ইমান ও ইবাদতের স্বাদ যেভাবে পাবেন
আমাদের অনেকের মধ্যেই প্রায়ই এই ভুল ধারণা বা মানসিকতা কাজ করে যে, আমার ভেতরে এখন ইমানের সেই জোর বা অনুভূতি নেই, তাই ইমানি অনুভূতিটা একটু আসুক, তারপর আমি আমল শুরু করব। আমরা ভাবি যে, ইমানের সেই স্বাদ বা মিষ্টতা যখন অন্তরে অনুভব করব তখন নামাজ পড়া শুরু করব, কিংবা ইমানের শক্তি একটু বাড়লে এই গুনাহের কাজটা ছেড়ে দেব। আর যতক্ষণ তা না হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা আধ্যাত্মিক জীবনটাকে একদম ছেড়ে দিই, কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজের মতো চলতে দিই। কিন্তু কোরআনের একটি মাত্র আয়াত আমাদের এই অবাস্তব ধারণাকে গুঁড়িয়ে দেয়। পবিত্র কোরআনের সুরা আনকাবুতের শেষ আয়াত, অর্থাৎ ৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এর এক অসামান্য সমাধান দিয়েছেন। ইবনে কাসিরসহ (রহ.) অন্যান্য মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, এটি কুরআনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ সবচেয়ে চমৎকার ও ব্যাপক অর্থবহ আয়াতগুলোর একটি। আয়াতটিতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন, যারা আমার উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালায় বা সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদের জন্য আমার পথগুলো উন্মুক্ত করে দেব; আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণ বা ইহসানের অধিকারীদের সাথে আছেন। এই আয়াতের মূল বার্তা হলো—সবকিছু শুরু হবে আপনার নিজের চেষ্
আমাদের অনেকের মধ্যেই প্রায়ই এই ভুল ধারণা বা মানসিকতা কাজ করে যে, আমার ভেতরে এখন ইমানের সেই জোর বা অনুভূতি নেই, তাই ইমানি অনুভূতিটা একটু আসুক, তারপর আমি আমল শুরু করব। আমরা ভাবি যে, ইমানের সেই স্বাদ বা মিষ্টতা যখন অন্তরে অনুভব করব তখন নামাজ পড়া শুরু করব, কিংবা ইমানের শক্তি একটু বাড়লে এই গুনাহের কাজটা ছেড়ে দেব। আর যতক্ষণ তা না হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা আধ্যাত্মিক জীবনটাকে একদম ছেড়ে দিই, কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজের মতো চলতে দিই। কিন্তু কোরআনের একটি মাত্র আয়াত আমাদের এই অবাস্তব ধারণাকে গুঁড়িয়ে দেয়।
পবিত্র কোরআনের সুরা আনকাবুতের শেষ আয়াত, অর্থাৎ ৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এর এক অসামান্য সমাধান দিয়েছেন। ইবনে কাসিরসহ (রহ.) অন্যান্য মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, এটি কুরআনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ সবচেয়ে চমৎকার ও ব্যাপক অর্থবহ আয়াতগুলোর একটি। আয়াতটিতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন, যারা আমার উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালায় বা সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদের জন্য আমার পথগুলো উন্মুক্ত করে দেব; আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণ বা ইহসানের অধিকারীদের সাথে আছেন।
এই আয়াতের মূল বার্তা হলো—সবকিছু শুরু হবে আপনার নিজের চেষ্টা দিয়ে। নিজের পরিবর্তনের দায় অন্য কিছুর ওপর চাপানো বন্ধ করতে হবে। আমরা প্রায়ই বলি যে, অমুক পরিস্থিতি ঠিক হলে বা আমার মন ভালো হলে আমি নিজেকে বদলে ফেলব। কিন্তু আয়াতটি বলছে, শুরুটা আপনাকে নিজেকেই করতে হবে। আর আল্লাহ আপনার কাছে নিখুঁত কিছু চাননি, তিনি চান আপনি চেষ্টাটা শুরু করুন। লক্ষ্য করুন, আল্লাহ কিন্তু বলেননি যে যারা ইবাদতকে একদম নিখুঁত করে ফেলেছে, কিংবা যারা ইমানের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছে; বরং আল্লাহ এখানে 'জাহাদু' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ হলো সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো বা সংগ্রাম করা।
ভোরে ফজরের নামাজের জন্য বিছানা ছেড়ে ওঠার যে কষ্ট, সেটিই আপনার সংগ্রাম। নামাজ শুরু করার জন্য নিজের অলসতার বিরুদ্ধে লড়াই করা, পরনারী বা হারামের দিক থেকে দৃষ্টি নিচু রাখা, কোনো একটা হারাম অভ্যাস বা উপার্জন ছেড়ে দেওয়ার জন্য মনের সাথে যুদ্ধ করা—এগুলোই আপনার সংগ্রাম। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের জীবনযাত্রাকে উন্নত করা, নিজের রাগ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করা, নিয়মিত জিকির বা ইবাদতের অভ্যাস ধরে রাখা, কিংবা পারিবারিক জীবনে একজন ভালো জীবনসঙ্গী বা ভালো বাবা-মা হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করা—এই সবটুকুই হচ্ছে আপনার ভেতরের জিহাদ। আল্লাহ বলছেন, তুমি শুধু শুরু করো, চেষ্টাটুকু দেখাও এবং প্রমাণ করো যে তুমি আসলেই সিরিয়াস এবং তুমি আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় খেয়াল করুন, আল্লাহ কিন্তু বলেননি যে যারা ‘আমার পথের জন্য’ চেষ্টা করে, বরং বলেছেন যারা ‘আমার জন্য’ বা ‘আমার সন্তুষ্টির জন্য’ চেষ্টা করে। কারণ পথ তো আল্লাহর কাছেই নিয়ে যায়, কিন্তু আল্লাহ দেখতে চান আপনার নিয়ত কতটা খাঁটি। আপনি যদি একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য এই লড়াইটা শুরু করেন, তবেই আপনার আধ্যাত্মিক যাত্রার সূচনা হবে। আর আপনি যখন আল্লাহর জন্য এই সামান্য চেষ্টাটুকু করবেন, তখন প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ কী দেবেন? আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী এই আয়াতে জোর দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। আপনি যদি সামান্যতম উদ্যোগ নেন, তবে আল্লাহ আপনার জন্য শুধু একটি নয়, সফলতার ও হেদায়েতের বহু পথ ও দুয়ার খুলে দেবেন। আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটা ভালো কাজ শুরু করবেন, আর আপনার চারপাশের অজস্র ভালো কাজের সুযোগের দরজা খুলে যাবে। আপনি শুধু দেখান যে আপনি আন্তরিক, আর আল্লাহ আপনাকে গ্যারান্টি দিচ্ছেন যে তিনি আপনার জন্য সব সহজ করে দেবেন, কারণ আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
আল্লাহ আপনার জন্য পরিস্থিতি তখনই সহজ করবেন, যখন আপনি নিজে থেকে প্রথম কদমটি বাড়াবেন। আর এই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আপনাকে শুরুতেই একদম নিখুঁত হতে হবে না, কোনো কাজের শেষ সীমানায় পৌঁছাতে হবে না। আল্লাহ কিন্তু কাজটি শেষ করার শর্ত দেননি, তিনি বলেছেন যখনই আপনি আগ্রহ দেখাবেন এবং যাত্রা শুরু করবেন, তখনই তিনি দয়া করবেন। আপনাকে রেসের শেষ মাথায় পৌঁছাতে হবে না, আপনাকে শুধু রেসে অংশ নিতে হবে। আর আপনি যখনই তা করবেন, তখন নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ আপনার পাশে থাকবেন। আমরা অনেকেই বলি যে আমরা আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করতে পারি না, আমাদের ইবাদতে মন বসে না। এর মূল কারণ হলো, আমরা আমাদের নিজেদের নফসের সাথে বা কুপ্রবৃত্তির সাথে লড়াইটা শুরুই করিনি। আল্লাহ আমাদের বলছেন, আপনি যদি নিজের ত্যাগ ও সাধনা দিয়ে শুরু করতেন, তবে অবশ্যই আল্লাহর দয়া অনুভব করতে পারতেন। আপনি যদি একটু কষ্ট করে চেষ্টা করতেন, তবে ইমানের মিষ্টতা পেতেন, আপনার জন্য নতুন পথ খুলে যেত এবং আপনি চারপাশেই আল্লাহর রহমতের স্পর্শ টের পেতেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন যারা ইহসান বা পূর্ণতা অর্জন করতে চায়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই আয়াতটি সুরার ঠিক কোন জায়গায় এসেছে? আপনি যদি পুরো সুরা আনকাবুত পড়েন, তবে দেখবেন সুরার শুরুতেই আল্লাহ বলছেন, মানুষ কি মনে করে যে 'আমরা ইমান এনেছি' এ কথা বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি। অর্থাৎ পুরো সুরাটিই আসলে বিভিন্ন পরীক্ষা এবং ফিতনার বর্ণনায় পূর্ণ। ইমান রক্ষা করতে গিয়ে মানুষের ওপর নেমে আসা নির্যাতন, আল্লাহর রাস্তায় জীবন দেওয়া, দ্বীন বাঁচানোর জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে হিজরত করা, যেমনটা ইবরাহিম ও লুত আলাইহিস সালাম করেছিলেন—এসবের বিবরণ এখানে আছে। এ ছাড়া সম্পদের ফিতনা, ক্ষমতার ফিতনা, পরিবারের ফিতনা, এমনকি পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের মতো কঠিন পরীক্ষার কথাও এই সুরায় এসেছে; কারণ বাবা-মার যত্ন নেওয়াটাও এক প্রকার বড় সংগ্রাম। একটার পর একটা কঠিন পরীক্ষা ও ফিতনার চাদরে মোড়ানো এই সুরা। তাহলে জীবনের এত এত পরীক্ষা আর ফিতনা আপনি কীভাবে পার হবেন? কীভাবে এই কঠিন পথ পাড়ি দেবেন? এই সুরার একদম শেষ আয়াতটিই মূলত পুরো সুরার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। উত্তরটি হলো—আপনাকে শুধু চেষ্টা শুরু করতে হবে, চাকাটা সচল করতে হবে। আল্লাহকে দেখাতে হবে যে আপনি প্রস্তুত, আপনি চেষ্টা করতে রাজি আছেন। আপনি যখনই এই মানসিকতা নিয়ে এক কদম বাড়াবেন, আল্লাহ আপনার জন্য সব সহজ করে দেবেন এবং এমন উৎস থেকে সাহায্য পাঠাবেন যা আপনি কখনো কল্পনাও করেননি। আর তখনই আপনি আপনার জীবনে আল্লাহর সাহায্য ও সান্নিধ্য অনুভব করবেন।
তাই মূল কথা এটাই যে, নিজের অলসতা বা গুনাহের জন্য অন্য কোনো কিছুকে বা পরিস্থিতিকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুন। আমাদের নিজেদের ভেতর থেকে বদলাতে হবে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটু কষ্ট করতে হবে, নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। আপনি আল্লাহর জন্য আপনার চেষ্টাটুকু করুন, আল্লাহ আপনার জন্য রহমতের শত দুয়ার খুলে দেবেন। আল্লাহ আপনাকে তাঁর বিশেষ শান্তিতে ও সুরক্ষায় জড়িয়ে রাখবেন এবং আপনার জীবনের সমস্ত কঠিন পরিস্থিতিকে সহজ করে দেবেন। এই দুনিয়ার সব ফিতনা ও পরীক্ষা থেকে বেঁচে থাকার এটাই একমাত্র পথ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে খাঁটি ইমান দান করুন এবং আমাদের নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করার তৌফিক দিন, যাতে আমাদের জন্য হেদায়েতের পথগুলো খুলে যায় এবং আমরা সবসময় আমাদের জীবনে তাঁর পবিত্র উপস্থিতি ও শান্তি অনুভব করতে পারি।
সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল EPIC MASJID-এ প্রকাশিত ড. ইয়াসির কাদির জুমার খুতবা থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।

দৈনন্দিন কাজ যেভাবে ইবাদতে পরিণত হয়
ওএফএফ
What's Your Reaction?

