ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে লালবাগ কেল্লায় একদিন

আপনি যদি শহরের ব্যস্ততার মাঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে চান, ইতিহাসের আবেশে নিজেকে ছুঁয়ে দেখতে চান কিংবা প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে নিরিবিলি সময় কাটাতে চান—তাহলে লালবাগ কেল্লা হতে পারে অনন্য ও মনোমুগ্ধকর উপযুক্ত জায়গা। রাজধানীর দক্ষিণাংশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বংশাল থানার লালবাগ এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা। একসময় যার নাম ছিল ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ’। ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এ স্থাপনা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে শুধু ইতিহাসের নীরব সাক্ষীই নয় বরং ঐতিহ্যের মূল্যবান ধারক। দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল লালবাগ কেল্লাটি ঘুরে দেখার। সেই ইচ্ছা পূরণ করতে ১৫ এপ্রিল সকালে যাত্রা শুরু করি। ঢাকার কুড়িল থেকে সকাল সকাল বের হয়ে প্রথমে যাই সদরঘাট এলাকায়। সেখান থেকে ভ্রমণসঙ্গী হন আরমান হোসাইন। পুরান ঢাকার সকালের ব্যস্ততা, নদীপাড়ের কর্মচাঞ্চল্য আর মানুষের চলাচল—সব মিলিয়ে ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা দেয় এ এলাকা। কিছু সময় সেখানে কাটিয়ে দুপুরের দিকে যাত্রা শুরু হয় মূল গন্তব্য লালবাগ কেল্লার উদ্দেশ্যে। তপ্ত রোদের মধ্যেই কেল্লার সামনে পৌঁছে টিকিট সংগ্রহ করে ভেতরে প্রবেশ করি। দুপুরের প্রখর রোদ থাকা সত্ত্বেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি চো

ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে লালবাগ কেল্লায় একদিন

আপনি যদি শহরের ব্যস্ততার মাঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে চান, ইতিহাসের আবেশে নিজেকে ছুঁয়ে দেখতে চান কিংবা প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে নিরিবিলি সময় কাটাতে চান—তাহলে লালবাগ কেল্লা হতে পারে অনন্য ও মনোমুগ্ধকর উপযুক্ত জায়গা। রাজধানীর দক্ষিণাংশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বংশাল থানার লালবাগ এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা। একসময় যার নাম ছিল ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ’। ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এ স্থাপনা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে শুধু ইতিহাসের নীরব সাক্ষীই নয় বরং ঐতিহ্যের মূল্যবান ধারক।

দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল লালবাগ কেল্লাটি ঘুরে দেখার। সেই ইচ্ছা পূরণ করতে ১৫ এপ্রিল সকালে যাত্রা শুরু করি। ঢাকার কুড়িল থেকে সকাল সকাল বের হয়ে প্রথমে যাই সদরঘাট এলাকায়। সেখান থেকে ভ্রমণসঙ্গী হন আরমান হোসাইন। পুরান ঢাকার সকালের ব্যস্ততা, নদীপাড়ের কর্মচাঞ্চল্য আর মানুষের চলাচল—সব মিলিয়ে ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা দেয় এ এলাকা। কিছু সময় সেখানে কাটিয়ে দুপুরের দিকে যাত্রা শুরু হয় মূল গন্তব্য লালবাগ কেল্লার উদ্দেশ্যে। তপ্ত রোদের মধ্যেই কেল্লার সামনে পৌঁছে টিকিট সংগ্রহ করে ভেতরে প্রবেশ করি। দুপুরের প্রখর রোদ থাকা সত্ত্বেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল। পরিবার, বন্ধুবান্ধব কিংবা প্রিয়জনদের নিয়ে অনেকেই এসেছেন ঘুরতে। কেউ ইতিহাস জানতে, কেউবা শুধু একটু অবসর কাটাতে।

কেল্লার ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সবুজ ঘাসে ঘেরা বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, প্রাচীন স্থাপনার সৌন্দর্য আর নীরবতার মাঝে একধরনের ঐতিহাসিক আবহ। তবে দুপুরের সময়টায় রোদের তীব্রতা কিছুটা ভোগান্তি তৈরি করলেও দর্শনার্থীদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। অনেকেই রোদ উপেক্ষা করে ছবি তুলতে ব্যস্ত, কেউ আবার ছায়াময় জায়গায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।

lalbagh

বিকেলের দিকে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কেল্লার ভেতরের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শিশুদের হাসি, তরুণদের আড্ডা আর ক্যামেরার ক্লিক—সব মিলিয়ে জমে ওঠে উৎসবমুখর পরিবেশ। ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। যার আয়তন ১৯ একর। লালবাগ কেল্লার যে ছবিটি বেশি ব্যবহৃত হয় তা পরীবিবির সমাধি। এটি চতুষ্কোণ আকৃতির। বিশাল আকৃতির তিনটি দরজা আছে। এর ভেতর একটি দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত।

পরীবিবির সমাধিকে অনেকে আবার পরীবিবির মাজার বলেও ডাকেন। এর ভেতরে আছে ৯টি কক্ষ। একটি গম্বুজও আছে, যা আগে সোনার ছিল, বর্তমানে তা তামা দিয়ে মোড়ানো। এ ছাড়া দুর্গটির ভেতরে একটি বিশাল পুকুর আছে। তবে বর্তমানে সেখানে পানি নেই। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকে মুখরিত হয়ে ওঠে লালবাগ কেল্লা। লালবাগ কেল্লায় ঢুকতেই চোখে পড়ে সরু রাস্তার দুপাশে নানারকম ঝাউগাছ আর পাতাবাহারের সারি। গোলাপ, গাদা, রঙ্গনসহ আছে আরও বাহারি ফুলের গাছ। সূর্য যখন হেলে পড়ে; তখন লালবাগের আসল সৌন্দর্য ধরা পড়ে।

লালবাগ কেল্লায় শায়েস্তা খাঁর বাসভবন ও দরবার হল বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে উন্মুক্ত করা হয়েছে। দরবার হল থেকেই তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। জাদুঘরে অনেক কিছুই আছে দেখার মতো। মোগল আমলের পাণ্ডুলিপি, মৃৎশিল্প, কার্পেট, হস্তলিপি ও রাজকীয় ফরমানসহ আছে মোঘল আমলের বিভিন্ন সময়ের হাতে আঁকা ছবি। শায়েস্তা খাঁর ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্রও আছে। এ ছাড়া তৎকালীন বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, প্রচলিত মুদ্রাও জাদুঘরে আছে। সব মিলিয়ে যা আপনাকে মুগ্ধ করবে।

lalbagh

তবে কেল্লার ভেতরে থাকা পুকুরে পানি থাকলে এর সৌন্দর্য আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেত। একইসঙ্গে দর্শনার্থীরাও সেখানে আরও আনন্দঘন ও উপভোগ্য সময় কাটাতে পারতেন। তাই পুকুরটি দ্রুত সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পহেলা বৈশাখের দিনেই ১০ হাজার দর্শনার্থী লালবাগ কেল্লায় ঘুরতে এসেছিলেন। এ ছাড়া অন্য বিশেষ দিনেও দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। তবে স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনই ৩-৪ হাজার মানুষ ঘুরতে আসেন এখানে।

ইতিহাস থেকে জানা গেছে, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় ছেলে যুবরাজ আজম শাহ বাংলার সুবেদার হয়ে ১৬৭৮ সালে ঢাকায় আসেন। তিনি কিল্লা আওরাঙ্গবাদ নামে একটি প্রাসাদ দুর্গ নির্মাণের কাজ হাতে নেন। তবে তিনি এ দুর্গ নির্মাণের কাজ শেষ করতে পারেননি। কারণ মারাঠাদের মোকাবিলার জন্য সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে দিল্লি ডেকে পাঠান। ফলে তিনি দুর্গটির নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ঢাকা ছাড়েন। পরে ১৬৮০ সালে শায়েস্তা খান দ্বিতীয়বার বাংলার সুবেদার হয়ে ঢাকায় আসেন। তখন কেল্লার কাজটি আবারও শুরু করা হয়। তবে তিনি এর নাম পরিবর্তন করে লালবাগ কেল্লা রাখেন। কেল্লার কাজ শেষ না করতেই সুবেদার শায়েস্তা খানের প্রিয় কন্যা পরিবিবি মারা যান। তাকে সেখানেই সমাধিস্থ করা হয়। যে কারণে এ কাজ তিনিও আর শেষ করতে পারেননি।

কখন যাবেন

এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ। সোমবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৬টা। আর সপ্তাহের বাকি দিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। অন্যদিকে অক্টোবর থেকে মার্চ অর্থাৎ শীতকালে রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ। সোমবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা। শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। সপ্তাহের বাকি দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সরকারি বিশেষ ছুটির দিনগুলোয়ও লালবাগ কেল্লা বন্ধ থাকে।

lalbagh

যেভাবে যাবেন

ঢাকার যে কোনো স্থান থেকে লালবাগ কেল্লায় যেতে পারবেন। গুলিস্তান থেকে রিকশা অথবা সিএনজিতে চড়ে সরাসরি লালবাগ কেল্লায় যেতে পারবেন। এ ছাড়া ঢাকার নিউমার্কেট, শাহবাগ কিংবা আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে লালবাগ কেল্লায় যেতে পারবেন। যদি লাইন বাসে যেতে চান, তাহলে নামতে হবে আজিমপুর এতিমখানা বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে রিকশায় মাত্র ২০-৩০ টাকায় পৌঁছে যাবেন। নিউমার্কেট থেকে রিকশায় যেতে চাইলে ৪০-৫০ টাকা ভাড়া গুনতে হবে।

প্রবেশ করবেন যেভাবে

লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের জন্য আপনাকে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রথমে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। টিকিট কাউন্টার পেয়ে যাবেন প্রধান ফটকের সামনেই। টিকিটের মূল্য মাত্র ৩০ টাকা, তবে বিদেশি নাগরিকদের জন্য টিকিটের মূল্য একটু বেশি।

কী কী খাবেন

লালবাগ কেল্লা ভ্রমণ শেষে চাইলে পুরান ঢাকার খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন। লালবাগ কেল্লার প্রধান ফটকের আশপাশে অনেকগুলো রেস্তোরাঁ আছে। এ ছাড়া একটু হাঁটলেই পেয়ে যাবেন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহি বিরিয়ানি, হাজি বিরিয়ানি এবং নান্না বিরিয়ানি।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow