আমার মা, কখনো ক্লান্ত হন না

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান পৃথিবীতে এমন কোনো অভিধান নেই যেখানে ‘মা’ শব্দটির সঠিক অর্থ লেখা আছে। কারণ এই শব্দটি কেবল বোঝা যায় অনুভবে, স্পর্শে, চোখের কোণে জমে থাকা নীরব দৃষ্টিতে। মায়েরা বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব অথচ সর্বজ্ঞ মানুষ। সন্তানের মুখে কথা ফুটবার আগেই তারা তার অভাব বুঝে ফেলেন, মনের গোপন কষ্ট পড়ে ফেলেন, অপ্রকাশিত প্রয়োজনও টের পান। আমার মা তেমনই একজন সবজান্তা মা। মাসের শেষ, পকেট প্রায় শূন্য কিছু বলার আগেই মা হাতে গুঁজে দেন কিছু টাকা। কখনো চাইতে হয়নি। বরং বলতে গেলে, ‘মা, এসবের কী দরকার?’ মা হেসে বলেন, ‘এখন নাও, পরে দিয়ে দিও।’ সেই ‘পরে’ আর কখনো আসে না। আসে না, কারণ মায়ের কাছে সন্তানের কাছ থেকে ফেরত পাওয়ার কোনো হিসাব নেই। তার ভালোবাসার খাতায় শুধু দেওয়ার কলাম নেওয়ার কলামটি চিরকালের জন্য ফাঁকা। মাকে বড় ভাই হাতখরচের টাকা দেন। আমিও মাসে কিছু দিই। কিন্তু মা যেন সন্তানের কাছ থেকে নেন না, উল্টো দিয়েই যান। কখনো আচার, কখনো নিজ হাতে গুঁড়া করা হলুদ-মরিচ, কখনো শীতের জন্য বরিশালের বানারীপাড়া থেকে বানিয়ে আনা নকশিকাঁথা যেন প্রতিটি সুতায় বোনা আছে তার দোয়া আর উষ্ণতা। পিঠা তো আছেই যেন

আমার মা, কখনো ক্লান্ত হন না

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

পৃথিবীতে এমন কোনো অভিধান নেই যেখানে ‘মা’ শব্দটির সঠিক অর্থ লেখা আছে। কারণ এই শব্দটি কেবল বোঝা যায় অনুভবে, স্পর্শে, চোখের কোণে জমে থাকা নীরব দৃষ্টিতে। মায়েরা বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব অথচ সর্বজ্ঞ মানুষ। সন্তানের মুখে কথা ফুটবার আগেই তারা তার অভাব বুঝে ফেলেন, মনের গোপন কষ্ট পড়ে ফেলেন, অপ্রকাশিত প্রয়োজনও টের পান। আমার মা তেমনই একজন সবজান্তা মা।

মাসের শেষ, পকেট প্রায় শূন্য কিছু বলার আগেই মা হাতে গুঁজে দেন কিছু টাকা। কখনো চাইতে হয়নি। বরং বলতে গেলে, ‘মা, এসবের কী দরকার?’ মা হেসে বলেন, ‘এখন নাও, পরে দিয়ে দিও।’ সেই ‘পরে’ আর কখনো আসে না। আসে না, কারণ মায়ের কাছে সন্তানের কাছ থেকে ফেরত পাওয়ার কোনো হিসাব নেই। তার ভালোবাসার খাতায় শুধু দেওয়ার কলাম নেওয়ার কলামটি চিরকালের জন্য ফাঁকা।

মাকে বড় ভাই হাতখরচের টাকা দেন। আমিও মাসে কিছু দিই। কিন্তু মা যেন সন্তানের কাছ থেকে নেন না, উল্টো দিয়েই যান। কখনো আচার, কখনো নিজ হাতে গুঁড়া করা হলুদ-মরিচ, কখনো শীতের জন্য বরিশালের বানারীপাড়া থেকে বানিয়ে আনা নকশিকাঁথা যেন প্রতিটি সুতায় বোনা আছে তার দোয়া আর উষ্ণতা। পিঠা তো আছেই যেন মায়ের ভালোবাসার এক অনন্ত উৎসব।

আমি সবজি, ছোট পাঁচমিশালি মাছ, ভর্তা পছন্দ করি মা জানেন। আমার বাসায় এলে নিজের টাকায় বাজার করিয়ে এসব রান্না করেন। বয়স নব্বই ছুঁইছুঁই, তবু সন্তানের জন্য তার ব্যস্ততার শেষ নেই। অথচ নিজের জন্য তাকে কখনো কিছু কিনতে দেখিনি। নিজের শখ-আহ্লাদ বোধহয় বহু আগেই সন্তানের কল্যাণে বিলীন করে দিয়েছেন। কখনো কখনো ভাবি মা কি জানেন, তার প্রতিটি ত্যাগের কথা আমার বুকে পাথর হয়ে জমে আছে?

মায়ের চোখ এড়ায় না কিছুই। মুখ শুকনো দেখলে জিজ্ঞেস করেন, ‘বাবা, কী হয়েছে?’ পুরোনো শার্ট, ছেঁড়া মোজা, হলদে হয়ে যাওয়া গেঞ্জি, তাড়াহুড়োয় ভাঁজ হয়ে যাওয়া জুতা সবই তার চোখে পড়ে। শার্ট কেনার টাকা দেন, মোজা কিনতে বলেন, বুয়ার হাতে নীলের প্যাকেট ধরিয়ে দেন। এমনকি নিজে না পারলে বড় ভাইকে বলে দেন আমার জন্য কিনে দিতে। একজন নব্বই বছরের মানুষ কিন্তু সন্তানের যত্নে তার বয়স যেন থমকে আছে সেই কোলে-নেওয়ার দিনটিতেই।

ভাত খেতে বসলে মা পাতে তুলে দেন একের পর এক। আমি বলি, ‘মা, বেশি হয়ে যাচ্ছে।’ মা শুনবেন না। পাশে বসে থাকেন, আমি খাই তিনি দেখেন। মনে হয়, সন্তানের তৃপ্তিময় খাবার দৃশ্যই যেন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। সেই দৃষ্টিতে কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো চাওয়া নেই শুধু আছে এক অপার্থিব তৃপ্তি।

২০০৫ সালের কথা। ছোট্ট চাকরি করি। ইনক্রিমেন্ট হলো। কাউকে না জানিয়ে সব টাকা দিয়ে মাকে একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিলাম। এ কথা আজও আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। মনে হয়, সন্তানের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা নীরব থাকলেই পূর্ণ হয়। সেদিন মা শাড়িটা হাতে নিয়ে কিছু বলেননি। শুধু আঁচলে চোখ মুছেছিলেন। সেই নীরব কান্নাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

করোনাকালে মা আক্রান্ত হলেন। মাঝরাতে হাসপাতালে ভর্তি করালাম। আমি আর বড় ভাই সারারাত করিডরে বসে কাটালাম। মশা, অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা সব ছিল। কিন্তু মায়ের মায়ার কাছে সেসব কষ্ট কিছুই নয়। মানুষ বলেছিল, হাসপাতালে বারবার গেলে আমাদেরও করোনা হতে পারে। আমরা পাত্তা দিইনি। আমাদের কাছে তখন মা-ই সবার আগে। কারণ যে মানুষটা সারাজীবন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন, তার পাশে থাকাটা কোনো দায়িত্ব নয় এটা ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রতিদান।

আরেকবার গ্রাম থেকে খবর এলো মা গুরুতর অসুস্থ, বরিশাল মেডিকেলে নেওয়া হয়েছে। অফিস থেকে ছুটে গাবতলী, তারপর লোকাল বাসে দীর্ঘ যাত্রা। ভাবীর ফোন দ্রুত আসো, অবস্থা ভালো না। সারাটা পথ কান্না করতে করতে গেছি। আশপাশের লোকের বিস্মিত চোখ দেখেছি, কিন্তু কান্না থামেনি। থামাইনি। কারণ সেই কান্নাই ছিল আমার মায়ের প্রতি আমার সত্যিকারের ভাষা।

পরে জেনেছি, ফোনের সময় মায়ের পালস প্রায় পাওয়া যাচ্ছিল না। চিকিৎসক আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে পিত্তথলির অপারেশন হয়েছিল। পরে এক রাতে অক্সিজেন কমে গিয়ে আইসিইউতে নিতে হলো। আইসিইউর সামনে সেই নির্ঘুম রাত ভয়, প্রার্থনা, মৃত্যুর গন্ধ আর জীবনের আকুতি সব মিশে এক অদ্ভুত অনুভব। সেখানে বসে বুঝেছিলাম, মায়ের জন্য সন্তানের অপেক্ষা কেবল অপেক্ষা নয়, তা এক ধরনের ইবাদত। প্রতিটি মুহূর্ত যেন একটি দোয়া ‘হে আল্লাহ, আমার মাকে ফিরিয়ে দাও।’

আমি যা লিখলাম, এর একটিও কল্পনা নয়। সবই জীবনের সত্য। বাড়িয়ে বলা নয়, বরং না-বলা গল্প আরও অনেক যা শুধু বুকের ভেতরে থাকে, কখনো কলমে আসে না। মা আসলে শুধু একজন মানুষ নন একটি আশ্রয়, একটি ছায়া, একটি অনন্ত দোয়া। তিনি চলে গেলে পৃথিবীতে আর কোনো জায়গা থাকে না যেখানে সন্তান নিঃশর্তভাবে আদর পায়।

পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুন। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সন্তানেরা যেন বুঝতে শেখে ভালোবাসা কখনো উচ্চারণে নয়, তা থাকে নীরব যত্নে, অদৃশ্য হাতে। আর সেই হাত যে হাত সারাজীবন দিয়েই গেছে, কখনো ফেরত চায়নি সেই হাত আঁকড়ে ধরতে পারাটাই হোক আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। মা দিবসে সব মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow