৯০ বছর বয়সেও লাল-সবুজের ফেরিওয়ালা আব্দুর রফ

দেশের পতাকা বিক্রি করেই জীবন কাটছে, অথচ নিজের মাথা গোঁজার একটি স্থায়ী ঠাঁইও জোটেনি। প্রায় ৩০ বছর ধরে বাংলাদেশের খেলা মানেই কাঁধে লাল-সবুজের পতাকার বোঝা নিয়ে মাঠের বাইরে হাজির হন ৯০ বছরের আব্দুর রফ। যে মানুষটি হাজারো দর্শকের হাতে তুলে দেন জাতীয় পতাকা, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকেই কেউ তুলে দিতে পারেনি একমুঠো নিশ্চয়তা। বাংলাদেশ খেললে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। মনে হয়, আমারও যাওয়া দরকার। সবাই যেন হাতে একটা করে পতাকা নিয়ে খেলা দেখে। বয়স প্রায় ৯০ বছর। শরীর ন্যুব্জ, হাঁটতে লাঠির ভরসা লাগে। তবু বাংলাদেশের খেলা মানেই স্টেডিয়ামের বাইরে তার উপস্থিতি। কাঁধে ছোট-বড় নানা আকারের লাল-সবুজের পতাকা। দর্শকদের উদ্দেশে ডাক দেন, ‘বাবা, পতাকা নেবেন? দশ টাকারও আছে।’ চট্টগ্রামের সাগরিকা এলাকায় বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের ম্যাচ উপলক্ষে মাঠের বাইরে দেখা মেলে এই প্রবীণ পতাকা বিক্রেতার। বয়সের ভারে হাঁটতে কষ্ট হয়, তবু ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন দর্শকদের অপেক্ষায়। তার আশা, কয়েকটি পতাকা বিক্রি হলে সেদিনের খাবার আর সংসারের খরচের টাকা জুটবে। আব্দুর রফের গ্রামের বাড়ি বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলায়

৯০ বছর বয়সেও লাল-সবুজের ফেরিওয়ালা আব্দুর রফ

দেশের পতাকা বিক্রি করেই জীবন কাটছে, অথচ নিজের মাথা গোঁজার একটি স্থায়ী ঠাঁইও জোটেনি। প্রায় ৩০ বছর ধরে বাংলাদেশের খেলা মানেই কাঁধে লাল-সবুজের পতাকার বোঝা নিয়ে মাঠের বাইরে হাজির হন ৯০ বছরের আব্দুর রফ। যে মানুষটি হাজারো দর্শকের হাতে তুলে দেন জাতীয় পতাকা, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকেই কেউ তুলে দিতে পারেনি একমুঠো নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশ খেললে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। মনে হয়, আমারও যাওয়া দরকার। সবাই যেন হাতে একটা করে পতাকা নিয়ে খেলা দেখে।

বয়স প্রায় ৯০ বছর। শরীর ন্যুব্জ, হাঁটতে লাঠির ভরসা লাগে। তবু বাংলাদেশের খেলা মানেই স্টেডিয়ামের বাইরে তার উপস্থিতি। কাঁধে ছোট-বড় নানা আকারের লাল-সবুজের পতাকা। দর্শকদের উদ্দেশে ডাক দেন, ‘বাবা, পতাকা নেবেন? দশ টাকারও আছে।’

চট্টগ্রামের সাগরিকা এলাকায় বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের ম্যাচ উপলক্ষে মাঠের বাইরে দেখা মেলে এই প্রবীণ পতাকা বিক্রেতার। বয়সের ভারে হাঁটতে কষ্ট হয়, তবু ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন দর্শকদের অপেক্ষায়। তার আশা, কয়েকটি পতাকা বিক্রি হলে সেদিনের খাবার আর সংসারের খরচের টাকা জুটবে।

আব্দুর রফের গ্রামের বাড়ি বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলায়। বর্তমানে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়ার একটি ছোট বাসায় থাকেন। স্ত্রী রয়েছেন, ছেলেদের আলাদা সংসার। বয়সের ভারে শরীর ভেঙে পড়লেও নিজের সংসারের দায়িত্ব এখনো তাকেই বহন করতে হচ্ছে।

কালবেলাকে লাল-সবুজের ফেরিওয়ালা আব্দুর রফ বলেন, একসময় করাত কলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। একদিন কর্মস্থলে বড় একটি গাছ পড়ে গুরুতর আহত হন। ভেঙে যায় তার পা। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর আর আগের মতো ভারী কাজ করতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে তখন জাতীয় পতাকা বিক্রি শুরু করেন। সেই থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান কিংবা বাংলাদেশের ক্রিকেট-ফুটবল ম্যাচ যেখানেই জাতীয় পতাকার চাহিদা থাকে, সেখানেই ছুটে যান তিনি।

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ উপলক্ষে নিজের খরচে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসেছেন আব্দুর রফ। সিরিজের ৩টি ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানেই ছিলেন। ছোট পতাকা ১০ টাকা, মাঝারি ২০ টাকা এবং বড় পতাকা ৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করেন। হাজার দুই এক টাকার পতাকা বিক্রি করতে পারলে সামান্য যে লাভ হয়, সেটিই তার সংসারের একমাত্র অবলম্বন।

আব্দুর রফ বলেন, ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করছি। পরিবারের কোনো সহযোগিতা পাইনি। পরে করাত মিলে চাকরি করতাম। একদিন গাছ পড়ে আমার পা ভেঙে যায়। এরপর আর আগের মতো কাজ করতে পারিনি। তখন থেকেই পতাকা বিক্রি করছি। বাঁচতে হলে কিছু একটা করতে হতো। চাইলে মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতে পারতাম, কিন্তু সেটা করিনি। নিজের পরিশ্রমে যা আয় করেছি, তাই দিয়েই সংসার চালিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, বরিশালে যে বাড়ি আর জমিজমা ছিল, চিকিৎসার খরচ চালাতে সব বিক্রি করে দিয়েছি। এখন যাত্রাবাড়ীতে ভাড়া বাসায় থাকি। নিজের কোনো ঘর নেই। কোনোমতে দিন চলে। দুপয়সা আয় হলে আল্লাহর রহমতে সংসার চলে যায়।

কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই প্রবীণ। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, অসুস্থ হয়ে একটানা সাত দিন না খেয়ে বাসায় পড়ে ছিলাম। কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। আত্মীয়-স্বজনও পাশে ছিল না। তারপরও কারও কাছে হাত পাতিনি। আল্লাহর ওপর ভরসা করে বেঁচে আছি। সরকার যদি একটু সহযোগিতা করত, তাহলে জীবনের শেষ সময়ে কিছুটা নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।

আব্দুর রফ বলেন, আগে শরীরে অনেক শক্তি ছিল, এখন সেটাও নেই। লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারি না। তারপরও পতাকা নিয়ে মাঠে আসি। বাংলাদেশের পতাকা বিক্রি করতে ভালো লাগে। যতদিন শরীরে শক্তি থাকবে, ততদিন এই কাজই করে যাব। কিন্তু নিজের কোনো বাড়ি নেই। মৃত্যুর পর কোথায় শেষ ঠিকানা হবে, সেটাও জানি না।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর লাল-সবুজের পতাকার প্রতি ভালোবাসা নিয়েই তিন দশক ধরে দেশের মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আব্দুর রফ। বয়স, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেও মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন জাতীয় পতাকা। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের মাথা গোঁজার একটি স্থায়ী ঠিকানাও জোটেনি তার। তবু স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে আজও একই কণ্ঠে শোনা যায়- বাবা, পতাকা নেবেন? ১০ টাকারও আছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow