অরিশা মাসতুরার গল্প : নীল অপরাজিতা

অনেক সকালে উঠার অভ্যাস কখনোই হলো না নাইম এর । ভাবতো , অফিস এ রেগুলার যেতে হলে অভ্যাসটা ঠিকই হয়ে যাবে । তাও হলো না। ১১ টাই অফিস। সে ওঠে ঠিক ১০টা ২০ এ। তারপর ১০ মিনিটে রেডি হয়ে দৌঁড়াতে থাকে। ইচ্ছা করে অফিস এর পাশেই বাসা নেওয়া। ভাড়া বাসা। মাত্র ২টা রুম । মাঝে একটা স্পেস আছে, যেখানে ডাইনিং টেবিল রাখা। কোনার দিকে একটা সোফা সেট। মাঝে টি টেবিল। ছোট্ট বাসা । কিন্তু ভীষণ সুন্দর করে গোছানো। সুবার সবকিছু সুন্দর করে রাখার বাতিক আছে। ওর সাথে থেকে থেকে নাইম এরও এখন একই অভ্যাস। কোনো কিছু এলোমেলো দেখলে তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কেউ বাসায় এসে যদি কার্পেটের ওপর জুতা পায়ে উঠে পড়ে, বিরক্তি তে তার চোখ কুঁচকে যায়। একবার অফিস এর একজন কলিগ আর তার মেয়ে এলেন। মেয়েটা ছোট, ৬ কী ৭ বছর ,দেয়ালে ঝুলানো গাছের বাকলগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলল। নাইম প্রচন্ড রাগে মেয়েটাকে ধমক দিয়ে ফেলল। ধমকে অবশ্য মেয়ের কিছু হলো না। মেয়ের মা গোমড়া মুখে মেয়েকে টানতে টানতে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন । সুবা অবশ্য খুব রাগ করেছিল। প্রচন্ড রাগে সে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। নাইমের নিজেরও খানিকটা মন খারাপ লাগছিল। ছোট একটা মেয়ে । ধ

অরিশা মাসতুরার গল্প : নীল অপরাজিতা

অনেক সকালে উঠার অভ্যাস কখনোই হলো না নাইম এর । ভাবতো , অফিস এ রেগুলার যেতে হলে অভ্যাসটা ঠিকই হয়ে যাবে । তাও হলো না। ১১ টাই অফিস। সে ওঠে ঠিক ১০টা ২০ এ। তারপর ১০ মিনিটে রেডি হয়ে দৌঁড়াতে থাকে। ইচ্ছা করে অফিস এর পাশেই বাসা নেওয়া। ভাড়া বাসা। মাত্র ২টা রুম । মাঝে একটা স্পেস আছে, যেখানে ডাইনিং টেবিল রাখা। কোনার দিকে একটা সোফা সেট। মাঝে টি টেবিল। ছোট্ট বাসা । কিন্তু ভীষণ সুন্দর করে গোছানো। সুবার সবকিছু সুন্দর করে রাখার বাতিক আছে। ওর সাথে থেকে থেকে নাইম এরও এখন একই অভ্যাস। কোনো কিছু এলোমেলো দেখলে তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কেউ বাসায় এসে যদি কার্পেটের ওপর জুতা পায়ে উঠে পড়ে, বিরক্তি তে তার চোখ কুঁচকে যায়। একবার অফিস এর একজন কলিগ আর তার মেয়ে এলেন। মেয়েটা ছোট, ৬ কী ৭ বছর ,দেয়ালে ঝুলানো গাছের বাকলগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলল। নাইম প্রচন্ড রাগে মেয়েটাকে ধমক দিয়ে ফেলল। ধমকে অবশ্য মেয়ের কিছু হলো না। মেয়ের মা গোমড়া মুখে মেয়েকে টানতে টানতে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন । সুবা অবশ্য খুব রাগ করেছিল। প্রচন্ড রাগে সে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। নাইমের নিজেরও খানিকটা মন খারাপ লাগছিল। ছোট একটা মেয়ে । ধমক টা না দিলেও তো হতো। 


কখনও কখনও কিছু ভুল খুব অনিচ্ছাকৃত ভাবে হয়ে যায়। যা হাজার বার সরি বললেও আর ঠিক করা যায় না । এটা সুবা বলে। সুবা খুব চমৎকার ভাবে কথা বলে।  ওর  কথা শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে নাইম এর মনে হয় যদি সময় থামানোর কোন পদ্ধতি ওর জানা থাকতো ; তাহলে ঠিক এমন একটি মুহূর্ত সে থামিয়ে রাখতো। শুধু সুবা সেই সময়টা তে থাকবে। সে অনবরত কথা বলবে আর অনন্ত কাল নাইম শুধু তার কথাই শুনে যাবে।


নাইম ভুল করতে চায় না । অন্তত আজকের দিনটিতে তো না ই। আজ খুব বিশেষ একটি দিন। আজ তার আর সুবার বিবাহ বার্ষিকী। একটি বছর আগে সে এই দিনটিতে সুবা কে বিয়ে করেছিল । কি আশ্চর্য !  এত দ্রুত সময় কেটে গেলো !
সুবা র সাথে তার বিয়ের ঘটনাটাও খুব মজার একটা ব্যাপার। বিয়ের ঠিক একদিন আগে সুবা টেলিফোন করল। গম্ভীর গলায় বলল , তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে ?
নাইম সাথে সাথে বলল, হ্যাঁ ।
- ok good. Then পরশু আমাদের বিয়ে। 
নাইম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, মজা করছ?
- না । মজা করছি না । আমি সিরিয়াস। শুধু সিরিয়াস না, damn সিরিয়াস। 
- তুমি জানো আমি এখনও চাকরি খুঁজছি।
_ লাস্ট ৮ মাস ধরেই খুঁজছো।
- আমাকে আরেকটু সময় দেও। 
_আরেকটু সময় এর কেনো প্রয়োজন তোমার ? আমার বাসার সবাই সব কিছু জানে,তোমার বাসায় ও সেম। আমরা যে বিয়ে করব এটা আমরাও জানি।তাহলে কেনো আরও একটি দিন আমাকে তোমার স্ত্রী পরিচয়টা বহন করার ভাগ্য থেকে বঞ্চিত করতে চাইছো ? 
_ কোথায় থাকবে বিয়ের পর এসে ?
_ তোমার সাথে ।
_ সুবা, আমি মেসে থাকি। ছেলেদের মেস।
_ ওটা ছেড়ে বাসা নিবা।
_ পাগল হয়ে গেছো? বাসা ভাড়া কে দিবে? তুমি আমার অবস্থা তো জানোই , জানো না ?
_ জানি ।
_তাহলে ?
_ শুধু এইটা বলো,পরশু আমাকে বিয়ে করতে তোমার আপত্তি আছে ? 
_ না । 
_তাহলে আর একটি কথা ও বলবে না । তোমার বউ হবো ; এই স্বপ্ন লাস্ট ৪টা বছরে ঠিক কতবার দেখেছি, জানো ?
_ না ।
_ আমিও ও জানি না । সুবা হেসে ফেললো, একই স্বপ্ন আর দেখতে ভালো লাগে না , নাইম।
নাইম এর সমস্ত শরীর ধরে কেউ যেন কাঁপুনি দিচ্ছে,ঠিক এমন অনুভতি হলো তার । এই চমৎকার মেয়েটি সত্যিই তার মতো একজন অতি সাধারণ ছেলেকে বিয়ে করতে চলেছে?


নাইম এলার্ম দিয়ে রেখেছিল । যেনো ঠিক ৭টায় তার ঘুম ভাঙে। এলার্ম দেয়ার পদ্ধতিটা ইন্টারেস্টিং। এলার্ম দেয়া হয়েছে প্রতি ৫ মিনিট পর পর মোট ছ বার। ৬.৩৫ থেকে ঘড়ি ডাকতে শুরু করবে । কোনো কারনে বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ার কোনো উপায় নেই । কারণ ঠিক ৫ মিনিট পর ঘড়ি আবার ডাকা শুরু করবে। তবে আজ ঘড়ির প্রয়োজন হলো না । নাইম এর ঘুম ৭ টার অনেক আগেই ভেঙে গেলো । সে প্রথমে সময় নিয়ে ব্রাশ করলো। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গোঁফ এর নিচের দিকটা সুন্দর করে সাইজ করে কেটে নিলো। গোসল করলো ঠিক ৩০ মিনিট ধরে। চুলে দুইবার শ্যাম্পু তারপর কন্ডিশনার, মুখে সুবার পছন্দের ফেসওয়াশ; সবকিছুই সে খুব সময় নিয়ে শেষ করলো।


