আমার কবিতা: বিস্তৃতির আড়ালে হারাবার নয়
মাহজাবীন আলমগীর ব্যস্ত নগরজীবনে স্রোতের বিপরীতে হাঁটা কবি-সাহিত্যিকদের একজন মামুন রশীদ। যখন সাহিত্যিকদের অনেকেই লেখালেখিতে সচেষ্ট থাকার পরিবর্তে আত্মপ্রচারে এগিয়ে; তখন মামুন রশীদ অনেকটাই নিভৃতচারী। গুটি গুটি পায়ে সাহিত্যাঙ্গনে ত্রিশ বছর পার করলেও তার নামটি সুপরিচিত নয়, বরং নীরবে নিভৃতে সাহিত্যচর্চাতেই মগ্ন। সম্প্রতি বেহুলাবাংলা প্রকাশন থেকে তার কবিতার বই ‘আমার কবিতা’ প্রকাশ পেয়েছে। বইটি ইতোপূর্বে প্রকাশিত তার পাঁচটি কবিতার বইয়ের সংকলন। গ্রন্থের শুরুতে তিনি বলেছেন, ‘কবিতাকে আঁকড়ে ধরেই তিনি বাঁচতে চেয়েছেন এবং তার কবিতাগুলো বহুল পঠিত না হলেও প্রতিটি কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার কোনো না কোনো স্মৃতি।’ তার বইয়ের কবিতাগুলো সহজ-সরল ভাষায় বর্ণিত। পাঠককে কোনো জটিল শব্দবানে তিনি জর্জরিত করেননি। তার ‘আমি তোর রাফখাতা’ কাব্যগ্রন্থের অর্ন্তভুক্ত একটি কবিতা ‘বর্ণমালা’। সেখানে কবির সহজ-সরল উচ্চারণ, ‘বর্ণমালা প্রেমে না অপ্রেমে তাকিয়ে ছিলাম,/ বুঝিনি, প্রথম দেখার মুগ্ধতা তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছিল।’ বর্ণমালার প্রতি এই আবেগ আপ্লুত উচ্চারণ পাঠকের হৃদয়কে ব্যাকুল করে। মামুন রশীদ বৃষ্টি বিলাসী। তার বইয়ে বৃষ্টি নিয়ে বে
মাহজাবীন আলমগীর
ব্যস্ত নগরজীবনে স্রোতের বিপরীতে হাঁটা কবি-সাহিত্যিকদের একজন মামুন রশীদ। যখন সাহিত্যিকদের অনেকেই লেখালেখিতে সচেষ্ট থাকার পরিবর্তে আত্মপ্রচারে এগিয়ে; তখন মামুন রশীদ অনেকটাই নিভৃতচারী। গুটি গুটি পায়ে সাহিত্যাঙ্গনে ত্রিশ বছর পার করলেও তার নামটি সুপরিচিত নয়, বরং নীরবে নিভৃতে সাহিত্যচর্চাতেই মগ্ন।
সম্প্রতি বেহুলাবাংলা প্রকাশন থেকে তার কবিতার বই ‘আমার কবিতা’ প্রকাশ পেয়েছে। বইটি ইতোপূর্বে প্রকাশিত তার পাঁচটি কবিতার বইয়ের সংকলন। গ্রন্থের শুরুতে তিনি বলেছেন, ‘কবিতাকে আঁকড়ে ধরেই তিনি বাঁচতে চেয়েছেন এবং তার কবিতাগুলো বহুল পঠিত না হলেও প্রতিটি কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার কোনো না কোনো স্মৃতি।’ তার বইয়ের কবিতাগুলো সহজ-সরল ভাষায় বর্ণিত। পাঠককে কোনো জটিল শব্দবানে তিনি জর্জরিত করেননি। তার ‘আমি তোর রাফখাতা’ কাব্যগ্রন্থের অর্ন্তভুক্ত একটি কবিতা ‘বর্ণমালা’। সেখানে কবির সহজ-সরল উচ্চারণ, ‘বর্ণমালা প্রেমে না অপ্রেমে তাকিয়ে ছিলাম,/ বুঝিনি, প্রথম দেখার মুগ্ধতা তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছিল।’ বর্ণমালার প্রতি এই আবেগ আপ্লুত উচ্চারণ পাঠকের হৃদয়কে ব্যাকুল করে।
মামুন রশীদ বৃষ্টি বিলাসী। তার বইয়ে বৃষ্টি নিয়ে বেশ কিছু কবিতা রয়েছে। তেমনি একটি কবিতা ‘বৃষ্টি হচ্ছে’। যেখানে তিনি বলছেন, ‘বৃষ্টি হচ্ছে, জানালার পাশে চুপচাপ ঝরে/ পড়েছে গোপন কান্নার স্রোত।/ দূর আকাশে উড়ে যাচ্ছে রাজহাঁস।/ সযত্নে লুকিয়ে রাখা প্রণয়ের ভ্রমর,/ সখী আজ নিরাভরণ হয়ে তুলে/ আনছে প্রগাঢ় কাতরতা।’ কবিতাটিতে আছে বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা আর প্রিয়তমার নিবিড় সান্নিধ্যের আহ্বান। ঠিক যেমন তার পরের কবিতাটি। যেখানে তিনি বলছেন, ‘স্পর্শের ভেতরে রয়েছে বেঁচে থাকার আকুলতা, সীমাহীন আমোদ।’ তবে কবিতাটিতে শব্দের ব্যবহারে কবি যেন কিছুটা সংযমী।
মানুষের জীবনে দীর্ঘপথ পরিক্রমায় অসংখ্য ঘটনা বা স্মৃতির আবির্ভাব ঘটে। দিনশেষে সব ঘটনা হয়তো মনে থাকে না। তবে কিছু কিছু মনে দাগ কেটে যায়। মামুন রশীদও তার জীবনের অসংখ্য মানুষ বা ঘটনার প্রতিচ্ছবি শব্দের ফ্রেমে সাজিয়ে কবিতায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার কবিতাগুলো বৈচিত্র্যধর্মী। তার কবিতায় নিজের বেড়ে ওঠা শহরের কথা যেমন আছে; তেমনি আছে তার বাল্যসখা আনিসের কথা, পাশের বাড়ির মেয়ের কথা, আছে সমুদ্র দেখার স্মৃতি, বাবাকে নিয়ে, প্রপিতামহকে নিয়ে। এমনকি শিশু সন্তানের মনস্তত্ত্ব, তার আধোআধো বুলি নিয়েও রয়েছে কিছু মজার কবিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি শামসুর রাহমানকে নিয়েও তিনি লিখেছেন।
মামুন রশীদের সব কবিতা হয়তো সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেতে পারেনি। কিন্তু কবির কাছে তো প্রত্যেকটি কবিতার আবেদনই সমান। তাই না? তবে কবি একদিকে যেমন বৃষ্টি বিলাসী তেমনি অন্যদিকে তার অনেক কবিতাতেই ঘুরে ফিরে বারবার এসেছে একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা। তার কবিতা বিষয় আঙ্গিকে বৈচিত্র্যধর্মী হলেও রোমান্টিক কবিতা বা প্রেমের কবিতা লিখতে তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। এ ক্ষেত্রে একটি কথা না বললেই নয়, তার প্রেমের কবিতায় নর-নারীর অভিমান নিয়ে দুঃসাহসী উচ্চারণ নেই। অন্তর্মুখী বৈশিষ্ট্যের স্বভাবসুলভ লাজুকতা হয়তো এ ক্ষেত্রে তার কাব্যসত্তায় প্রভাব ফেলেছে। এটা অবশ্যই সাহিত্যিক বা কবি হিসেবে তার সীমাবদ্ধতা। কারণ একজন কবি যখন কবিতা লেখেন; তখন তার কবিসত্তাকে ছাড়িয়ে যাবার কথা। এ ক্ষেত্রে মামুন রশীদ কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন হয়তো। প্রথম সমুদ্র ভ্রমণের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি লেখেন, ‘সমুদ্র রাখে না কোনো স্মৃতি,/ হাজারো ফটোগ্রাফ এঁকে দেয় মানুষের বুকে।’ অন্য একটি কবিতায় বলেন, ‘প্রতিটি ফুলের রয়েছে নিজস্ব সৌরভ,/ যা তার একান্ত আপন।/ হাতে নিয়ে অবরুদ্ধজীবন পেরিয়ে কারো কারো/ ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে সবচেয়ে উুঁচুতে/ স্থির হয়ে থাকা তারায়।’
মামুন রশীদের কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধ আর একাকিত্ব। মানুষের ভিড়ে কবিতাটি এ ক্ষেত্রে অনন্য। ‘মানুষের ভীড়ে দাঁড়িয়ে যখন/ একা, একা হয়ে যাই, তখন/ গাছেদের মতো চোখ কান বন্ধ করে দেই,/ আমার ভেতরে কোনো হাওয়া আসে না/ বরং আমি একা হাওয়া করে যাই।’ তেমনি আরেকটি কবিতা ‘আমাকে ছেড়ে যায় সবাই, আমি নই’। এ কবিতার শেষ পঙ্ক্তিমালায় তিনি বলেন, ‘ক্ষতবিক্ষত মুদ্রিত ইতিহাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে দেখি,/ বসন্তের চেয়ে ঝরাপাতার স্পর্শ অনেক বেশি সঙ্গীতমুখর।’ আর নিজের অস্থির, চঞ্চল স্বভাব নিয়ে লেখেন, ‘আজো স্থির হওয়া হলো না, আসলে স্থিরতা আমার ধাঁচে নেই।’
মামুন রশীদের কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়, কবিতাগুলোর অধিকাংশই হতাশাবাদী আর বিচ্ছিন্নতাবোধে আচ্ছন্ন। তিনি সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সব কবিই চায় তার কিছু পঙ্ক্তিমালা অমর হয়ে থাকুক পাঠকের হৃদয়ে।’ এ ক্ষেত্রে কবির রচিত ‘একটু একটু করে’ কবিতাটিকে এগিয়ে রাখা যায়। যেখানে তিনি বলেন, ‘একটু একটু করে মানুষ আমাকে জানুক, মনে রাখুক।/ পুরোনো স্মৃতিতে কিছু না কিছু ফেলে আসি,/ ভাবি এইসব স্মৃতিচিহ্নে মানুষ আমাকে জানুক, মনে রাখুক।’
মামুন রশীদের কবিতা বৈচিত্র্যময় নিঃসন্দেহে। মামুন রশীদ পেশাগত জীবনে সাংবাদিক, তবে প্রচারবিমুখ এই কবির কবিতায় অনন্যতা হলো, তার ভাষার সরলতা। কেননা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার একটি প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘সাহিত্যে সকল অলংকারের সেরা অলংকার হলো সরলতা।’ এই সরলতা থেকেই তিনি গ্রন্থের শেষ কবিতায় লেখেন, ‘প্রভু আমি ছাড়া আমার আর কোনো পাঠক নেই।/ পাতায় পাতায় শুধু প্রশ্নবিদ্ধ বাতাস/ সময়ের মতো ভারী।/ যাকে টেনে টেনে নিঃশব্দে চলেছি অন্তহীন পথে।’ পাঠকের মনে গেঁথে থাকার মতো নিঃসন্দেহে একটি সহজ-সরল বিনম্র উচ্চারণ।
ত্রিশ বছরের এই চলার পথটি সহজ ছিল না। অনেক চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করেই তিনি কাব্যজগতে টিকে রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি কতটা সফল বা ব্যর্থ সেটা মুখ্য নয়। কেননা প্রতিটি কবি-সাহিত্যিকের ভেতরেই চলে এক অনিন্দ্যসুন্দর বিনির্মাণের নেশা, লেখকেরা মনপ্রাণ উজাড় করেই সৃষ্টির নেশায় মাতোয়ারা হন। মামুন রশীদ সেই সৃষ্টির আনন্দেই আজও হেঁটে চলেছেন তার কাব্যজগতে। ভালো-মন্দ সব মিলিয়েই তার কবিতার বইটি। তবে কিছু বই থাকে পাঠকের সংগ্রহে পুরাতন বেনারসি শাড়ির মতো, যার পাতার ভাঁজ সচরাচর খোলাই হয় না। বিস্তৃতির আড়ালেই হারিয়ে যায় বইগুলো। মামুন রশীদের ‘আমার কবিতা’ বইটি অন্তত তেমন নয়, বরং কবির সহজ-সরল উচ্চারণ। আর বিনম্র উচ্চারণে পাঠক খানিকটা হলেও অনুপ্রাণিত হবেন বইটির পাতাগুলো মাঝে মাঝে স্পর্শ করতে, কবিতাগুলো আওড়াতে। অনেক অনেক সমালোচনার ভিড়ে এটাই হয়তো সৃষ্টির সার্থকতা, তার বইটির উত্তোরত্তর সাফল্য কামনা করি।
এসইউ
What's Your Reaction?