দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় ক্ষেত্র হলো আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত। তবে গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নির্মাণ সামগ্রীর আকাশচুম্বী দাম এবং উচ্চ নিবন্ধন ব্যয়ের কারণে এই খাতটি বড় ধরনের মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে কেন্দ্র করে এই স্থবিরতা কাটানোর জন্য একটি বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী নীতিমালার দাবি উঠেছে সব মহল থেকে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনা সহজ করতে নিবন্ধন খরচ (Registration Cost) বর্তমানের ১১-১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের ব্যবস্থা করার বিষয়টি এখন সময়ের বড় দাবি।
সম্প্রতি আসন্ন বাজেটের রূপরেখা এবং আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। তাদের বক্তব্যে আবাসন খাতকে টেকসই করার জন্য কাঠামোগত সংস্কার, নীতি সহায়তা এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের আবাসন খাতের কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। তিনি নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও টেকসই আবাসন নীতিমালার আলোকে আসন্ন বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, আবাসন খাতকে সচল করতে প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে কাজ করছি। আসন্ন বাজেটে আমাদের মূল লক্ষ্য হবে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন নিশ্চিত করা। শুধু উচ্চবিত্তদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট তৈরি করলেই আবাসন খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি বিশেষ রি-ফাইন্যান্সিং বা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা এবং সিঙ্গেল ডিজিট সুদে (৯ শতাংশের নিচে) ২৫ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ সুবিধা চালু করা আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা এনবিআরের সাথেও কথা বলছি যেন নির্মাণ সামগ্রী, বিশেষ করে রড, সিমেন্ট ও ইটের ওপর শুল্ক কাঠামো কিছুটা শিথিল করা যায়, যাতে উৎপাদন খরচ কমে আসে।
নিবন্ধন খরচ কমানোর দাবি কতটা যৌক্তিক। বর্তমানে বাংলাদেশে একটি ফ্ল্যাট বা জমি নিবন্ধনের সময় গেইন ট্যাক্স, স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর এবং মূসক (ভ্যাট) মিলিয়ে প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত খরচ গুণতে হয় ক্রেতাকে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ, এমনকি উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এই হার অত্যন্ত বেশি। ফলে অনেক ক্রেতাই ফ্ল্যাট কিনেও আইনি জটিলতার ভয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে বিলম্ব করেন, যা সরকারের রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ বিষয়ে অর্থনীতি ও নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএসইআরের চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম তার বিশ্লেষণে বলেন, নিবন্ধন খরচ কমানোর দাবি কেবল রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের স্বার্থে নয়, এটি সাধারণ ক্রেতা এবং স্বয়ং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির স্বার্থেই অত্যন্ত যৌক্তিক। উচ্চ কর হারের কারণে ক্রেতারা অপ্রদর্শিত বা ইনফরমাল চ্যানেলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আমরা যদি এই খরচ কমিয়ে মোট ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে পারি, তবে ফ্ল্যাট কেনাবেচার সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে। ভলিউম বাড়লে দিনশেষে সরকারের মোট রাজস্ব আদায় কমবে না, বরং বাড়বে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যদি এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তবে আবাসন খাতে আটকে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপিটাল বা মূলধন সচল হবে।
আবাসন খাতের টেকসই উন্নয়নের আরেকটি বড় স্তম্ভ হলো যথাযথ ও আধুনিক নগর পরিকল্পনা। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় আবাসন প্রকল্পগুলোকে সুশৃঙ্খল ও পরিবেশবান্ধব করতে রাজউক নতুন অর্ডিন্যান্স ও মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বাজেটের ভূমিকার কথা তুলে ধরে বলেন- ঢাকার ওপর জনসংখ্যা ও আবাসনের যে প্রচণ্ড চাপ, তা কমাতে হলে আমাদের দ্রুত বিকেন্দ্রীকরণ ও স্যাটেলাইট টাউন ধারণায় যেতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজউকের আওতাধীন পূর্বাচল নতুন শহর এবং ঝিলমিল প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর নাগরিক সুবিধা দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এছাড়া, ভবন নির্মাণ বিধিমালা বা ড্যাপ (Detailed Area Plan) বাস্তবায়নে আমরা কঠোর হচ্ছি। নতুন রাজউক অর্ডিন্যান্সের আওতায় নকশা বহির্ভূত বা অবৈধ ভবনের জরিমানার অর্থ সরাসরি নগর উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধিতে ব্যয় করা হবে। আবাসন খাতের উদ্যোক্তাদের আমি বলব, আপনারা শুধু আবাসন ভবন না বানিয়ে খেলার মাঠ, জলাশয় ও গাছপালার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখুন। আসন্ন বাজেটে পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন বিল্ডিং’ আবাসন প্রকল্পগুলোর জন্য বিশেষ কর রেয়াত দেওয়ার সুপারিশ আমরা সরকারের কাছে পাঠিয়েছি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএসইআরের চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো আবাসন খাত। একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে দুই শতাধিক শিল্পখাত-সিমেন্ট, রড, ইট, কাচ, সিরামিক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, আসবাবপত্র, পরিবহন, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে হাজারো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা। ফলে আবাসন খাতের গতিশীলতা একটি শিল্পের সার্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি পুরো অর্থনীতির কর্মচাঞ্চল্যকে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাত মানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার, জমির মূল্য বৃদ্ধি এবং নিবন্ধন ব্যয়ের অতিরিক্ত চাপ সাধারণ মানুষের জন্য নিজের একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাটের স্বপ্নকে ক্রমেই দূরের করে তুলছে। আর ঠিক এই কারণেই আসন্ন জাতীয় বাজেটকে ঘিরে আবাসন খাতের অংশীজনদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা নিবন্ধন খরচ কমানো। কারণ বাস্তবতা হলো, একজন ক্রেতা যখন একটি ফ্ল্যাট কেনেন, তখন তিনি ফ্ল্যাটের মূল্য পরিশোধ করেন। কিন্তু শুধু ফ্ল্যাটমূল্য পরিশোধ করেই কি শেষ? উত্তরটা আমাদের সবার জানা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, উৎসে কর, ভ্যাট এবং অন্যান্য নানা চার্জ।
সাকিফ শামীমের মতে, নিবন্ধন ব্যয় কমানোর বিষয়টি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আবাসন খাতকে একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা। কারণ একটি দেশের নগরায়ণ শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রার মান, কর্মসংস্থান, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই নগর গঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই জায়গা থেকেই সামনে আসে পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রশ্ন। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুর জন্য মানুষের প্রধান গন্তব্য রাজধানী ঢাকা। ফলে ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে আর সেই চাপের প্রভাব পড়ছে আবাসন খাতেও। আজকের ঢাকা যানজট, পরিবেশ দূষণ, জলাবদ্ধতা এবং সীমিত খোলা জায়গার এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। নতুন আবাসন প্রকল্প তৈরি হলেও মানুষের জীবনমান প্রত্যাশিতভাবে উন্নত হচ্ছে না। কারণ নগর উন্নয়নের সঙ্গে জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত বিকেন্দ্রীকরণ। দেশের অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর এবং ময়মনসিংহে পরিকল্পিত আবাসন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা এবং শিল্প বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ঢাকার ওপর চাপ অনেকাংশে কমবে। বিকেন্দ্রীকরণের এই ভাবনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে নতুন নগর ও উপনগর গড়ে তোলার উদ্যোগ। পূর্বাচলের মত বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে আধুনিক আবাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের উন্নয়ন আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে। মানুষকে উন্নয়নের জন্য ঢাকায় আসতে হবে না; বরং উন্নয়নই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।