সকালে ব্রেকফাস্ট না করতে করতে অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন ব্রেকফাস্ট করলেই অস্বাভাবিক লাগে। মেসে যখন থাকতো সাথে আনিস নামের একজন ভদ্রলোকও ছিলেন তার সাথে। তিনি বলতেন সকালে না খাওয়াই উত্তম। তার সাথে থেকে থেকেই এই অভ্যাস। ভদ্রলোক ব্যাংক এর ক্যাশিয়ার ছিলেন।  নিতান্তই হাবা গোবা গোছের মানুষ। কম বয়সে একবার বিয়ে করেন, কিন্তু স্ত্রীর অন্য ছেলের সাথে তুখোড় প্রেম ছিল। বিয়েটা ৪ মাস এর বেশি টেকে নি। তারপর আর বিয়ে করেন নি। ভদ্রলোক এর কথায়, ডিভোর্সের ১০ বছর পরও সেই মাত্র ৪ মাসের বিবাহিত স্ত্রীর জন্য পরম মমতার স্পর্শ পাওয়া যেতো। নাইম ভীষন অবাক হতো। মাত্র ৪ মাসেই এতোটা ভালোবাসা তৈরি করে রেখে মেয়ে টা কি নির্দ্বিধায় ছেড়ে চলে গেলো !


আনিস সাহেব এর কথা ভাবতে ভাবতে নাইম একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো । ভদ্রলোকের সাথে দেখা হয় না কতদিন। কেমন আছেন কে জানে। সে সুবার সাথে যখন রাত জেগে প্রেম করত, ভদ্রলোক ও খুব আগ্রহ নিয়ে জেগে থাকতেন। নাইম অনেক আস্তে কথা বললেও লোকটা যেনো সব শুনতে পারতেন । হঠাৎ হঠাৎ কোনো কথা শুনে উত্তর দিয়ে ফেলতেন অথবা হেসে উঠতেন । ব্যাপারটা নিয়ে তিনি ন্যূনতম লজ্জিত বোধও করতেন না । যেনো এটাই স্বাভাবিক। নাইম এর মনে পড়ল, ঠিক এক বছর আগে আনিস নামের হাবাগোবা লোকটা না থাকলে হয়তো সুবার সাথে তার বিয়েটাই হতো না । সেই অভাবের দিনে ভদ্রলোক কোথা থেকে ৩০ হাজার টাকা তার হাতে দিয়ে বললেন, "মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলো না , ধরে রেখো। একবার হারিয়ে ফেললে নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে , নাইম।আর, টাকা টা কোনো একদিন আমাকে দিয়ে যেও,যেদিন তোমার পক্ষে সম্ভব হবে ।" সেদিন তার গলায় ছিল প্রচন্ড মমতা। কেনো যে তিনি এতোটা করেছিলেন নাইম এর জন্য তিনিই জানেন। নাইম তার হাত ধরে কিছু একটা বলতে যেয়েও শেষ পর্যন্ত আর বলতে পেরেছিলো না, তার গলা ধরে এসেছিলো। কিছু কিছু কথা কেনো যেনো ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। তার মনে হচ্ছিল,জীবনে প্রথম মাথার উপর কোন ছায়ার উপস্থিতি অনুভব করলো সে।


অনেক ছোট থাকতে মাকে হারানো, তারপর বাবার বিয়ে, সে সংসারে তার ছোট ভাইবোন, সবকিছু যেনো তাকে এটায় শিখিয়েছিল যে, নিজের জীবনটা তার নিজেরই গুছাতে হবে। হেরে যেয়ে আশ্রয় নেয়ার মত জায়গাটা তার নেই কিংবা হাত ধরার মতো এগিয়ে দেওয়া কোনো হাত তার নেই।


প্রথম প্রথম সুবা সকাল সকাল উঠে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতো ।  ডিম ভাজি, পরোটা । যদিও সে খুব ভালো রান্না পারে না , তবু কাঁচা হাতে সবকিছু করার সে কি উত্তেজনা তার। মেয়েটাকে খুশি করতে খুব আনন্দ নিয়ে সব খেয়ে ফেলত সে।
 বিয়ের পর প্রথম সকাল । ঘুম ভাঙ্গতেই দেখে বড় বড় চোখে সুবা তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার বুক ধক করে উঠল। সুবা কোথা থেকে এলো। স্বপ্ন না তো ? এমন কত হাজার ও স্বপ্নই তো সে দেখেছে । তাহলে কি পুরোটাই স্বপ্ন ?
সুবার মুখ ভর্তি হাসি। সে হাসি মুখে বলল, যদি আপনি উঠতেন আমার স্বামীকে চা খাওয়ানোর সৌভাগ্য টা একটু পেতে পারতাম !


নাঈম স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। না ,স্বপ্ন না। সত্যিই মেয়েটি তার সামনে; এই যে ; হাত বাড়ালেই স্পর্শ করা যায়। 
নাইম ঘুম জড়ানো গলায় বলল, একটু কাছে আসো সুবা। অনেক কাছে । তোমার নিঃশ্বাস এর শব্দ যেনো আমি শুনতে পাই। প্লীজ?


ঠিক ৮ টা বাজতে নাইম বের হলো। প্রথমে নীলক্ষেত যাবে । একটা বই আর সুবার প্রিয় বেলি ফুল কিনতে হবে। সাথে টকটকে লাল গোলাপ।গোলাপ গুলো কিনতে হবে কাঁটা সহ। কাঁটা না থাকলে সুবার মন খারাপ হয়ে যায়। তার ধারণা কাঁটা ছাড়া গোলাপ এর কোনো সৌন্দর্যই নেই। যেমন চুল ছাড়া রমণী!

বেলি ফুল পাওয়া গেলো না। নাইম এর হাতে একটা নীল অপরাজিতা । ফুলটি অসম্ভব সুন্দর। সুবা হাতে নিয়ে কি ধরনের পাগলামি যে করতে পারে ভাবলেই নাইমের হাসি পাচ্ছে। হয়তো চিৎকার করবে ; না হয় জড়িয়ে ধরে এমন একটা কান্ড করবে, মনে হবে, মাত্র দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো খবরটি এই মেয়েটিকে দেয়া হয়েছে। নাইম হেসে ফেললো। ছোট ছোট ব্যাপার গুলোও যে বিশাল ভাবে উপভোগ করা যায় নাইম সুবার থেকে শিখেছে। একবার মেলা থেকে লটারির টিকিট কিনল ওরা। লটারি তে তৃতীয় পুরস্কার চায়ের ফ্ল্যাস্ক পেয়ে সে কি সীমাহীন আনন্দ তার। যেনো ফ্লাস্ক না ; আমেরিকা যাবার টিকিট হাতে পেয়েছে সে। বাচ্চাদের মতো লাফালাফি নাচানাচি। আবেশ প্রক্রিয়ার মতো এ ব্যাপার গুলো নাইম এর মধ্যেও প্রবাহিত হতো। কিছুক্ষন এর মধ্যে সেও সুবার মতো বাচ্চা হয়ে যেতো।


আনিস সাহেব দরজা খুলে কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। যেনো ভূত দেখছেন । তারপর বিস্ময় কাটিয়ে বললেন, নাইম তুমি ! কেমন আছো ? ঠিক আছো?
নাইমের মুখ ভর্তি হাসি। সে হাতে রাখা একটি বই আনিস সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, আপনার জন্য সামান্য একটা উপহার ভাইজান। 
আনিস সাহেব বইটা নিলেন।
"Love for imperfect things ". "Haemin Sunim" এর লেখা বিখ্যাত একটি বই। আনিস এর বিস্ময় ভাব এখন ও কাটছে না। সে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, ভিতরে আসো নাইম।
- না ভাইজান,আজ কোনভাবেই সম্ভব না। আজ তো খুব বিশেষ একটি দিন।
- কি দিন?
নাইম মুখ টিপে হাসছে।


_ ভুলে গেলেন ভাইজান ? এক বছর আগে আপনার বউমাকে আনলাম যে ?
আনিস সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল , ভিতরে এসে বসো নাইম। আসো প্লীজ ।
_ কি যে বলেন ভাইজান। এই যে আজকের দিনে সুবার সাথে দেখা করার আগেই আপনার এখানে আসছি এটা শুনলেই সুবা কি পরিমাণ রাগ করবে আপনি জানেন ? তার উপর আবার ভিতরে বসলে তো আরো দেরি হয়ে যাবে।
আনিস সাহেব আবারও কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নাইম কে হুট করে জড়িয়ে ধরলো। তার চোখে পানি।
_ আরে ভাইজান ! কি করেন ! কান্নাকাটি করেন কেনো। দোয়া দেন ভাইজান। দোয়ার খুব প্রয়োজন। 
আনিস সাহেব চোখ মুছতে মুছতে বলল , দোয়া তো করতেই থাকি।তুমি ভালো থাকো। তোমার জন্য সবসমই মনটা কেমন করে ।


_ আসি ভাইজান। একদিন অনেক সময় নিয়ে আসব । দেরি করলে ফুলগুলো নষ্ট হয়ে যাবে । যা গরম পড়ছে। 
আনিস সাহেব নাইম এর ঘাড়ে হাত রেখে নরম গলায় বললেন , আজ না গেলে হয় না নাইম ?
নাইম অবাক হয়ে বলল , যাবো না ? এক বছর হয়ে গেলো আমাদের প্রিয় দিনটির; আর আমি যাবো না ?
আনিস সাহেব ভাঙ্গা গলায় কিছু একটা বললেন। বুঝা গেলো না । তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ছে ।


নাইম গোলাপ ফুল গুলো এগিয়ে দিলো। লজ্জিত গলায় বলল, আরো আগে আসতাম, সুবা। আনিস সাহেবকে একটা বই দিয়ে এলাম। সকাল থেকে খুব উনার কথা মনে পড়ছিলো। আমাদের বিয়ের দিন কতো দৌড়াদৌড়ি ছোটাছুটি করেছিলেন, মনে নেই ?


নাইম বসল। সে এখানে এসে সবসময় পা ছড়িয়ে বসে পড়ে।
_ আচ্ছা , তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো এখানে ? যা গরম পড়ছে ! তোমার গরম লাগে না তো ? 
নাইম এর চোখ ছলছল করছে। 


- সুবা , তোমার গরম লাগে না তো? আমি তো ফ্যান চালাতে পারি না । তুমি যে চালাও না । আমি চালাই কিভাবে !
নাইম বই এর প্যাকেট টা নীচে নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, এই যে তোমার সংগ্রহতে আরো একটি বই জমা হলো। কিছু না লিখলে তো তুমি আবার রাগ করো। কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কি লিখবো। জানোই তো লেখার মতো কিছুই খুঁজে পাই না আমি । শেষে ‘জীবনানন্দ দাশ’-এর একটি কবিতার লাইন লিখে দিলাম। তোমার আর আমার প্রিয় কবি বলে কথা।
‘শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে-
বলিলাম- একদিন এমন সময়
আবার আসিও তুমি-
আসিবার যদি ইচ্ছা হয়-
পঁচিশ বছর পরে।’

- সুবা। আজ তো এক বছর পূর্ণ হলো আমাদের পূর্ণতার। তুমি আসবে না ? তুমি কি আমাকে ভুলে গেছো সুবা? একবার আসো। অনেক একা লাগে। আমাকে একা ফেলে রেখে এখানে শুয়ে আছো।আমার কথা একটি বারও কি মনে পড়ে না ?
নাইম এর চোখে পানি । সে নীল অপরাজিতাটাকে শক্ত করে ধরে আছে। ঝাপসা চোখে নীল ফুলটাকে কেমন যেনো সাদা সাদা লাগছে। সুবার মতো। সুবা যেদিন মারা যায় কি স্নিগ্ধই না তাকে লাগছিল। শেষবার সকালে তাকে নাইম দেখলো, সাদা ধবধবে একটা জামা ছিল গায়ে। কি সুন্দর,কি সুন্দর! পরীরা যেনো এমনই হয় । সাদা জামাটা কখন টকটকে লাল হয়ে গেলো ! নাইম এর চোখে সাদা স্নিগ্ধ সুবা কেনো এতো কম আসে ! কেনো বারবার তার চোখে সেই টকটকে লাল সুবা ঘুরে বেড়াই?!


নাইম কাদঁছে। সুবার কবরটা এক হাত দিয়ে স্পর্শ করে সে নিঃশব্দে কাদঁছে।
চোখের পানি মুছতে মুছতে সে বলল, ৫ বছরে কতো সারপ্রাইজ দিলে আমাকে ! আর একটি বার দেও। একবার আসো । একবার আমাকে স্পর্শ করে বলে যাও, তুমি আছো। বলে যাও,আমার পাশে তুমি সবসমই যেমন ছিলে এখনও তেমন ই আছো । আমাকে একটু ছুঁয়ে যাও, সুবা। আমাকে একবার ছুঁয়ে দিয়ে যাও।
চোখের পানিতে নীল অপরাজিতাটিকে আর দেখা যাচ্ছে না। সব কেমন চোখের সামনেই হারিয়ে যায়!
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow