অমুসলিমদের সঙ্গে নবীজির (সা.) আচরণ যেমন ছিল

ইলিয়াস মশহুদ নবীজি (সা.) ছিলেন গোটা মানবজাতি ও বিশ্বের জন্য রহমত। তিনি কেবল মুসলমানদের নবী ছিলেন না, ছিলেন সমগ্র মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও বার্তাবাহক। তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, গোত্র, জাতি ও সমাজের জন্য প্রেরিত হননি। তাঁর আগমন ছিল সকলের জন্য। তাই তিনি সবার কল্যাণ চাইতেন। সবাইকে ভালোবাসতেন। তার অন্তরে অমুসলিমদের প্রতিও বিদ্বেষ ছিল না। অমুসলিমদের সঙ্গেও তিনি সহৃদয় ও সম্মানজনক আচরণ করেতেন। তাঁর মহান চরিত্রের দুটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিচে তুলে ধরা হলো। নবীজির (সা.) মেহমান একবার এক অমুসলিম ব্যক্তি রাতে নবীজির (সা.) ঘরে মেহমান হন। রাতে তার সামনে খাবার পরিবেশন করা হলে তিনি সব খাবার একাই খেয়ে ফেলেন। এরপর নবীজির (সা.) পবিত্র বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েন। এদিকে শূন্য উদরে বিনিদ্র রাত কাটিয়ে সকালে নবীজি (সা.) মেহমানের খবর নিতে এলেন। দেখলেন, ঘরে মেহমান নেই, মেহমানের সম্ভবত বদ-হজম হয়েছিল, পুরো ঘর নোংরা হয়ে আছে। এমন দৃশ্য দেখে রাগ করেননি নবীজি (সা.)। তবে আফসোস করলেন, অসুস্থতার সময়ে তিনি মেহমানের খেদমত করতে পারেননি। মেহমান শেষ রাতে ঘর নোংরা করে তাড়াহুড়ো করে যাওয়ার সময় নিজের তরবারিটি ফেলে গিয়েছিলেন। নবীজি (সা.)

অমুসলিমদের সঙ্গে নবীজির (সা.) আচরণ যেমন ছিল

ইলিয়াস মশহুদ

নবীজি (সা.) ছিলেন গোটা মানবজাতি ও বিশ্বের জন্য রহমত। তিনি কেবল মুসলমানদের নবী ছিলেন না, ছিলেন সমগ্র মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও বার্তাবাহক। তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, গোত্র, জাতি ও সমাজের জন্য প্রেরিত হননি। তাঁর আগমন ছিল সকলের জন্য। তাই তিনি সবার কল্যাণ চাইতেন। সবাইকে ভালোবাসতেন। তার অন্তরে অমুসলিমদের প্রতিও বিদ্বেষ ছিল না। অমুসলিমদের সঙ্গেও তিনি সহৃদয় ও সম্মানজনক আচরণ করেতেন। তাঁর মহান চরিত্রের দুটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিচে তুলে ধরা হলো।

নবীজির (সা.) মেহমান

একবার এক অমুসলিম ব্যক্তি রাতে নবীজির (সা.) ঘরে মেহমান হন। রাতে তার সামনে খাবার পরিবেশন করা হলে তিনি সব খাবার একাই খেয়ে ফেলেন। এরপর নবীজির (সা.) পবিত্র বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েন।

এদিকে শূন্য উদরে বিনিদ্র রাত কাটিয়ে সকালে নবীজি (সা.) মেহমানের খবর নিতে এলেন। দেখলেন, ঘরে মেহমান নেই, মেহমানের সম্ভবত বদ-হজম হয়েছিল, পুরো ঘর নোংরা হয়ে আছে। এমন দৃশ্য দেখে রাগ করেননি নবীজি (সা.)। তবে আফসোস করলেন, অসুস্থতার সময়ে তিনি মেহমানের খেদমত করতে পারেননি।

মেহমান শেষ রাতে ঘর নোংরা করে তাড়াহুড়ো করে যাওয়ার সময় নিজের তরবারিটি ফেলে গিয়েছিলেন। নবীজি (সা.) সেটি নিয়ে তার অপেক্ষায় রইলেন। এরপর মেহমান তরবারি নেওয়ার জন্য ফিরে এলে নবীজি (সা.) তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিলেন এবং তরবারিটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘রাতে আমার বাড়ির খাবার খেয়ে তোমার পেট খারাপ করেছে, আমাকে জাগালেই পারতে, আমি তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতাম। তুমি কষ্ট পেয়েছ, আমাকে মাফ করে দিয়ো। আর এই  নাও তোমার তরবারি।’

অমুসলিম ব্যক্তিটি মনে মনে ভাবলেন, যাঁর এক হুকুমে তরবারির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যেতে পারত আমার মস্তক এবং এখনই লুটোপুটি খেতে পারত মরুভূমির তপ্ত বালুতে, সেই মানুষ আমার সঙ্গে এত বিনম্র, এত ভদ্র আচরণ করছেন, অবশ্য তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন!

তিনি তরবারিটি নবীজির (সা.) পায়ের কাছে রেখে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন এবং তখনই কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন। (বায়হাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ: খণ্ড-৬, পৃষ্ঠা-১০০)

ইহুদি পণ্ডিতের ঋণ ও নবীজির (সা.) ধৈর্য

জায়েদ নামে বড় একজন ইহুদি আলেম ছিলেন। প্রচুর সম্পদ ছিল তাঁর। নবীজির (সা.) মদিনায় হিজরতের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নবীজির (সা.) সঙ্গে অনেক যুদ্ধেও অংশ নেন। তাবুকযুদ্ধের সফরে তিনি ইন্তেকাল করেন।

আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) থেকে বর্ণিত জায়েদ (রা.) বলেন, আমি প্রথমবার যখন নবীজিকে (সা.) দেখি, তখনই তাঁর নবুয়্যতের অনেক নিদর্শন আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। তবে শুধু দুটি নিদর্শন আমি বুঝতে পারিনি—একটি হলো, তাঁর ধৈর্য সবসময় রাগের ওপর প্রবল থাকবে। দ্বিতীয়টি হলো, মূর্খ লোকদের বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও তাঁর ধৈর্য অটুট থাকবে। জায়েদ (রা.) বলেন, আমার ইচ্ছা জাগল নবীজির (সা.) সঙ্গে এমন কোনো আচরণ করব, যাতে অপর দুটি নিদর্শনও আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়।

একদিন নবীজি (সা.) ঘর থেকে আলীকে (রা.) সঙ্গে নিয়ে বের হন। তখন গ্রাম থেকে এক ব্যক্তি বাহনে চড়ে তাঁর কাছে এসে বলল, আল্লাহর রাসুল, অমুক মহল্লার সবাই মুসলমান, তারা বেশ ক্ষুধার্ত। ভালো মনে করলে তাদের কাছে কিছু সাহায্য পাঠিয়ে দিন।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘আমি অবশ্যই পাঠাতাম; কিন্তু এখন আমার কাছে কিছুই নেই।’ জায়েদ বলেন, এই কথা শুনে আমি নবীজির (সা.) কাছে গিয়ে বললাম, ‘মুহাম্মাদ, আপনি চাইলে আমার থেকে এখন কিছু টাকা নিয়ে নিন, দুই মাস পর এর বিনিময়ে খেজুর দিয়ে দেবেন।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘ঠিক আছে, দিয়ে দাও।’

তখন আমি তাঁকে ৮০ দিনার দিই। জায়েদ (রা.) বলেন, দুই মাস পূরণ হতে তখনো দুদিন বাকি। এর আগেই আমি নবীজির (সা.) কাছে গিয়ে হাজির। তিনি তখন একটা জানাজার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আবু বকর, ওমর, ওসমান ছাড়াও অনেক সাহাবি ছিলেন। আমি সবার সামনেই তাঁর জামা ও চাদর টেনে ধরে ক্ষোভ মিশিয়ে বললাম, ‘মুহাম্মদ, আমার পাওনা আদায় করে দাও। আল্লাহর কসম, তোমরা কুরাইশের লোকেরা পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করো।’ এ রকম আরও কিছু কটুকথা বললাম।

আমার দৃষ্টি যখন ওমরের দিকে পড়ে, দেখি তিনি রাগে কটমট করছেন। ওমর বললেন, ‘হে আল্লাহর দুশমন, তুমি কি নবীজির (সা.) সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছ, যা আমি শুনতে পাচ্ছি? আল্লাহর কসম, আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দেব।’

কিন্তু নবীজি (সা.) একটুও ‍উত্তেজিত হননি। তিনি শান্তভাবে ওমরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘ওমর, আমি ও এই ব্যক্তি তোমার থেকে ভিন্ন আচরণ পাওয়ার হকদার ছিলাম। তুমি আমাকে দ্রুত তার প্রাপ্য আদায়ের পরামর্শ দিতে পারতে আর তাকে কথায় ও আচরণে নম্রতা অবলম্বনের তাগিদ দিতে পারতে। তুমি তার সঙ্গে গিয়ে তার প্রাপ্য পরিশোধ করে দাও এবং সঙ্গে বাড়তি আরও ২০ সের দিয়ো। কারণ তুমি তাকে ভয় দেখিয়েছ।’

আমি ওমরের সঙ্গে গেলাম। তিনি আমার প্রাপ্য পরিশোধ করলেন এবং সঙ্গে ২০ সের বাড়তি দিলেন। আমি তখন ওমরকে (রা.) বললাম, ‘ওমর, আপনি কি জানেন আমি এমন কেন করেছি? এর আগে নবীজির (সা.) নবুয়্যতের সব আলামত আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শুধু এই আলামত সম্পর্কে জানা বাকি ছিল। তা-ও এখন দেখে নিলাম।’

এরপর জায়েদ (রা.) নবীজির দরবারে উপস্থিত হয়ে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। (মুসনাদে আহমদ: ৩/১৫৩)

ওএফএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow