আকবর খসরুর গল্প— এক বেশ্যার চিঠি
আমি অবসরে বই পড়তাম, আমাকে অনেকে বইয়ের পোকা বলতেন। সবসময় পাবলিক লাইব্রেরি যাওয়া সম্ভব ছিলো না। আমি তখন নিজাম ট্রেডার্সে চাকরি করি, বয়সে নবযুবক। বেশিরভাগ শুক্রবারে আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদের দোতলায় অবস্থিত ইসলামি পাঠাগারে গিয়ে বই পড়তাম। ইসলামী ফাউন্ডেশনের ইসলামি পাঠাগারটি শুক্রবারে খোলা থাকতো আর শনিবারে সাপ্তাহিক বন্ধ থাকতো। আমি শুক্রবারের অবসরে সেই লাইব্রেরিতে পড়তাম। তবে ইসলামের সাথে সম্পর্কিত বই ছিলো সেই লাইব্রেরিতে। আমি অন্য বইগুলো ক্রয় করে পড়তাম। তবে নতুন বই কিনে পড়ার মতো টাকা আমার কাছে ছিলো না। যা বেতন পেতাম তা ঘর সংসার চালাতে কষ্ট হতো। তাই আমি পুরাতন বই কিনে পড়তাম। স্টেশন রোড নূপুর মার্কেটে প্রচুর পুরাতন বইয়ের দোকান ছিলো। সেখানে এক তৃতীয়াংশ দরে বই কেনা যেতো। আমি এক শুক্রবারের সন্ধ্যায় নূপুর মার্কেট গেলাম। বস টেইলার্সের পাশের দোকান থেকে কৃষণ চন্দরের ‘এক বেশ্যার চিঠি’ কিনে পড়া শুরু করলাম। অনেক পুরোনো বই। বই নিয়ে বাসায় ঢোকার আগে গলির মুখে, জামালের মুদি দোকান থেকে কিছু সওদা নিলাম। তখন জামাল আমার কাছে বইটি দেখেন। আমি সওদা নিয়ে যখন দোকান থেকে বের হচ্ছিলাম তখন জামাল ভাই অন্যজ
আমি অবসরে বই পড়তাম, আমাকে অনেকে বইয়ের পোকা বলতেন। সবসময় পাবলিক লাইব্রেরি যাওয়া সম্ভব ছিলো না। আমি তখন নিজাম ট্রেডার্সে চাকরি করি, বয়সে নবযুবক। বেশিরভাগ শুক্রবারে আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদের দোতলায় অবস্থিত ইসলামি পাঠাগারে গিয়ে বই পড়তাম।
ইসলামী ফাউন্ডেশনের ইসলামি পাঠাগারটি শুক্রবারে খোলা থাকতো আর শনিবারে সাপ্তাহিক বন্ধ থাকতো।
আমি শুক্রবারের অবসরে সেই লাইব্রেরিতে পড়তাম।
তবে ইসলামের সাথে সম্পর্কিত বই ছিলো সেই লাইব্রেরিতে।
আমি অন্য বইগুলো ক্রয় করে পড়তাম। তবে নতুন বই কিনে পড়ার মতো টাকা আমার কাছে ছিলো না। যা বেতন পেতাম তা ঘর সংসার চালাতে কষ্ট হতো।
তাই আমি পুরাতন বই কিনে পড়তাম। স্টেশন রোড নূপুর মার্কেটে প্রচুর পুরাতন বইয়ের দোকান ছিলো। সেখানে এক তৃতীয়াংশ দরে বই কেনা যেতো।
আমি এক শুক্রবারের সন্ধ্যায় নূপুর মার্কেট গেলাম। বস টেইলার্সের পাশের দোকান থেকে কৃষণ চন্দরের ‘এক বেশ্যার চিঠি’ কিনে পড়া শুরু করলাম। অনেক পুরোনো বই।
বই নিয়ে বাসায় ঢোকার আগে গলির মুখে, জামালের মুদি দোকান থেকে কিছু সওদা নিলাম। তখন জামাল আমার কাছে বইটি দেখেন। আমি সওদা নিয়ে যখন দোকান থেকে বের হচ্ছিলাম তখন জামাল ভাই অন্যজনকে বলছে- আকবর ছেলেটা নষ্ট হয়ে গেছে।
কথাটি আমার কানে আসতেই আমার হাসি পেলো। হাসি নিয়ন্ত্রণ করে কলোনিতে ঢুকে গেলাম। বিড়ম্বনা এড়াতে আমি বইটি পেট ভরাবর সার্টপ্যান্টের নিচে রেখে দিলাম। আমার প্রতিবেশীরা বইয়ের নাম দেখে ভুল বুঝতে পারে, কারণ আমার প্রতিবেশীরা স্কুল-কলেজের বই ছাড়া অন্য বইয়ের সাথে তেমন পরিচিত না।
ঘরে ঢুকতে যাবো এমন সময় মা বললো- তুই তাড়াতাড়ি রোকেয়ার বাসায় যা। রোকেয়ার মায়ের জ্বর, তুই বাবুল ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ নিবি। তারপর রোকেয়ার মাকে দিয়ে আসবি।
আমি বাবুল ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে রোকেয়াদের বাসায় গেলাম। রোকেয়া আমার সমবয়সী, মা রোকেয়াকে পছন্দ করতেন। মায়ের আশা ছিলো রোকেয়াকে পুত্রবধূ করবেন। রোকেয়ার ভাবি আমাকে একদিন বলেছিল— আমি ভবিষ্যতে আপনার বড় কুটুম হবো!
আমাকে দেখে চা তৈরি করলো। রোকেয়া জানতো আমি দুধ চা পছন্দ করি। আমি চা খেতে বসলাম। বসার কারণে বইয়ের কোণায় সার্ট একটু উঁচু লাগছে।
রোকেয়া দেখে বললো- তোমার পেটের উপর উঁচু এটা কী?
আমি বললাম— এক বেশ্যার চিঠি।
রোকেয়ার মুখ কালো হয়ে গেলো। আমাকে কিছু বললো না। তারপর থেকে রোকেয়া আমার সাথে তেমন কথা বললো না। মুখ গোমড়া করে থাকতো।
পরে জেনে ছিলাম, সে মনে করেছিলো কোনো এক বেশ্যা আমাকে প্রেমপত্র দিয়েছিলো। যা আমি সার্টের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলাম।
আমার বাসার পেছনে বরিশাল কলোনিতে পতিতাবৃত্তি হতো। বরিশাল কলোনি দিয়ে আমি নিজাম ট্রেডার্সে যাতায়েত করতাম। অনেক পতিতাদের সাথে আমি কথা বলতাম, তাদের জীবন সম্পর্কে জানতাম। তারমধ্যে অন্যতম কিশোরি পতিতা মুন্নি ও জাহেদা। জাহেদাকে আমি ইউসেপ স্কুলে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু মুন্নি রাজি হয়নি। জাহেদা ইউসেপ থেকে ক্লাস এইট পাস করে ইউসেপের এ কে খান টেকনিক্যাল স্কুল থেকে ট্রেনিং দিয়ে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে সুইং অপারেটর হয়। তাই জাহেদা আমার সাথে দেখা করতো।
রোকেয়া ভেবেছিল জাহেদা আমাকে প্রেমপত্র দিয়েছে।
‘এক বেশ্যার চিঠি’ উর্দু সাহিত্যিক কৃষণ চন্দরের গল্পের বই। প্রথম গল্পটার নামেই সংকলনটার নাম- ‘এক বেশ্যার চিঠি’। দেশভাগের ফলে সৃষ্ট দুর্দশায় এক পতিতা তার কাছে আশ্রিত পুতুল ও বেলা নামে দুই হিন্দু-মুসলিম কিশোরীর ব্যাপারে চিঠি লিখছে জিন্নাহ ও নেহেরুকে। এই দুই মেয়ে দাঙ্গায় তাদের পরিবারকে হারিয়েছে। অনেক দুর্ভোগের পর গল্পের এই পতিতা মহিলাটি তাদের দেখা পায় ও আশ্রয় দেয়। পতিতা মহিলাটি এই মেয়ে দুটোর জীবন তার মতো হোক, সেটা চায় না। তাই সে দুই দেশের দুই ধর্মের নেতাদের কাছে এই দুই মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো আশ্রয় দেওয়ার আকুতি জানিয়ে যাচ্ছে। চিঠিটা খুব হৃদয়বিদারক।
দ্বিতীয় গল্পটা মজার, তবে তাৎপর্যপূর্ণ— ‘কুত্তার ফ্যামিলি প্ল্যানিং’। সরকারি আমলাদের অসাড়তা ও দুর্নীতি বোঝাতে লেখক ব্যঙ্গ করে রূপক একটা গল্প লিখেছেন।
তিন নাম্বার গল্পটা মনে প্রচণ্ড দাগ কেটে দিলো— ‘পাপ’। আমেরিকার এক সুখী দম্পতি, জুলিয়াস রোজেনবার্গ ও এথেল, বানোয়াট অভিযোগ এনে তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিলো। ব্যাপক আলোচিত এই মামলা ও প্রহসনমূলক ফাঁসি পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা তার নগ্ন রূপ দেখিয়েছিলো বিশ্ববাসীকে। লেখকের সংবেদনশীল মনে এ ঘটনা বেশ দাগ কেটেছিলো, তা এই গল্প পড়ে বোঝা যায়।
এরপরের গল্প ‘মূর্তি কথা বলে’ এই গল্পটাও রূপকধর্মী। এক ব্যক্তি মাঝরাতে মূর্তিদের কথা বলা দেখতে পায়। মূর্তিগুলো বিভিন্ন নেতাদের। মূর্তির কাছে তাদের মৃত অনুসারীরা আসে। এই অনুসারীরা নানাভাবে তাদের নেতা ও তাদের বাতলানো মতাদর্শের জন্য জীবন দিয়েছে, বিনিময়ে তারা কিছুই পায়নি। মৃত্যুর পর তাদের নাম কোথাও লেখা নেই, কোথাও তাদের আশ্রয় মেলেনি। হাস্যরসাত্মক এই গল্পের কথাগুলো ভাববার মতো।
পরের গল্পটা ‘মন্ত্রীর অসুখ’। যেখানে এক মন্ত্রীর অসুখকে দেখিয়ে আসলে শাসকদের ক্ষমতার জন্য অসুস্থ দৌড়কে দেখানো হয়েছে।
শেষ গল্পটা 'জাম গাছ'। একজন পথচারী জাম গাছের নিচে চাপা পড়ার পর তাকে উদ্ধার করা নিয়ে এক নাটকীয় জটিলতা সৃষ্টি হয়। সরকারের কোন বিভাগ উদ্ধার কাজে যাবে, এই নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অবশেষে লোকটি মারা যায়।
কৃষণ চন্দর সত্যি অসাধারণ লেখক। গল্পে গল্পে তিনি সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অসঙ্গতিগুলো দেখিয়ে দেন।
কিন্তু রোকেয়া তার ভুল বুঝা থেকে কখনো ফিরে আসেনি— সে সত্যি সত্যি মনে করেছিল— জাহেদা আমাকে প্রেমপত্র দিয়েছে। রোকেয়াকে যখন দেখতাম— তখন আমার বুকের মাঝে চিনচিন করে উঠতো— মনে হতো এই জীবনে কী যেন হারিয়ে ফেলেছি!
What's Your Reaction?