আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য চিরতরে বন্ধ আমেরিকার দরজা?
‘আমাদের সীমান্ত এখন ইতিহাসের সবচেয়ে সুরক্ষিত,’ গত ৫ মে অ্যারিজোনার ফিনিক্সে বর্ডার সিকিউরিটি এক্সপোতে দাঁড়িয়ে যখন দম্ভোক্তিটি করেন টম হোম্যান, তখন করতালিতে ফেটে পড়ে পুরো হলরুম। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সীমান্ত তদারকিতে নিয়োজিত এই কর্মকর্তার খুশির কারণ স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে অভিবাসীদের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এক দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্ত বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি সীমান্ত দেওয়াল নির্মাণ, সীমান্তরক্ষী বাড়ানো, অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারসহ নানা কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম নীতিতে। বর্তমানে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ কতটা সীমিত করা যায়, সেটিই পরীক্ষা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ট্রাম্পের ‘অভেদ্য’ দেওয়াল যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয়ব্যবস্থার ভিত্তি ১৯৮০ সালের ‘রিফিউজি অ্যাক্ট’। এটি মূলত ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন ও ১৯৬৭ সালের প্রোটোকলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সে সময় আইনপ্রণেতাদের প্
‘আমাদের সীমান্ত এখন ইতিহাসের সবচেয়ে সুরক্ষিত,’ গত ৫ মে অ্যারিজোনার ফিনিক্সে বর্ডার সিকিউরিটি এক্সপোতে দাঁড়িয়ে যখন দম্ভোক্তিটি করেন টম হোম্যান, তখন করতালিতে ফেটে পড়ে পুরো হলরুম। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সীমান্ত তদারকিতে নিয়োজিত এই কর্মকর্তার খুশির কারণ স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে অভিবাসীদের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এক দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্ত বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি সীমান্ত দেওয়াল নির্মাণ, সীমান্তরক্ষী বাড়ানো, অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারসহ নানা কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম নীতিতে।
বর্তমানে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ কতটা সীমিত করা যায়, সেটিই পরীক্ষা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ট্রাম্পের ‘অভেদ্য’ দেওয়াল
যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয়ব্যবস্থার ভিত্তি ১৯৮০ সালের ‘রিফিউজি অ্যাক্ট’। এটি মূলত ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন ও ১৯৬৭ সালের প্রোটোকলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সে সময় আইনপ্রণেতাদের প্রধান মনোযোগ ছিল কমিউনিস্ট শাসন থেকে পালিয়ে আসা পূর্ব ইউরোপীয় ও ভিয়েতনামি শরণার্থীদের পুনর্বাসন।
আরও পড়ুন>>
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে ‘না’ বলতে হবে যে ২ প্রশ্নে
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ভিসা বন্ধ, দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশি প্রবাসীরা
মোটা অংকের জামানত দিলেই যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিশ্চিত?
তখন সীমান্তে এসে আশ্রয় চাওয়ার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে অভিবাসন নীতির সাবেক কর্মকর্তা ডরিস মেইসনার বলেন, ‘তখন ধারণা ছিল, যাদের সুরক্ষা দরকার, তারা দূর দেশ থেকে আসবে।’
কিন্তু আইন পাস হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কিউবা থেকে এক লাখের বেশি মানুষ ফ্লোরিডার দিকে রওয়ানা হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর ধীরে ধীরে সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
১৯৯০-এর দশকে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসন আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও কাঠামোবদ্ধ করে এবং বাড়তি বিচারক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়। কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও পরে আবার চাপ বাড়তে থাকে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে একপর্যায়ে এক মাসেই দক্ষিণ সীমান্তে প্রায় তিন লাখ অভিবাসীর প্রবেশচেষ্টার ঘটনা রেকর্ড করা হয়। কেউ রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে পালিয়ে এলেও অনেকে সহিংসতা ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আশ্রয়ের আবেদন তখন অনেকের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ীভাবে কাজ ও থাকার একটি পথ হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়াতেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করা হয়। সাবেক অভিবাসন বিচারক অ্যান্ড্রু আর্থারের মতে, আশ্রয়সংক্রান্ত কড়াকড়িই এখন অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করার প্রধান হাতিয়ার।
আদালতে ঝুলছে ভাগ্য
বর্তমানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বিচারাধীন। এর একটি ‘মুলিন বনাম আল ওত্রো লাদো’ মামলা। এই মামলায় সিদ্ধান্ত হবে, সীমান্তে এসে পৌঁছানো অভিবাসীদের ফিরিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয় আইনের লঙ্ঘন কি না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা রাইসেস বনাম মুলিন। ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প সীমান্ত পরিস্থিতিকে ‘আক্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশ স্থগিত করার ক্ষমতা দাবি করেছিলেন। তবে ওয়াশিংটনের একটি ফেডারেল আপিল আদালত গত এপ্রিলে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। আদালত বলে, কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে এত বিস্তৃত ক্ষমতা দেয়নি।
তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গড়াতে পারে। অতীতে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আদালত অনেক ক্ষেত্রেই প্রেসিডেন্টের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
আশ্রয় অনুমোদনে ধস
ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে আশ্রয় অনুমোদনের হারও নাটকীয়ভাবে কমেছে। গত মার্চ মাসে মাত্র পাঁচ শতাংশ আবেদন অনুমোদিত হয়েছে, যেখানে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার সময় এই হার ছিল ৩১ শতাংশ।
আদালত ট্রাম্পের কিছু পদক্ষেপ আটকে দিলেও সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয়ব্যবস্থা আরও কঠোর হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও এখন সীমান্তনিরাপত্তা নিয়ে আগের তুলনায় কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে।
এ ছাড়া গত বছর পাস হওয়া ‘লেকেন রাইলি অ্যাক্ট’ রাজ্যগুলোকে ফেডারেল সরকারের অভিবাসননীতির বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে নতুন বাজেট আইনের একটি ধারায় অভিবাসন বিচারকের সংখ্যা ৮০০-তে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় পুরোপুরি বন্ধ না হলেও এটি ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে, যেখানে আশ্রয় পাওয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠবে।
কেএএ/
What's Your Reaction?