অর্ধেক দামে ফল মেলে ঢাকার যে বাজারে
পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিলের সামনের ফুটপাতে প্রায় ৩০ বছর ধরে বসছে ব্যতিক্রমী এক ফলের বাজার। এখানে আপেল, আঙুর, মাল্টা, কমলা, নাশপাতি, ডালিম, আমসহ দেশি-বিদেশি নানান ধরনের ফল পাওয়া যায় বাজারদরের প্রায় অর্ধেক দামে। সামান্য দাগ, চাপ কিংবা পরিবহনের সময় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে মূল বাজারে কম চাহিদাসম্পন্ন এসব ফলই এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যখন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্যতালিকা থেকে ফলসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার কমে যাচ্ছে, তখন পুরান ঢাকার এই ফলের বাজার অনেক মানুষের কাছে আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। অল্প দামে ফল কেনার সুযোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার সংগ্রাম এবং খাদ্য অপচয় রোধ—সব মিলিয়ে প্রায় তিন দশকের পুরোনো এই বাজার তৈরি করেছে এক ভিন্ন বাস্তবতার গল্প। সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত আহসান মঞ্জিল। এই নবাব বাড়ির দক্ষিণ পাশের ফুটপাত দখল করে টুকরিতে বিভিন্ন ধরনের ফল নিয়ে বসেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এখান থেকে একটু হাঁটলেই পড়ে ঢাকার বৃহৎ পাইকারি ফলের বাজার বাদামতলী। প্রতিদিন ভোর থেকেই বাদামতলীর সরু পথ প্রাণচা
পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিলের সামনের ফুটপাতে প্রায় ৩০ বছর ধরে বসছে ব্যতিক্রমী এক ফলের বাজার। এখানে আপেল, আঙুর, মাল্টা, কমলা, নাশপাতি, ডালিম, আমসহ দেশি-বিদেশি নানান ধরনের ফল পাওয়া যায় বাজারদরের প্রায় অর্ধেক দামে। সামান্য দাগ, চাপ কিংবা পরিবহনের সময় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে মূল বাজারে কম চাহিদাসম্পন্ন এসব ফলই এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যখন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্যতালিকা থেকে ফলসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার কমে যাচ্ছে, তখন পুরান ঢাকার এই ফলের বাজার অনেক মানুষের কাছে আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। অল্প দামে ফল কেনার সুযোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার সংগ্রাম এবং খাদ্য অপচয় রোধ—সব মিলিয়ে প্রায় তিন দশকের পুরোনো এই বাজার তৈরি করেছে এক ভিন্ন বাস্তবতার গল্প।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত আহসান মঞ্জিল। এই নবাব বাড়ির দক্ষিণ পাশের ফুটপাত দখল করে টুকরিতে বিভিন্ন ধরনের ফল নিয়ে বসেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এখান থেকে একটু হাঁটলেই পড়ে ঢাকার বৃহৎ পাইকারি ফলের বাজার বাদামতলী।
প্রতিদিন ভোর থেকেই বাদামতলীর সরু পথ প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। ফলবোঝাই কাভার্ড ভ্যান, ছোট ট্রলি আর ক্রেতাদের ভিড়ে জমজমাট পুরো এলাকা। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে বসেন ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা। কারও সামনে সাজানো থাকে লাল আপেল, কারও দোকানে স্তূপ করে রাখা কমলা, আঙুর, মাল্টা, আম কিংবা ড্রাগন। দূর থেকে দেখলে এটি অন্য যে কোনো সাধারণ ফলের বাজারের মতো মনে হলেও একটু কাছে গেলেই চোখে পড়ে ভিন্ন চিত্র। অনেক ফলের গায়ে ছোট ছোট দাগ, কোথাও সামান্য চাপ, আবার কোনো কোনো ফল পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় ডেবে গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন ফলের দোকান কিংবা সুপারশপে যেখানে আমদানি করা আপেলসহ নানান ফল কিনতে কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়, সেখানে এই বাজারে একই ধরনের সামান্য দাগযুক্ত ফল পাওয়া যায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। দামের এই বড় পার্থক্যের কারণেই প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা এখানে আসেন। বিশেষ করে সীমিত আয়ের চাকরিজীবী, শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কম খরচে পরিবারের খাদ্যতালিকায় ফল রাখার সুযোগ পাচ্ছেন।
কথা হয় জাফর নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ১৫০ টাকা কেজি দরে আপেল কিনেছি। পরিবহনের সময় কনটেইনার বা কার্টনে আনার কারণে কিছু ফলে দাগ পড়ে। এ কারণেই এগুলো কম দামে পাওয়া যায়। তবে ফল খাওয়ার উপযোগী এবং আমরা এতে সন্তুষ্ট। বর্তমান বাজারে সাধারণ দোকান থেকে এসব আপেল কিনতে গেলে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দাম পড়ে। কিন্তু এখানে প্রায় অর্ধেক দামে পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি অনেক বড় স্বস্তি।’
শুধু আপেল নয়, মৌসুমভেদে এই বাজারে পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের ফল। গ্রীষ্মকালে আম, লিচু, তরমুজ ও কাঁঠালের চাহিদা বেশি থাকে। অন্য সময় কমলা, আঙুর, মাল্টা ও বিভিন্ন বিদেশি ফলেরও দেখা মেলে। ফলের ধরন ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে দাম নির্ধারণ করেন বিক্রেতারা।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকার বড় বড় ফলের আড়ত, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও পাইকারি বাজার থেকে এসব ফল সংগ্রহ করা হয়। ট্রাক, কনটেইনার কিংবা অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সময় ধাক্কা বা চাপের কারণে অনেক ফলের বাহ্যিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ভেতরের গুণগত মান অনেক ক্ষেত্রেই ঠিক থাকে। মূল বাজারে এসব ফলের দাম কমে গেলে ব্যবসায়ীরা সেগুলো কিনে এনে আহসান মঞ্জিলের সামনের ফুটপাতে বিক্রি করেন।

যশোর / বাজার খরচেই দম বেরিয়ে যাচ্ছে, তাই ফলের কাছে কম আসি

রাজশাহী / ৩৫০ টাকার নিচে নেই মানসম্মত ফল, চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত
প্রায় ১২ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকা ফল বিক্রেতা মিশু বলেন, ‘ভালো আপেলের দাম যেখানে ৩০০ টাকা কেজি, সেখানে হালকা দাগ থাকা আপেল আমরা ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করি। কেজিতে পাঁচ থেকে দশ টাকা লাভ করি। লাভের পরিমাণ কম হলেও বেশি বিক্রি করেই সংসার চালাতে হয়।’
প্রায় ৩০ বছর ধরে এই বাজারের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী হরিদাস বলেন, ‘আগে এখানে ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। এখন বাজার পরিস্থিতির কারণে কোনো দিন ভালো বিক্রি হয়, আবার কোনো দিন সারাদিন বসে থেকেও তেমন বিক্রি হয় না। অনেক সময় ১০ হাজার টাকার ফল কিনে কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যায়। তখন কম দামে বিক্রি করে অন্তত মূলধনের কিছু অংশ উদ্ধার করার চেষ্টা করি।’
স্থানীয়দের মতে, বাদামতলীর এই ফলের বাজার শুধু একটি কেনাবেচার স্থান নয়, বরং এটি পুরান ঢাকার দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত দৃশ্য। প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে এসে কম দামে প্রয়োজনীয় ফল কিনে নিয়ে যান। অনেক ক্রেতা বছরের পর বছর ধরে এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মতে, বাজারে ফলের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে এ ধরনের সাশ্রয়ী বাজার না থাকলে পরিবারের শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের জন্য নিয়মিত ফল কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ত।

পেয়ারা-বরই-আনারস- ছফেদা কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন ক্রেতারা

বিদেশি ফল / আমদানিতে লোকসান, খুচরা বিক্রিতে ‘অতি লাভ’
অন্যদিকে বিক্রেতারাও বলছেন, সীমিত লাভ হলেও এই ব্যবসাই তাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। তাই প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা ও লোকসানের ঝুঁকি নিয়েও তারা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের জন্য ফল বিক্রি করে যাচ্ছেন।
এই বাজার শুধু ক্রেতাদের জন্য সাশ্রয়ী কেনাকাটার সুযোগ তৈরি করেনি, বরং বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকার উৎস হিসেবেও কাজ করছে। প্রতিদিন ভোরে আড়ত থেকে ফল সংগ্রহ করে ফুটপাতে বসে বিক্রি করেন তারা। দিনের বিক্রির ওপর নির্ভর করে চলে তাদের সংসার। বিক্রি ভালো হলে লাভ হয়, আর বিক্রি কম হলে লোকসানের ঝুঁকি নিতে হয়।
খাদ্য অপচয় কমানোর ক্ষেত্রেও বাদামতলীর এই বাজারের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাহ্যিকভাবে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যে ফল অনেক সময় ফেলে দেওয়া হতো, সেই ফলই এখন মানুষের খাবারের টেবিলে পৌঁছে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে একদিকে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কমছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ কম দামে পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ফল কেনার সময় ক্রেতাদের সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ফল অতিরিক্ত পচে গেছে কি না, দুর্গন্ধ আছে কি না কিংবা দীর্ঘদিন সংরক্ষণের কারণে খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে কি না—তা ভালোভাবে যাচাই করে কিনতে হবে। কেনার পর দ্রুত ব্যবহার করাও জরুরি। পাশাপাশি বাজার তদারকি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর রাখতে হবে।
আব্দুল্লাহ আল কাউছার/এমএমএআর/ এমএফএ
What's Your Reaction?



