ঢাকার নবাবগঞ্জে শিকারীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক ও বিএডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক সাহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ভূমি হস্তান্তর করের ১ শতাংশের বরাদ্দের ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন পরিষদের সদস্যসহ এলাকাবাসী।
অভিযোগকারীরা বলছেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ভূমি হস্তান্তর করের ১ শতাংশের বরাদ্দের ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকার প্রকল্পটিতে ২ লাখ টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। সরকারি অর্থ অপব্যয়সহ তছরুপের অভিযোগ করা হয়েছে।
জানা যায়, এ বছর ১ শতাংশের ২০ লাখ টাকা এ ইউনিয়ন পরিষদে উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকি টাকার কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা জানা যায়নি। মেসার্স রহমান এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এটি বাস্তবায়ন করে। গত ৪ জুন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ায় বরাদ্বের টাকা উত্তোলন করা হয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের ভূমি হস্তান্তর করের ১ শতাংশের ২০ লাখ টাকা উন্নয়ন বরাদ্দ পায় শিকারীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ। এ উন্নয়ন বরাদ্ধের ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে পরিষদের বারান্দায় হাফ ওয়াল হাফ গ্রিল দ্বারা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেন প্রকৌশলী মো. সাহারুল ইসলাম। দোহার উপজেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রহমান এন্টারপ্রাইজ গত ৪ জুন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছেন। যার বরাদ্দ অর্থ পরিশোধও করা হয়েছে।
গরিবপুর গ্রামের বাসিন্দা হালিম মোল্লা অভিযোগ করেন, এ প্রকল্পে ২ লাখ টাকার বেশি খরচ হতে পারে না। তাছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় গ্রিলের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এ টাকায় ইউনিয়নের ঝুকিপূর্ণ সড়কগুলো মেরামত করা যেত। তাতে জনগণের উপকার হতো।
সূজাপুর গ্রামের বাসিন্দা মেহেদী হাসান রাজু স্থানীয় সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাকের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, ইউপি প্রশাসক সাহারুল ইসলাম ও ইউপি সদস্য আলাউদ্দিন মেম্বার মিলে এ দুর্নীতি করেছেন। তাছাড়াও সুজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে মাদ্রাসা পর্যন্ত একটি সড়কের মেরামত কাজ ও নারায়নপুর মসজিদ হতে টিপুর বাড়ি পর্ষন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে বলে মনে হয়েছে। তাই এসব প্রকল্পের সভাপতি ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার অনুরোধ জানান তিনি।
শিকারীপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রইস উদ্দিন খোকন ও সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন অভিযোগ করে বলেন, কথিত ঠিকাদার সৃষ্টি করে ইউপি প্রশাসক নিজেই কাজটি রাস্তবায়ন করেছেন। এতে ইউপি সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের গ্রহন করা প্রকল্পে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ইট-বালুসহ উন্নয়ন সামগ্রী প্রশাসক নিজেই সরবরাহ করেন।’ ৫ আগষ্টের পূর্বে স্বৈরশাসকদের যে ভূমিকা ছিল বর্তমান প্রশাসক তার চেয়ে বেশি দুর্নীতি করছেন। তাই আমরা এই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসককে শিকারীপাড়া ইউনিয়নে দেখতে চাই না। এ বিষয়ে তিনি ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক ও ইউএনও’র হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল খালেক মেম্বার বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের কাজের কোনো তথ্য ইউপি সদস্যরা জানতে পারে না। এ কাজের বিষয়ে পরে জেনেছি। আমারা সমাজের একটি গোরস্তানে এর চেয়ে দ্বিগুণ কাজ করিয়ে মাত্র এক লাখ ৩২ হাজার টাকা ব্যয় করেছি। এ কাজে এতো টাকা ব্যয় হতে পারে না। বিশেষ কারও পকেট ভারী করার জন্য দেশের অর্থ ব্যয় হতে পারে না। আমরা এই দুর্নীতিবাজদের এ ইউনিয়নে দেখতে চাই না।
প্রকল্পের সভাপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত শিকারীপাড়া ইউপির ৮নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. আলাউদ্দিন বলেন, গত কুরবানীর ঈদের ১০/১১ দিন আগে প্রশাসক আমাকে জানালেন, পরিষদে একটি কাজ হয়েছে। আপনি এটি দেখাশোনা করবেন। এখানে একটি নম্বর প্লেট থাকবে। ঈদের ৪দিন আগে উপজেলা এলজিইডিতে ফাইল হাতে পেয়ে জানতে পারি, প্রকল্প ব্যয় ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এ প্রকল্প ব্যয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে বলে আমারও মনে হয়েছে। আমি কোনো দুর্নীতির পক্ষে নেই।
শিকারীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) বাবুল হোসেন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকার উন্নয়ন প্রকল্পটির একরাতের মধ্যে ফাইল প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্পের সাইন বোর্ড থাকার কথা ছিল। আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারকে তড়িঘড়ি করে চেক প্রদান করা হয়েছে। এমতাবস্থায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতারা ও সচেতন এলাকাবাসী প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিষয়টি নিয়ে ইউপি প্রশাসক সাহারুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান তিনি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রহমান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘পরিষদের বারান্দার হাফ ওয়াল হাফ গ্রিলের হাফ ছাড়াও ছাদ মেরামতসহ অন্যান্য কাজ করা হয়েছে।’
প্রকল্পে অন্য কোনো কাজ উল্লেখ আছে কি-না জানতে চাইলে, পরিষদে গিয়ে ওয়ার্ক অর্ডার দেখতে বলেন তিনি।
শিকারীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও বিএডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সাহারুল ইসলাম দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, পরিষদের বারান্দায় হাফ ওয়াল ও হাফ গ্রিল প্রকল্প ছাড়াও ওই অর্থে পরিষদের ছাদ মেরামত এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা কক্ষ সংস্কার করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলরুবা ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।