ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল : হাসপাতালের অন্ধকার করিডরে যার কথা মনে পড়ে

যুদ্ধের ইতিহাসে জেনারেলদের নাম আমরা জানি। সম্রাটদের নামও জানি। কিন্তু আহত সৈনিকের কপালে হাত রাখা মানুষটির নাম ইতিহাসে কমই লেখা হয়। ১৮৫৪ সাল, ক্রিমিয়ার যুদ্ধ তখন ইউরোপকে রক্তাক্ত করছে। ব্রিটিশ সেনাদের হাসপাতাল ছিল বিভীষিকাময়। আহত সৈনিকের চেয়ে সংক্রমণে মৃত মানুষের সংখ্যা বেশি। খাবার দূষিত। পানি নোংরা। চিকিৎসার বেহাল দশা। সেই অন্ধকার সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ভাঙাচোরা অস্থায়ী ব্রিটিশ সামরিক মেডিকেল ক্যাম্পে লণ্ঠন হাতে ঘুরে ঘুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা আহত সৈনিকদের সেবা দিয়েছিলেন একজন নারী। এমন দৃষ্টান্ত যাকে ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ হিসেবে ইতিহাসে অমর করেছেন, সেই ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের আজ জন্মদিন। ভার্জিনিয়া উলফ তার ‘আ রুম অফ ওয়ানস ওন’ বইয়ের এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘Women have served all these centuries as looking-glasses.’ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল সেই ‘আয়না’ ভেঙেছিলেন। তিনি নারীর ভূমিকা সম্পর্কে সমাজের ধারণাকে পাল্টে দিয়েছিলেন। হাসপাতালের রাত মানুষকে খুব দ্রুত বড় করে দেয়। কয়েক বছর আগে ঢাকা মেডিকেলে একবার পুরো রাত কাটাতে হয়েছিল। এক বন্ধুর বাবা স্ট্রোক করেছিলেন। রাত তিনটার দিকে হাসপাতালের ওয়ার্ডে

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল : হাসপাতালের অন্ধকার করিডরে যার কথা মনে পড়ে

যুদ্ধের ইতিহাসে জেনারেলদের নাম আমরা জানি। সম্রাটদের নামও জানি। কিন্তু আহত সৈনিকের কপালে হাত রাখা মানুষটির নাম ইতিহাসে কমই লেখা হয়।

১৮৫৪ সাল, ক্রিমিয়ার যুদ্ধ তখন ইউরোপকে রক্তাক্ত করছে। ব্রিটিশ সেনাদের হাসপাতাল ছিল বিভীষিকাময়। আহত সৈনিকের চেয়ে সংক্রমণে মৃত মানুষের সংখ্যা বেশি। খাবার দূষিত। পানি নোংরা। চিকিৎসার বেহাল দশা।

সেই অন্ধকার সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ভাঙাচোরা অস্থায়ী ব্রিটিশ সামরিক মেডিকেল ক্যাম্পে লণ্ঠন হাতে ঘুরে ঘুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা আহত সৈনিকদের সেবা দিয়েছিলেন একজন নারী।

এমন দৃষ্টান্ত যাকে ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ হিসেবে ইতিহাসে অমর করেছেন, সেই ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের আজ জন্মদিন।

ভার্জিনিয়া উলফ তার ‘আ রুম অফ ওয়ানস ওন’ বইয়ের এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘Women have served all these centuries as looking-glasses.’ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল সেই ‘আয়না’ ভেঙেছিলেন। তিনি নারীর ভূমিকা সম্পর্কে সমাজের ধারণাকে পাল্টে দিয়েছিলেন।

হাসপাতালের রাত মানুষকে খুব দ্রুত বড় করে দেয়। কয়েক বছর আগে ঢাকা মেডিকেলে একবার পুরো রাত কাটাতে হয়েছিল। এক বন্ধুর বাবা স্ট্রোক করেছিলেন। রাত তিনটার দিকে হাসপাতালের ওয়ার্ডে দেখেছিলাম, এক তরুণী নার্স ধীরে ধীরে একজন বৃদ্ধ রোগীর বালিশ ঠিক করে দিচ্ছেন। বৃদ্ধ মানুষটি বারবার পানি চাইছিলেন। নার্সটি বিরক্ত হননি। শুধু বলেছিলেন—‘চাচা, একটু ধীরে খান।’

সেই মুহূর্তে অদ্ভুতভাবে আমার মনে পড়েছিল ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের কথা। কারণ ইতিহাসের কিছু মানুষ আছেন, যাদের আমরা শুধু বইয়ে পড়ি না— আমরা তাদের ছায়া দেখতে পাই অন্য মানুষের কাজে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ঠিক তেমন একজন।

১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে তিনি জন্মেছিলেন। যদিও তার পরিবার লন্ডনের অধিবাসী। মূলত ফ্লোরেন্সের জন্মের সময় তার বাবা-মা ইতালির ওই শহরে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ফলে সে শহরের নাম অনুসারেই রাখা হয়— ফ্লোরেন্স।

ইউরোপ তখন সাম্রাজ্যের অহংকারে ভুগছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পৃথিবীর বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। শিল্পবিপ্লব হয়েছে। বিজ্ঞান এগোচ্ছে। লন্ডনের অভিজাত সমাজে নাচ, রাজনীতি, সাহিত্যচর্চা চলছে। কিন্তু সেই সভ্যতার ভেতরেও হাসপাতালগুলো ছিল ভয়াবহ।

আজকের মানুষ হাসপাতালকে চিকিৎসার জায়গা ভাবে। তখন অনেক হাসপাতাল ছিল মৃত্যুর অপেক্ষাঘর। দুর্গন্ধ, রক্ত, অপরিচ্ছন্নতা, সংক্রমণ— সব মিলিয়ে সেগুলো প্রায় নরকের মতো পরিস্থিতি। এই সময়েই সম্ভ্রান্ত পরিবারের সেই তরুণী ফ্লোরেন্স সিদ্ধান্ত নিলেন— তিনি নার্স হবেন।

এমন বাস্তবতায় ফ্লোরেন্স ১৮৫১ সালে জার্মানিতে নার্সিং প্রশিক্ষণ শুরু করেন এবং ১৮৫৩ সালে লন্ডনে একটি প্রতিষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ শুরু করার মাধ্যমে পেশাগতভাবে নার্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হন।

রোগীদের সেবা-শুশ্রুষা করা আজ সাধারণ মনে হয়। কিন্তু তৎকালীন সময়ে এগুলো ছিল একপ্রকার বিপ্লব। কারণ ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে ‘ভদ্রঘরের মেয়ে’ নার্স হয় না। নার্সিংকে তখন ‘নিচু শ্রেণির’ কাজ মনে করা হতো।

ফ্লোরেন্সের পরিবার চেয়েছিল সে যেন অভিজাত জীবনে অভ্যস্ত থাকে। কিন্তু তার ভেতরে অন্যরকম এক আকাঙ্ক্ষা ছিল। ফ্লোরেন্স একবার লিখেছিলেন— ‘I crave for some regular occupation, for something worth doing’ অর্থাৎ ‘আমি এমন একটি স্থায়ী পেশায় নিয়োজিত হতে চাই, যা করার মধ্যে সার্থকতা আছে।’

এই লাইনটি পড়লে মনে হয়, তিনি যেন বিলাসিতার ভেতরে দাঁড়িয়ে শূন্যতা অনুভব করছিলেন। কারণ কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই অন্যের তরে জীবন বিলিয়ে দিতে চান। ফ্লোরেন্স ছিলেন তেমনই।

এ প্রসঙ্গেই ব্রিটিশ ইতিহাসবেত্তা ও জীবনী লেখক সেসিল উডহাম স্মিথ ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল’কে ‘religious passion and statistical logic’— হিসেবে বর্ণনা করেন।

নিজের নার্সিং সেবার বিষয়ে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল বলেছিলেন— ‘The very first requirement in a hospital is that it should do the sick no harm’, অর্থ্যাৎ ‘হাসপাতালের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো— এটি যেন অসুস্থ মানুষের (রোগীর) কোনো ক্ষতি না করে।’ আজও এই লাইন পৃথিবীর বহু হাসপাতালের দেয়ালে টাঙানো।

১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট লন্ডনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার ৩ বছর আগে ১৯০৭ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অব মেরিট’ উপাধিতে ভূষিত হন।

পৃথিবী সাধারণত শক্তিশালীদের গল্প মনে রাখে। কিন্তু অনন্য দৃষ্টান্তের কারণেই ফ্লোরেন্সের গল্প এত গভীরভাবে বহু বছর পরও বেঁচে আছে।

সেজন্যই হয়তো আমেরিকান কবি হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো তার ‘সান্তা ফিলোমেনা’ কবিতায় লিখেছিলেন— ‘A Lady with a Lamp shall stand/In the great history of the land.’ এই লাইন শুধু প্রশংসা না। এটি মানবসভ্যতার এক নৈতিক স্বীকৃতি।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল শুধু আধুনিক নার্সিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা নন। তিনি যেন পৃথিবীর সব হাসপাতালের রাতের সঙ্গে মিশে থাকা এক নীরব আলো।

১২ মে তার জন্মদিন। কিন্তু তাকে মনে করার জন্য আলাদা দিন লাগে না। কোনো হাসপাতালের অন্ধকার করিডরে দাঁড়ালেই তাকে মনে পড়ে। কারণ সভ্যতা যত আধুনিক হয়, মানুষ তত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়; কিন্তু অসুস্থতার মুহূর্তে মানুষ শেষ পর্যন্ত আরেকজন মানুষের স্পর্শই খোঁজে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল সেই স্পর্শের ইতিহাস।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow