আর্জেন্টিনার কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার কিকি, আইডল যার নেইমার
২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে হাইতিতে। সেই ভূমিকম্পে প্রাণ হারান তিন লাখেরও বেশি মানুষ। একটি এতিমখানায় তখন মাত্র নয় মাস বয়সী এক শিশু অলৌকিকভাবে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যায়। ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল জন্ম নেওয়া সেই শিশুটির নাম ছিল স্টিফেন। এদিকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আর্জেন্টিনায় তার ভবিষ্যৎ দত্তক বাবা-মা দত্তক নেওয়ার সব কাগজপত্র সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু ভূমিকম্পের পর শিশুটি বেঁচে আছে কি না, সেটাই জানতেন না তারা। এক মাস পর স্টিফেন আর্জেন্টিনায় পৌঁছায়। এরপর থেকেই সবাই তাকে ‘কিকি’ নামে চেনে। ১৭ বছর বয়সী কিকি ভেলেজ সার্সফিল্ডের ষষ্ঠ বিভাগে দুর্দান্ত খেলছেন। টানা ছয় ম্যাচে গোল করেছেন। তার পারফরম্যান্সে নজর রেখেছেন রিজার্ভ দলের সফল কোচ মার্সেলো ইন্ডিও ব্রাভো। ধাপে ধাপে এগিয়ে ভেলেজের মূল দলে সুযোগ পাওয়া এবং হোসে আমালফিতানি স্টেডিয়ামে নীল-সাদা জার্সি গায়ে খেলা—এটাই তার বড় স্বপ্ন। সম্প্রতি কিকি আরও একটি সুখবর পান। গণিতের অনলাইন ক্লাসে থাকা অবস্থায় জানতে পারেন, আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ দলের সঙ্গে লিওনেল আন্দ্রেস মেসি ট্রেনিং কমপ্লেক
২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে হাইতিতে। সেই ভূমিকম্পে প্রাণ হারান তিন লাখেরও বেশি মানুষ। একটি এতিমখানায় তখন মাত্র নয় মাস বয়সী এক শিশু অলৌকিকভাবে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যায়। ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল জন্ম নেওয়া সেই শিশুটির নাম ছিল স্টিফেন।
এদিকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আর্জেন্টিনায় তার ভবিষ্যৎ দত্তক বাবা-মা দত্তক নেওয়ার সব কাগজপত্র সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু ভূমিকম্পের পর শিশুটি বেঁচে আছে কি না, সেটাই জানতেন না তারা। এক মাস পর স্টিফেন আর্জেন্টিনায় পৌঁছায়। এরপর থেকেই সবাই তাকে ‘কিকি’ নামে চেনে।
১৭ বছর বয়সী কিকি ভেলেজ সার্সফিল্ডের ষষ্ঠ বিভাগে দুর্দান্ত খেলছেন। টানা ছয় ম্যাচে গোল করেছেন। তার পারফরম্যান্সে নজর রেখেছেন রিজার্ভ দলের সফল কোচ মার্সেলো ইন্ডিও ব্রাভো। ধাপে ধাপে এগিয়ে ভেলেজের মূল দলে সুযোগ পাওয়া এবং হোসে আমালফিতানি স্টেডিয়ামে নীল-সাদা জার্সি গায়ে খেলা—এটাই তার বড় স্বপ্ন।
সম্প্রতি কিকি আরও একটি সুখবর পান। গণিতের অনলাইন ক্লাসে থাকা অবস্থায় জানতে পারেন, আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ দলের সঙ্গে লিওনেল আন্দ্রেস মেসি ট্রেনিং কমপ্লেক্সে অনুশীলনের জন্য ডাক পেয়েছেন।
কিকি রামোস সম্প্রতি আর্জেন্টাইন দৈনিক পত্রিকা দারিও ওলে-তে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানেই উঠে এসেছে তার বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা দলে তার সুযোগ পাওয়ার নানা কাহিনী। পাঠকদের উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎকারটি পুরো অনুবাদ করে দেওয়া হলো...
প্রশ্ন: সবাই আপনাকে ‘কিকি’ নামে কেন ডাকে?
কিকি: ছোটবেলায় আমি সব সময় ‘কিকি, কিকি, কিকি’ বলতাম। তখন থেকেই বাবা-মা আমাকে এই নামে ডাকতে শুরু করেন।
প্রশ্ন: সম্প্রতি আপনি আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ দলের সঙ্গে অনুশীলন করেছেন। অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?
কিকি: সত্যি বলতে জাতীয় দলের সবকিছুই অসাধারণ ছিল। অনুশীলন মাঠ, পরিবেশ, কোচিং স্টাফ—সবই দারুণ। শুরুতে একটু নার্ভাস ছিলাম, কিন্তু সবাই আমাকে খুব সহজে আপন করে নিয়েছে। সেখানে থাকতে পারাটাই ছিল আমার জন্য স্বপ্নপূরণ। আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিত্ব করা সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি।
প্রশ্ন: ডাক পাওয়ার খবর কীভাবে জানলেন?
কিকি: আমি তখন অনলাইনে গণিতের ক্লাস করছিলাম। হঠাৎ আমার ফিটনেস কোচ আমাকে ‘অভিনন্দন’ লিখে বার্তা পাঠান। প্রথমে কিছুই বুঝিনি। এরপর বন্ধুরাও অভিনন্দন জানাতে শুরু করে। পরে দেখি বার্তাটি আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) থেকে এসেছে। প্রথমে মনে হয়েছিল নামে ভুল হয়েছে। পরে ঠিকমতো পড়ে বুঝলাম সত্যিই আমাকে ডাকা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস ছেড়ে বাবা-মায়ের কাছে দৌড়ে যাই। আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরি। মুহূর্তটা ছিল অবিশ্বাস্য সুন্দর।
প্রশ্ন: আপনি এখনও স্কুলে পড়ছেন?
কিকি: হ্যাঁ। আমি এখন উচ্চমাধ্যমিকের শেষ বর্ষে পড়ছি। পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে হবে।
প্রশ্ন: আপনি আর্জেন্টিনার নাগরিক হলেও জন্ম হাইতিতে। আর্জেন্টিনায় আসার গল্পটা কেমন?
কিকি: আমার কিছুই মনে নেই, কারণ তখন আমার বয়স মাত্র নয় মাস ছিল। বাবা-মায়ের কাছ থেকে শুনেছি, ভূমিকম্পের আগেই তারা আমাকে দত্তক নেওয়ার সব প্রক্রিয়া শেষ করেছিলেন। কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে তারা আর্জেন্টিনায় ফিরে এসেছিলেন। সেই সময়ই ভূমিকম্প হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তারা জানতে পারেননি আমি বেঁচে আছি কি না। ভাগ্যক্রমে এতিমখানার অল্প কয়েকজন শিশুর মধ্যে আমিও ছিলাম, যারা আহত হয়নি। এক মাস পর আমি আর্জেন্টিনায় আসতে পারি।
প্রশ্ন: কখনও কি নিজের অতীত সম্পর্কে জানতে ইচ্ছা হয়েছে? নিজেকে কি পুরোপুরি আর্জেন্টাইন মনে হয়?
কিকি: সত্যি বলতে খুব একটা নয় (অতীত সম্পর্কে)। এখানে আমি এত সুখে আছি যে, অতীত নিয়ে খুব একটা ভাবিনি। তবে ভবিষ্যতে কিছুটা জানতে চাই। আর হ্যাঁ, আমি নিজেকে পুরোপুরি আর্জেন্টাইনই মনে করি।
প্রশ্ন: আপনার বাবা-মায়ের নাম কী? তারা আপনার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কিকি: আমার বাবা ফ্রান্সিসকো, মা অ্যাস্ট্রিড। তারা আমার কাছে সবকিছু। খেলাধুলার প্রতিটি ধাপে তারা আমার পাশে থেকেছেন। যখন মন খারাপ হতো বা অনুশীলনের সঙ্গী পেতাম না, তখনও তারা আমাকে সাহস দিয়েছেন। আমি সহজে নিজের অনুভূতির কথা বলি না, কিন্তু তারা বুঝে ফেলেন। আমি তাদের খুব ভালোবাসি।
প্রশ্ন: ভেলেজে কীভাবে এলেন?
কিকি: আমাদের এক প্রতিবেশী আমাকে ট্রায়ালের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত আমি নির্বাচিত হই। আমি সব সময় বলি, ভেলেজ আমার দ্বিতীয় বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই এখানে আছি। গত বছর পর্যন্ত ক্লাবের ভেতরের স্কুলেই পড়েছি। আমার আজীবনের অনেক বন্ধু এখান থেকেই পেয়েছি। এটা আমার দ্বিতীয় পরিবারের মতো।
প্রশ্ন: একজন ফুটবলার হিসেবে নিজেকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
কিকি: আমার সবচেয়ে বড় শক্তি গতি। এছাড়া একের বিপক্ষে এক পরিস্থিতিতে খেলতে ভালো লাগে। আর এখন ফিনিশিংয়েও অনেক উন্নতি করেছি।
প্রশ্ন: আপনার আদর্শ কে?
কিকি: সবসময় নেইমার।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ দেখছেন?
কিকি: হ্যাঁ। সব ম্যাচ দেখি না, তবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো দেখি। অবশ্যই আর্জেন্টিনার ম্যাচ কখনও মিস করি না।
প্রশ্ন: মেসিকে খেলতে দেখে কেমন লাগে?
কিকি: অসাধারণ লাগে। তাকে খেলতে দেখতে পারা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার। তাকে খেলতে দেখা আমার জন্য বড় আনন্দ।
প্রশ্ন: আপনার জন্মের আগেই মেসির অভিষেক হয়েছিল। আপনার প্রজন্মের কাছে তিনি কী?
কিকি: প্রথমত, তার বিনয় আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। আমি সেটাই অনুসরণ করার চেষ্টা করি। আর মাঠে তার খেলা তো অবিশ্বাস্য। তিনি যে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে পারাটাও আমাকে গর্বিত করে।
প্রশ্ন: আপনার সতীর্থ সিমোন এসকোবার সম্প্রতি মেসির সঙ্গে অনুশীলন করেছেন। আপনিও কি সেই স্বপ্ন দেখেন?
কিকি: অবশ্যই। হয়তো এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছাইনি, কিন্তু এটা আমার বড় স্বপ্ন। আমি সেদিকেই এগোতে চাই।
প্রশ্ন: আপনার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?
কিকি: প্রথম স্বপ্ন ভেলেজের মূল দলে অভিষেক করা। এরপর ইউরোপে খেলা এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা।
প্রশ্ন: সম্প্রতি আর্জেন্টিনার জার্সি পরা প্রথম হাইতিয়ান হিসেবে আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
কিকি: ভালোই লাগে। ইনস্টাগ্রামে নিজের ছবি দেখে আনন্দ হয়। মন্তব্যও পড়ি। নেতিবাচক মন্তব্যে গুরুত্ব দিই না। ছোটবেলা থেকেই গায়ের রং বা আমার মাকে নিয়ে অনেকেই কটূক্তি করেছে, কিন্তু সেগুলো আমি সবসময় হাসিমুখেই নিয়েছি। বরং ইতিবাচক মন্তব্য, মানুষের সমর্থন আর ভালোবাসা পড়তে আমার বেশি ভালো লাগে।
আরআর/এমএমআর
What's Your Reaction?