আপনার সন্তানকে সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে? কোরআন যে শিক্ষা দেয়

মাঝে মাঝে আমরা বলি যে সন্তানদের সামনে আমাদের নেতিবাচক কথাবার্তা বলা উচিত নয়, তাদের এসব থেকে আড়াল করা বা রক্ষা করা উচিত। কিন্তু কখনো কখনো সন্তানদের স্বার্থেই তাদের এটা জানানো জরুরি হয়ে পড়ে যে কারা তাদের জন্য ভালো আর কারা ভালো নয়; কোন মামা-চাচা কিংবা কোন ভাইয়ের থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ সব পরিবারের পরিস্থিতি তো আর আদর্শ হয় না। অনেক সময় বাবা-মায়েরা এসব শুনতে চান না। সন্তানরা যখন এসে বলে যে আমার ভাই বা বোন এই কাজ করেছে, তখন তারা থামিয়ে দিয়ে বলেন যে আমি এসব শুনতে চাই না, এসবের মধ্যে আমি নেই। আমার এক আলজেরিয়ান বন্ধু একটা যৌথ পরিবারের গল্প বলত, যেখানে একই বাড়িতে তার ভাই, ভাইয়ের বউ, বাচ্চাকাচ্চা—সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন বাচ্চা আর চার-পাঁচটি দম্পতি একসাথে থাকত। সারাদিন বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি আর নানা রকম নাটক লেগেই থাকত। কিন্তু দাদা যখনই বাড়ি ফিরতেন, সব সমস্যা যেন এক পলকে গায়েব হয়ে যেত এবং সবাই সুখী হয়ে যেত। কারণ সেই দাদার একটা নীতি ছিল—বাড়িতে কোনো ঝামেলা হলে তিনি সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে থাপ্পড় মারতেন; তার ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি সবাইকে। ফলে দাদা বাড়ি ফেরার আগেই তাই সব সমস্যার সমাধা

আপনার সন্তানকে সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে? কোরআন যে শিক্ষা দেয়

মাঝে মাঝে আমরা বলি যে সন্তানদের সামনে আমাদের নেতিবাচক কথাবার্তা বলা উচিত নয়, তাদের এসব থেকে আড়াল করা বা রক্ষা করা উচিত। কিন্তু কখনো কখনো সন্তানদের স্বার্থেই তাদের এটা জানানো জরুরি হয়ে পড়ে যে কারা তাদের জন্য ভালো আর কারা ভালো নয়; কোন মামা-চাচা কিংবা কোন ভাইয়ের থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ সব পরিবারের পরিস্থিতি তো আর আদর্শ হয় না। অনেক সময় বাবা-মায়েরা এসব শুনতে চান না। সন্তানরা যখন এসে বলে যে আমার ভাই বা বোন এই কাজ করেছে, তখন তারা থামিয়ে দিয়ে বলেন যে আমি এসব শুনতে চাই না, এসবের মধ্যে আমি নেই।

আমার এক আলজেরিয়ান বন্ধু একটা যৌথ পরিবারের গল্প বলত, যেখানে একই বাড়িতে তার ভাই, ভাইয়ের বউ, বাচ্চাকাচ্চা—সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন বাচ্চা আর চার-পাঁচটি দম্পতি একসাথে থাকত। সারাদিন বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি আর নানা রকম নাটক লেগেই থাকত। কিন্তু দাদা যখনই বাড়ি ফিরতেন, সব সমস্যা যেন এক পলকে গায়েব হয়ে যেত এবং সবাই সুখী হয়ে যেত। কারণ সেই দাদার একটা নীতি ছিল—বাড়িতে কোনো ঝামেলা হলে তিনি সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে থাপ্পড় মারতেন; তার ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি সবাইকে। ফলে দাদা বাড়ি ফেরার আগেই তাই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। এটা নিশ্চিতভাবেই কোনো ইসলামিক তরিকা নয়, কিন্তু তাদের পরিবারের ক্ষেত্রে এটি কাজ করত।

কখনো কখনো আমরা ওই দাদার মতোই বিদ্যমান কোনো দ্বন্দ্বের কথা শুনতেই চাই না বা তার মুখোমুখি হতে চাই না। আমাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই কারো হয়তো রাগের সমস্যা, হিংসা, লম্পট্য ইত্যাদি কুস্বভাব থাকতে পারে। এ রকম সমস্যা থাকলে তার মুখোমুখি হতে হবে। সমস্যা স্বীকার করতে হবে এবং সমাধান খুঁজতে হবে। কখনো কখনো শিশুকে তার ভাই-বোন থেকেও নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হতে পারে।

সুরা ইউসুফে বর্ণিত হজরত ইয়াকুবের (আ.) ঘটনায় আমরা দেখি, তিনি তার ছেলে ইউসুফকে বলেছিলেন, ‘তোমার ভাইদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো।’ তিনি তাকে তার স্বপ্নের কথা ভাইদের বলতে নিষেধ করেছিলেন যেন তারা তার ব্যাপারে ঈর্ষাকাতর হয়ে তার ক্ষতি করার চেষ্টা না করে।

এটা কেবল তাদেরই দোষ নয়; শয়তান মানুষের এক প্রকাশ্য শত্রু এবং সে যে কোনো জায়গায় চলে আসতে পারে। শয়তান শুধু অপরিচিতদের মধ্যেই নয়, বরং পরিবারের ভেতরেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। সে ভাইয়ে-ভাইয়ে, ভাই-বোনে, বাবা-ছেলেতে কিংবা মা-সন্তানের পবিত্র ও রক্তের সম্পর্কগুলো সবার আগে ধ্বংস করতে চায়। মানবজাতিকে ধ্বংস করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো এর মূল ভিত্তি অর্থাৎ পরিবারকে ভেঙে ফেলা। তাই শয়তান পরিবারেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে।

ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানকে প্রথম যে শিক্ষাটি দিয়েছিলেন তা হলো, কাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কোরআনের এই বর্ণনা থেকে আমরা শিখি যে আমাদেরও সন্তানদের বাস্তব পৃথিবী সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং পরিবারের কোনো সদস্য যদি ক্ষতিকর বা টক্সিক হয়, তবে তাদের ব্যাপারেও সন্তানদের আগে থেকেই সতর্ক ও সচেতন করে তুলতে হবে যাতে তারা অতিরিক্ত সরলতার কারণে কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

কোরআন আমাদের অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই শিক্ষা দেয় যে, কেবল পরিবারের সদস্য বা আত্মীয় হলেই কেউ সম্পূর্ণ নিরাপদ নাও হতে পারে; যেমন ইউসুফের (আ.) নিজের ভাইয়েরাই তাঁকে অপহরণ করে কুয়োয় ফেলে দিয়েছিল।

তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইয়াকুব (আ.) এরপর তার সন্তানকে কী বলেছিলেন এবং তার প্রভাব কী ছিল। তিনি বলেছিলেন, তোমার প্রতিপালক তোমাকে বিশেষভাবে মনোনীত করেছেন। আরবিতে ‘ইজতিবা’ শব্দটি তখনই ব্যবহৃত হয় যখন কারো বিশেষ যোগ্যতা বা গুণের ভিত্তিতে তাকে কোনো কাজের জন্য বেছে নেওয়া হয়।

ইয়াকুব (আ.) তার ছেলেকে বলছিলেন যে তোমার মধ্যে এমন কিছু অনন্য গুণ রয়েছে যার কারণে আল্লাহ তোমাকে একটি বিশেষ দায়িত্বের জন্য চয়ন করেছেন। তিনি তাকে জানান যে আল্লাহ তাকে শুধু স্বপ্নের নয়, বরং মানুষের সব ধরনের কথার অন্তর্নিহিত রহস্য ও গভীর অর্থ বোঝার জ্ঞান ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দান করবেন এবং তার ওপর আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণ করবেন। একজন বাবা তাঁর সন্তানকে বলছেন যে তোমার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং তুমি ইবরাহিম ও ইসহাকের গৌরবময় বংশের উত্তরাধিকারী, তুমি তোমার পূর্বপুরুষদের গর্বিত করবে।

এই কথাগুলো ইউসুফ (আ.)-এর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বোঝা যায় এর পরের ঘটনাগুলোতে। এই কথোপকথনের পরপরই তিনি অপহৃত হন এবং এরপর দীর্ঘকাল ধরে তাঁর বাবার সাথে আর দেখা হয়নি। তাঁর পুরো কৈশোর ও যৌবনের একটা বড় অংশ কেটেছে মিশরের এক অমুসলিম পরিবারে, একজন দাস হিসেবে। সেখানে কোনো ইসলামিক পরিবেশ, মসজিদ বা সমাজব্যবস্থার প্রভাব ছিল না; বরং সেটি ছিল এক রাজনীতিবিদের বাড়ি, যেখানে নৈতিকভাবে পথ দেখানোর মতো কোনো অভিভাবক ছিল না। তার ওপর সেখানে এক কুচক্রী নারীর মিথ্যা অপবাদের শিকার হয়ে তাকে দীর্ঘ কয়েক বছর কারাগারে অপরাধীদের সাথে কাটাতে হয়েছিল।

কিন্তু এত প্রতিকূল ও নেতিবাচক পরিবেশের মধ্যেও তিনি যেভাবে নিজের ইমান ও চরিত্রকে ধরে রেখেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল শৈশবে বাবার কাছ থেকে পাওয়া সেই অনুপ্রেরণা ও ইতিবাচক কথাগুলো। বাবা যখন তাকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন, তার মধ্যে বিশেষ কিছু আছে এবং তার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল, তখন সেই আত্মবিশ্বাস ও আলোর বিচ্ছুরণ তিনি নিজের ভেতরে ধারণ করেছিলেন। চারপাশের অন্ধকার তাই তাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করতে পারেনি।

আমাদের সন্তানদের সাথে আমরা কীভাবে কথা বলছি এবং তাদের কী বার্তা দিচ্ছি, তা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: লেখাটি নোমান আলী খানের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত তার "Protecting Our Children" শীর্ষক বক্তব্য অবলম্বনে রচিত।

ওএফএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow