অসহায় আদ্-দ্বীনের ৭৬ রোগী

রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এনআইসিইউতে (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) থাকা যমজ সন্তানের পিতা মো. রাকিব হাসান। গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে এনআইসিইউয়ের খোঁজে ঘুরছেন তিনি। কোথাও সিট না পেয়ে শেষমেশ প্রতিকার চাইতে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। কিন্তু মহাপরিচালক (ডিজি) বরাবর লেখা আবেদন নিয়ে গিয়ে সেখানে একরকম তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। ডিজির রুমে ঢুকতে না পেরে একজন সহকারী পরিচালকের কাছে যান রাকিব হাসান। তিনি তাকে সাফ জানিয়ে দেন, ‘আপনাদের সমস্যা ছাড়াও বহু কাজ আছে আমাদের হাতে। আপনাদের এসব দেখার সময় নেই।’ শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কক্ষে ঘুরলেও কেউ তার আবেদনটি খুলেও দেখেনি। আরও পড়ুন আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল কম টাকায় তুলনামূলক ভালো সেবা পাই বলে আদ্-দ্বীন আসছি। এখন এই হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছে। বলছে, আমাদের অন্য কোথাও নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। কিন্তু আমি তো কারও সহযোগিতা পাচ্ছি না। দুটো বাচ্চা নিয়ে কীভাবে আমি যাবো? গতকাল সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে গেলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথ

অসহায় আদ্-দ্বীনের ৭৬ রোগী

রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এনআইসিইউতে (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) থাকা যমজ সন্তানের পিতা মো. রাকিব হাসান। গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে এনআইসিইউয়ের খোঁজে ঘুরছেন তিনি। কোথাও সিট না পেয়ে শেষমেশ প্রতিকার চাইতে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। কিন্তু মহাপরিচালক (ডিজি) বরাবর লেখা আবেদন নিয়ে গিয়ে সেখানে একরকম তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তাকে।

ডিজির রুমে ঢুকতে না পেরে একজন সহকারী পরিচালকের কাছে যান রাকিব হাসান। তিনি তাকে সাফ জানিয়ে দেন, ‘আপনাদের সমস্যা ছাড়াও বহু কাজ আছে আমাদের হাতে। আপনাদের এসব দেখার সময় নেই।’ শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কক্ষে ঘুরলেও কেউ তার আবেদনটি খুলেও দেখেনি।

কম টাকায় তুলনামূলক ভালো সেবা পাই বলে আদ্-দ্বীন আসছি। এখন এই হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছে। বলছে, আমাদের অন্য কোথাও নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। কিন্তু আমি তো কারও সহযোগিতা পাচ্ছি না। দুটো বাচ্চা নিয়ে কীভাবে আমি যাবো?

গতকাল সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে গেলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন অসহায় এই পিতা। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘কম টাকায় তুলনামূলক ভালো সেবা পাই বলে এখানে (আদ্-দ্বীন) আসছি। এখন এই হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছে। বলছে, আমাদের অন্য কোথাও নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। কিন্তু আমি তো কারও সহযোগিতা পাচ্ছি না। দুটো বাচ্চা নিয়ে কীভাবে আমি যাবো? অথচ এখান থেকে আমাকে বলছে, এনআইসিইউ ম্যানেজ করে চলে যেতে।’

জাগো নিউজের এই প্রতিবেদক তার আবেদনটি খুলে দেখেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে ৭৬ জনের সই করা ওই আবেদনে লেখা রয়েছে, ‌‌‘আমরা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমাদের রোগীদের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসা করাচ্ছি। এনআইসিইউ, আইসিইউ, এইচডিইউ, সিসিইউ, গাইনি, মেডিসিন ও সার্জারি ওয়ার্ডে থাকা বেশিরভাগ রোগীই সংকটাপন্ন। এদের মধ্যে হাম আক্রান্ত বাচ্চাও আছে। হঠাৎ করে এসব রোগী অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা কঠিন। আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ হওয়ায় এই স্থানান্তর, চিকিৎসা ব্যয় ও সিট পাওয়া দুঃসাধ্য। আমাদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চালিয়ে যাওয়ার সময় ও অনুমতি দিয়ে বাধিত করবেন।’

jagonews24.comস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে দেওয়া চিঠি

চিঠি পড়তে পড়তেই পাশে থাকা একাধিক রোগীর স্বজন এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘আমরা এখন কই যাবো? আমাদের রোগীদের কিছু হয়ে গেলে দায় নেবে কে? সরকার বলছে সহযোগিতা করবে, এখন কই তারা? সরকারি হাসপাতালে আইসিইউয়ে সিট নেই। বেসরকারিতে যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। কী করবো?’

তাদেরই একজন রিক্তা আক্তার। নাম জিজ্ঞেস করতেই কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমার বোনের (কেয়া) বাচ্চাটা এখানে এনআইসিইউতে আছে। আমরা ওর জন্য কোথাও এনআইসিইউ পাইনি। আমরা এখানেই থাকতে চাই, কোথাও যাবো না। আমাদের এলাকার এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হোক আমরা চাই না। শুধু বাচ্চার কারণেই বলছি না, এখানে আমি ও আমার পরিবারের সবাই চিকিৎসা নেই। তাদের সেবা ভালো। আমরা চাই, এই হাসপাতাল যেন বন্ধ না হয়।’

আমরা যে সহায়তা করবো বলেছি, সেটা পেতে রোগীর স্বজনদের সরাসরি হাসপাতাল পরিচালকের কাছে যেতে হবে। তাদের সেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। অথবা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আসলে পরিচালক বা ওই শাখার উপ-পরিচালক ও সহকারী পরিচালকদের সহায়তা পাবেন।— স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস

শুধু রাকিব, কেয়া বা রিক্তা নন; বর্তমানে হাসপাতালটিতে থাকা ৭৬ জন রোগীর স্বজনদের সবারই একই বক্তব্য। এমনকি যারা চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের অনেকের কণ্ঠেই ছিল একই সুর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘আপনি যে অভিযোগ করেছেন— এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই। তবে আমরা যে সহায়তা করবো বলেছি, সেটা পেতে রোগীর স্বজনদের সরাসরি হাসপাতাল পরিচালকের কাছে যেতে হবে। তাদের সেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। অথবা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আসলে পরিচালক (হাসপাতাল) বা ওই শাখার উপ-পরিচালক ও সহকারী পরিচালকদের সহায়তা পাবেন।’

যদিও মহাপরিচালকের এই দাবির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এক রোগীর স্বজন জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউয়ের জন্য তাদের সিরিয়াল ৭৮ নম্বরে। দুইবার খোঁজ নেওয়ার পর ওখানকার দায়িত্বরত ব্যক্তিরা উল্টো ক্ষেপে গেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের তো পরিচালকের রুমেই ঢুকতে দেয় না!’

গত ২৭ মে ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এক থেকে চার দিন বয়সী ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটি বন্ধ করে দেয় এবং দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরবর্তীতে ১১ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মগবাজার শাখার লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

এসইউজে/কেএসআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow