জোয়াও পেদ্রোকে দলে রাখা হয়নি। ২০২৫-২৬ মৌসুমে পেদ্রো করেছিলেন ২০ গোল ও ৯টি অ্যাসিস্ট।

ব্রাজিল কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস-কে বলেন, ‘আমার মনে হয় এই বিদায়ের শুরু হয়েছে বেঞ্চের সিদ্ধান্ত থেকেই। কার্লো আনচেলত্তি ইতিহাসের অন্যতম সেরা কোচ, কিন্তু এই ম্যাচে তিনি অনেক ভুল করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখনো বুঝতে পারছি না কেন জোয়াও পেদ্রোকে দলে রাখা হয়নি। দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছে সে। ব্রাজিলের এমন একজন স্ট্রাইকার দরকার ছিল, যে ভিন্ন কিছু এনে দিতে পারতো।’

jago

রাফিনহা ও লুকাস পাকেতার চোটও ব্রাজিলকে দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে, বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ এন্দ্রিক চার ম্যাচে খেলেছেন মাত্র ১১১ মিনিট।

টাইব্রেকারেও প্রশ্ন উঠেছে সিদ্ধান্ত নিয়ে। ক্লাব পর্যায়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের চেয়ে কম পেনাল্টি গোল করা ব্রুনো গিমারেসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার শট ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নিল্যান্ড।

রোনালদোর ভাষায়, ‘এন্দ্রিক যখনই মাঠে নেমেছে, দলকে শক্তি, আগ্রাসন আর অনিশ্চয়তা এনে দিয়েছে। তারপরও তাকে বেশিরভাগ সময় বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আমি এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না।’

হারিয়ে যাচ্ছে ‘জোগা বনিতো’
এক সময় আক্রমণাত্মক, সৃজনশীল ও নান্দনিক ফুটবলের জন্য পরিচিত ছিল ব্রাজিল। কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে সেই চেনা রূপ দেখা যায়নি।

ম্যাচটিতে ব্রাজিলের বল দখলের হার ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ, যা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে তাদের সর্বনিম্ন। নরওয়ের পাস সফলতার হার (৯১ শতাংশ), লক্ষ্যে শট (৫টি) এবং মোট পাস (৬৫৩) সব ক্ষেত্রেই ব্রাজিলকে ছাড়িয়ে যায়। ব্রাজিলের ৩১৩টি পাসের বিপরীতে নরওয়ে দেয় ৬৫৩টি।

jago

কাউন্টার অ্যাটাকনির্ভর ফুটবল খেলতে গিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ হারায় ব্রাজিল। তরুণ নরওয়েজিয়ান আক্রমণের সামনে বয়সী রক্ষণভাগও ভেঙে পড়ে।

কোচদের ভবিষ্যৎ ভিন্ন পথে
ব্যর্থতার পর জার্মানি ইতোমধ্যেই পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। নাগেলসমানের পরিবর্তে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপকে।

অন্যদিকে, ব্রাজিল আপাতত কার্লো আনচেলত্তির ওপরই আস্থা রাখছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তাকেই দায়িত্বে রাখা হবে।

তবে সাবেক বিশ্বকাপজয়ী তারকা রোমারিও ভিন্ন মত পোষণ করেন। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে তিনি বলেন, ‘আমি যদি ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের প্রধান হতাম, তাহলে আজই আনচেলত্তির চুক্তি বাতিল করতাম। তার কোচ হিসেবে থাকার আর কোনো কারণ দেখি না।‘

ইতিহাস নয়, প্রয়োজন নতুন পরিচয়
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিল ও জার্মানি মানেই ছিল শেষ পর্যন্ত লড়াই করা দুই পরাশক্তি। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ আবারও মনে করিয়ে দিলো-অতীতের গৌরব বর্তমানের সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়।

ব্রাজিল সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছে ২৪ বছর আগে, জার্মানির হয়ে গেছে ১২ বছর। ইতিহাস হয়তো তাদের পক্ষে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ট্রফি জিততে না পারলে একটা প্রজন্ম এসে ভুলেই যাবে, ব্রাজিল-জার্মানি এক সময় পরাশক্তি ছিল। ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী দুই দল কি সেই ভুলের দিকে পা বাড়াবে? নাকি নতুন করে লেখা হবে পুরোনো সেই ইতিহাস? উত্তরটা সময়ের হাতেই তোলা থাক।

এমএমআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow