অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে প্রাক্তন ডিসির ‘স্বপ্নযাত্রা’ অ্যাম্বুলেন্স
লক্ষ্মীপুরের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ‘স্বপ্নযাত্রা’ নাম দিয়ে ১৭টি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। এর মধ্যে রামগতি উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মেঘনা নদীর চর আব্দুল্লাহ, তেলিয়ার চর ও চরগজারিয়ার প্রায় ২০ হাজার মানুষের জন্য একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স (স্পিডবোট) চালু করা হয়। শুরু থেকেই চালক ও তেল সংকটে ব্যবহারবিহীন পড়েছিল অ্যাম্বুলেন্সটি। সেটি এখন বিকল অবস্থায় রামগতি পৌরসভার আলেকজান্ডার এলাকায় সেন্টার খালে পড়ে আছে। দেখলে মনে হয় অ্যাম্বুলেন্সটি নিজেই এখন ‘অসহায়’। উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোছাইন আকন্দ ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি উদ্বোধন করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ বাস্তবায়নে এ অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করা হয়। বিচ্ছিন্ন চর আবদুল্লাহসহ নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে জাইকা, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি কেনা হয়। অ্যাম্বুলেন্স উদ্বোধন করা হলেও তখন চালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এদিকে, উদ্বোধনের ৩ বছর ৬ মাস পর সেই অ্যাম্বুলেন্সটি
লক্ষ্মীপুরের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ‘স্বপ্নযাত্রা’ নাম দিয়ে ১৭টি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। এর মধ্যে রামগতি উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মেঘনা নদীর চর আব্দুল্লাহ, তেলিয়ার চর ও চরগজারিয়ার প্রায় ২০ হাজার মানুষের জন্য একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স (স্পিডবোট) চালু করা হয়।
শুরু থেকেই চালক ও তেল সংকটে ব্যবহারবিহীন পড়েছিল অ্যাম্বুলেন্সটি। সেটি এখন বিকল অবস্থায় রামগতি পৌরসভার আলেকজান্ডার এলাকায় সেন্টার খালে পড়ে আছে। দেখলে মনে হয় অ্যাম্বুলেন্সটি নিজেই এখন ‘অসহায়’।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোছাইন আকন্দ ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি উদ্বোধন করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ বাস্তবায়নে এ অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করা হয়। বিচ্ছিন্ন চর আবদুল্লাহসহ নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে জাইকা, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি কেনা হয়। অ্যাম্বুলেন্স উদ্বোধন করা হলেও তখন চালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
এদিকে, উদ্বোধনের ৩ বছর ৬ মাস পর সেই অ্যাম্বুলেন্সটি রামগতি পৌরসভার আলেকজান্ডার এলাকার সেন্টার খালে পড়ে থাকতে দেখা যায়। চালক নিয়োগ না দেওয়ায় শুরু থেকেই এটি কোনো কাজে আসেনি। এছাড়া একজন রোগীকে চর আব্দুল্লাহ থেকে নিয়ে আসতে ৩-৪ গুণ বেশি টাকা খরচের সম্ভাবনা ছিল। এতে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের গরিব মানুষগুলো এ অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করতেন না। এসব কারণেই ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি অযত্নে-অবহেলায় পড়ে আছে। এতে এর অনেক যন্ত্রাংশও চুরি হয়ে গেছে।
অ্যাম্বুলেন্স প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন সংবাদকর্মী জানান, ২০২২ সালে সাবেক জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোছাইন আকন্দ প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে স্বপ্নযাত্রা অ্যাম্বুলেন্স প্রকল্প নেন। জেলা উপজেলার উন্নয়নের বরাদ্দ থেকে অর্থ নিয়ে ৫ উপজেলায় ১৬টি অ্যাম্বুলেন্স ও একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করেন। প্রত্যেকটি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ২০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য চালকের ব্যবস্থা করা হয়নি। তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদকে। এ মানবসেবামূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে ডিসি আনোয়ার ‘বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন’ পদকও পেয়েছেন।
বদলিজনিত কারণে ডিসি আনোয়ার হোছাইন আকন্দ চলে যাওয়ায় প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। তার পরের ডিসি সুরাইয়া জাহান এসে ২৪ এর নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এরপর আসেন ডিসি রাজীব কুমার সরকার, তিনিও ‘ব্যক্তিগত অ্যাচিভমেন্ট’ দেখানোর জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্মুক্ত লাইব্রেরি স্থাপন করেছেন। কিন্তু স্বপ্নযাত্রা অ্যাম্বুলেন্স ছিল তাদের নজরের বাইরে। বর্তমান জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসানও জনগুরুত্বপূর্ণ অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসটি নিয়ে কোন কথা বলতে রাজি নন।
স্বপ্নযাত্রা অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার নীতিমালায় বলা হয়েছিল, প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্স তিনটি করে ইউনিয়নের রোগীদের সেবা দেবে। কিন্তু চালুর পরপরই চালকদের বিরুদ্ধে নীতিমালা ভাঙার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় ছোট দূরত্বের রোগী পরিবহনের বদলে চালকরা ঢাকা বা চট্টগ্রামে রোগী নিয়ে যাওয়ায় বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েন। এতে স্থানীয় সেবার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদরের একাংশ) আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী কাজে দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মো. মিন্টু ফরায়েজী সরকারি স্বপ্নযাত্রা অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করেন। এরআগে, একই বছর ১৮ আগস্ট রাতে সরকারি স্বপ্নযাত্রা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে কমলনগরের চরকাদিরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খালেদ সাইফুল্লাহ রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী খাসের হাট এলাকায় রাজনৈতিক সভায় যান। ২০২৪ সালের ২২ জুন শহরের ঝুমুর এলাকায় সদর উপজেলার শাকচর ইউনিয়নের স্বপ্নযাত্রা অ্যাম্বুলেন্সটিতে রোগীর পরিবর্তে সাধারণ যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে।
রাজনৈতিক সভায় অ্যাম্বুলেন্স নেওয়ার ঘটনায় তখন চরকাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান খালেদ সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, ‘স্বপ্নযাত্রা’ অ্যাম্বুলেন্সটি কেউ ভাড়ায় নেন না। এমনিতে পড়ে থাকে। কিন্তু চালককে বেতন দিতে হয়। এ জন্য তিনি ভাড়ায় ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর স্বপ্নযাত্রা অ্যাম্বুলেন্সগুলোর আরও বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক অ্যাম্বুলেন্স থেকে 'স্বপ্নযাত্রার লোগো সংবলিত স্টিকার তুলে ফেলা হয়েছে। তদারকি না থাকায় এসব গাড়ি এখন কাদের নিয়ন্ত্রণে চলছে, তা কেউই জানেন না।
ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে চর আবদুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মঞ্জু বলেন, চারপাশে নদী বেষ্টিত চরআব্দুল্লাহ ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নসহ চরগজারিয়া, তেলিয়ারচরের মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের জন্য ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি চালু করা হয়। কিন্তু শুরু থেকেই এটি চালু করা যায়নি। এটি চরাঞ্চলের মানুষের কোন উপকারেই আসেনি।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক ৫ জন ইউপি চেয়ারম্যান জানান, প্রাক্তন ডিসি অ্যাম্বুলেন্সগুলো ভালো উদ্যোগ নিয়েই চালু করেছেন। তবে এটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের গলার কাঁটা হিসেবে রয়েছে। ওই ডিসি যাওয়ার পরে অন্য কেউ এনিয়ে কোনো খোঁজ খবর নেননি। এছাড়া চালকদের স্থায়ী কোনো বেতন ছিল না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাড়া পাওয়া যেত না। এজন্য পরবর্তীতে চালকও পাওয়া যায়নি। ইউনিয়ন পরিষদেরও এত টাকা নেই যে, চালকদের ভাড়া দিয়ে রাখবে।
অ্যাম্বুলেন্সগুলো নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগেও প্রথম থেকেই অনীহা দেখা গেছে। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এটি সরাসরি ডিসি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এখানে স্বাস্থ্য বিভাগকে সংযুক্ত করা হয়নি। এজন্য স্বাস্থ্য বিভাগের কেউই দায়িত্ব নিয়ে বক্তব্য দেবেন না।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন গণমাধ্যমকে বলেন, ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এতদিন ধরে এটি অকার্যকর অবস্থায় কেন পড়ে আছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। দ্রুতই এ ব্যাপারে আমরা ব্যবস্থা নেব।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসানের দাপ্তরিক মোবাইলফোন নম্বরে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
What's Your Reaction?