আজ থেকে মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনের কঠোর অভিযান
মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের জন্য ঘোষিত স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন কর্মসূচির মেয়াদ আজ শেষ হচ্ছে। কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ কঠোর অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে, যা বিশেষ করে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে বসবাস করছেন। কর্মসূচির সময়সীমা শেষ হয়ে গেলে তারা সরাসরি আইনি ঝুঁকির মুখে পড়বেন। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে সতর্ক করে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ গ্রহণ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০২৫ সালের ১৯ মে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মেয়াদ প্রথমে সীমিত সময়ের জন্য ঘোষণা করা হলেও পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে তা বাড়িয়ে পেনিনসুলার মালয়েশিয়া ও ফেডারেল অঞ্চল লাবুয়ানের জন্য ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। এই সময়ের মধ্যে অবৈধ অভিবাসীরা তুলনামূলক সহজ প্রক্রিয়ায়, মামলা ছাড়াই দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় এরই মধ্যে ২ লাখ ৪ হাজার ৫২৩ জন অভিবাসী নিজ নিজ দেশে ফি
মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের জন্য ঘোষিত স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন কর্মসূচির মেয়াদ আজ শেষ হচ্ছে। কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ কঠোর অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে, যা বিশেষ করে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে বসবাস করছেন। কর্মসূচির সময়সীমা শেষ হয়ে গেলে তারা সরাসরি আইনি ঝুঁকির মুখে পড়বেন। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে সতর্ক করে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ গ্রহণ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০২৫ সালের ১৯ মে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মেয়াদ প্রথমে সীমিত সময়ের জন্য ঘোষণা করা হলেও পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে তা বাড়িয়ে পেনিনসুলার মালয়েশিয়া ও ফেডারেল অঞ্চল লাবুয়ানের জন্য ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। এই সময়ের মধ্যে অবৈধ অভিবাসীরা তুলনামূলক সহজ প্রক্রিয়ায়, মামলা ছাড়াই দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন।
ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় এরই মধ্যে ২ লাখ ৪ হাজার ৫২৩ জন অভিবাসী নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। আর মোট নিবন্ধিত বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯৬১ জনে।
ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, কর্মসূচিটি অবৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছেন—তালিকায় তারা দ্বিতীয় স্থানে। কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মসূচিটি অবৈধ অভিবাসীদের জন্য এক ধরনের ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, কারণ তারা কোনো বিচারিক জটিলতা ছাড়াই দেশে ফিরতে পেরেছেন।
কর্মসূচির আওতায় অপরাধের ধরন অনুযায়ী ৩০০ থেকে ৫০০ রিঙ্গিত পর্যন্ত কম্পাউন্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি প্রতিটি স্পেশাল পাসের জন্য ২০ রিঙ্গিত ফি দিতে হয়েছে। এই সহজ শর্তই অনেককে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে উৎসাহিত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কর্মসূচির শেষ সময় ঘনিয়ে এলে অংশগ্রহণের হার দ্রুত বেড়ে যায়। এবারও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। শেষ মুহূর্তে অনেক অভিবাসী নিবন্ধন সম্পন্ন করে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে ইমিগ্রেশন বিভাগ।
কমিউনিটি নেতা কাজী সালাহ উদ্দিন বলেন, মালয়েশিয়ায় এখনো বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তার মতে, অনেক অবৈধ কর্মী ঝুঁকি নিয়েও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে এসব কর্মীকে বৈধতার আওতায় আনার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান। পাশাপাশি মালয়েশিয়া সরকারের কাছেও প্রত্যাবাসন কর্মসূচির সময়সীমা আরও বাড়ানোর অনুরোধ জানান।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচির মেয়াদ বাড়ানো এবং অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩ হাজার ৩৩২ জন। কিন্তু একই বছর থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন ওয়ার্ক ভিসা বন্ধ রয়েছে। ফলে নতুন করে জনশক্তি রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফর করেন। বর্তমান সরকারের জন্য এটি শ্রমবাজার ইস্যুতে প্রথম উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সফরকালে তারা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সফর শেষে এক ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন বলেন, প্রবাসীদের জীবনমান উন্নয়ন এবং কম খরচে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদান দীর্ঘদিনের। কৃষি, প্ল্যান্টেশন, নির্মাণ, উৎপাদন, সেবা ও খনিজ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের শ্রম, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কাসহ অন্তত ১৪টি দেশের শ্রমিকরা দেশটির উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন।
তবে অভিবাসন ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও মালয়েশিয়া সরকার একাধিক তদন্তের মাধ্যমে দাবি করেছে, ব্যয় বেশি হলেও সরাসরি দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদও এ বিষয়ে পার্লামেন্টে বক্তব্য দিয়ে ‘সিন্ডিকেট’ সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, শ্রমবাজার আংশিক বন্ধ থাকলেও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসীরা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশটি থেকে ১৭৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসে। পরের অর্থবছরে তা ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ২৮০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মালয়েশিয়া থেকে প্রবাসী আয় এসেছে ২৩৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এর ফলে রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশগুলোর তালিকায় মালয়েশিয়ার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে কঠোর ইমিগ্রেশন অভিযান, অন্যদিকে শ্রমবাজার বন্ধ—এই দ্বৈত বাস্তবতা বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান এবং শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ওপর জোর দেওয়ার বিকল্প নেই।
কর্মসূচির শেষ দিনে এসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কঠোর অভিযানের মুখে অবৈধ অভিবাসীরা কী করবে? অনেকেই এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তবে ইমিগ্রেশন বিভাগের বার্তা স্পষ্ট—সময়ের সুযোগ শেষ, এবার আইনের কঠোর প্রয়োগ।
এমআরএম
What's Your Reaction?