ইন্টারনেট ফিরতেই শুরু হয় ফোন ট্র্যাকিং, আতঙ্কে সিম বদলান সমন্বয়করা

২০২৪ সালের ২৪ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। পাঁচ দিন পর দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু হলেও একই সময় শুরু হয় ব্যাপক গ্রেফতার, চিরুনি অভিযান ও নজরদারি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেট ফিরতেই আন্দোলনের সমন্বয়কদের ফোনে গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে কল আসতে শুরু করে। এ ঘটনার পর থেকে গ্রেফতার এড়াতে অনেকে সিম বদলান, আশ্রয় পরিবর্তন করেন এবং আত্মগোপনে থেকেই আন্দোলনের সমন্বয় চালিয়ে যান। ২৪ জুলাই টানা পঞ্চম দিনের মতো সারাদেশে কারফিউ বহাল ছিল। তবে ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় সীমিত সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। সরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক ও কিছু শিল্পকারখানা সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হয়। রাজধানী থেকে দূরপাল্লার বাস এবং সদরঘাট থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু হলেও মেট্রোরেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধই ছিল। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশের যৌথ টহল অব্যাহত ছিল। সেদিনও সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযান চলতে থাকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, একদিনেই প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ৬৪১ জন এবং চট্টগ্রামে শতাধিক ব্যক্তি ছিলেন। ১৭ থেকে ২৪ জুলাই

ইন্টারনেট ফিরতেই শুরু হয় ফোন ট্র্যাকিং, আতঙ্কে সিম বদলান সমন্বয়করা

২০২৪ সালের ২৪ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। পাঁচ দিন পর দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু হলেও একই সময় শুরু হয় ব্যাপক গ্রেফতার, চিরুনি অভিযান ও নজরদারি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেট ফিরতেই আন্দোলনের সমন্বয়কদের ফোনে গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে কল আসতে শুরু করে। এ ঘটনার পর থেকে গ্রেফতার এড়াতে অনেকে সিম বদলান, আশ্রয় পরিবর্তন করেন এবং আত্মগোপনে থেকেই আন্দোলনের সমন্বয় চালিয়ে যান।

২৪ জুলাই টানা পঞ্চম দিনের মতো সারাদেশে কারফিউ বহাল ছিল। তবে ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় সীমিত সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। সরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক ও কিছু শিল্পকারখানা সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হয়। রাজধানী থেকে দূরপাল্লার বাস এবং সদরঘাট থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু হলেও মেট্রোরেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধই ছিল। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশের যৌথ টহল অব্যাহত ছিল।

সেদিনও সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযান চলতে থাকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, একদিনেই প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ৬৪১ জন এবং চট্টগ্রামে শতাধিক ব্যক্তি ছিলেন। ১৭ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত আট দিনে গ্রেফতারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজারে পৌঁছায়। তৎকালীন ডিএমপির ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে।

একই দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যুর খবর আসে। বিভিন্ন হাসপাতাল, স্বজন ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলন ও সংঘাত ঘিরে নিহতের সংখ্যা ২০১ জনে পৌঁছায়। নিখোঁজ থাকার পাঁচ দিন পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদার ফিরে এসে দাবি করেন, তাদের চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যাওয়া হয়েছিল।

ইন্টারনেট ফিরতেই শুরু হয় ফোন ট্র্যাকিং, আতঙ্কে সিম বদলান সমন্বয়করা

ইন্টারনেট ফিরতেই শুরু হয় নজরদারির আতঙ্ক

সেদিন রাতে পাঁচ দিন পর পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। যদিও মোবাইল ইন্টারনেট তখনও বন্ধ ছিল।

জাতীয় এই ঘটনার প্রভাব দ্রুতই পড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কয়েকদিনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার পর ইন্টারনেট চালু হতেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের ফোনে একের পর এক গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে কল আসতে শুরু করে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, ইন্টারনেট সচল হওয়ার পরই আন্দোলনে সক্রিয় শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত নম্বর ট্র্যাকিংয়ের চেষ্টা শুরু হয়। ফলে গ্রেফতার ও নজরদারির আশঙ্কায় অনেকে সিম পরিবর্তন করেন, ফোন বন্ধ রাখেন এবং এক বাসা থেকে অন্য বাসায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। অনেকেই নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপনে থেকেই আন্দোলনের যোগাযোগ বজায় রাখেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী ফজলে রাব্বি বলেন, ২৪ জুলাই ব্রডব্যান্ড চালু হওয়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই অপরিচিত নম্বর থেকে একের পর এক ফোন আসতে থাকে। পরে জানতে পারি, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা আন্দোলনে সক্রিয় শিক্ষার্থীদের অবস্থান ও পরিচয় জানার চেষ্টা করছেন। তখন অনেকেই ফোন বন্ধ করে দেন, সিম বদলান এবং অবস্থান পরিবর্তন করেন। আন্দোলনের সমন্বয় বজায় রাখার পাশাপাশি গ্রেফতার এড়ানোই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জুলাই আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা বলেন, আংশিকভাবে ব্রডব্যান্ড চালু হওয়ার পরপরই আমার ব্যক্তিগত নম্বরে গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি) পরিচয়ে একাধিক ফোন আসে। বিষয়টি বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বন্ধ করে দিই। একই ধরনের কল আসে সমন্বয়ক মেহেদী সজীবের ভাইয়ের ফোনেও। এরপর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বাসা ছেড়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নেই।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এগিয়ে না এলে জুলাই আন্দোলন কখনোই সফল হতো না। রাজশাহী শহরের সাধারণ মানুষও থাকার জায়গা, খাবার ও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।

ইন্টারনেট ফিরতেই শুরু হয় ফোন ট্র্যাকিং, আতঙ্কে সিম বদলান সমন্বয়করা

গোপনে শুরু হয় সমন্বয়ক তালিকা তৈরির কাজ

সমন্বয়ক ফাহিম রেজা বলেন, ২৪ জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়। তালিকা তৈরির জন্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন থাকলেও পারিবারিক চাপ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং গ্রেফতারের আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে নিজেদের নাম দিতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত ১৭ জন শিক্ষার্থী সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব নিতে সম্মত হন এবং তাদের নাম কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঠানো হয়। সমন্বয়ক তালিকা তৈরির এই সময়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি আব্দুল মোহাইমিন সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমান রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট তিনটি সমন্বয়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রথম সমন্বয়ক প্যানেলটি ছাত্রলীগ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনকে নিয়ে গঠিত হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেটিকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ওই প্যানেলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। পরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা করে সবাইকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে দ্বিতীয় একটি সমন্বয়ক প্যানেল গঠন করা হয়। কিন্তু ছাত্রলীগের ভয়ভীতি, হামলার আশঙ্কা এবং গোয়েন্দা সংস্থার চাপের কারণে সেই প্যানেলের সদস্যরা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান এবং আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন। এরপর কেন্দ্রীয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় করে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট চূড়ান্ত সমন্বয়ক কমিটি গঠন করা হয়, যা পরবর্তী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।

তিনি আরও বলেন, চূড়ান্ত সমন্বয়ক কমিটি গঠনের জন্য আন্দোলনে সক্রিয় অসংখ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। অনেককে ব্যক্তিগতভাবে নক ও ফোন দেওয়া হয়। কিন্তু চলমান গ্রেফতার অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পরিবারের উদ্বেগের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে নিজেদের নাম দিতে রাজি হননি। তারা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখলেও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সমন্বয়ক হিসেবে প্রকাশ্যে আসতে চাননি।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অংশগ্রহণকারী লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাঈম তুহিনা বলেন, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বলব, জুলাইকে শুধু একটি স্মৃতি হিসেবে নয়, বরং শিক্ষা হিসেবে ধারণ করুন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছি। সেই লড়াইয়ের চেতনা ধরে রেখে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

এমওএইচএম/কেএইচকে/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow