হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের পরিকল্পনায় ভেস্তে যাচ্ছে শত্রুদের সব ষড়যন্ত্র। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের ওপর অমানবিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো। সেই নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক দীর্ঘদিন ধরে। দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতিতে নাজেহাল ইরানের সাধারণ জনগণ।
এতো কিছুর পরও দেশপ্রেমের কারণে ইরানের জনগণ বরাবরই সরকারকে সহায়তা দিয়ে আসছে। অবশ্য কিছু দালাল তৈরি করে আমেরিকা বারবার ইরানের মধ্যে অশান্তি তৈরির চেষ্টা চালিয়েছে কিন্তু সেই চক্রান্ত কখনোই সফল হয়নি কারণ একটাই ইরানের জনগণের দেশপ্রেম।
কিন্তু এবার সেই অর্থনৈতিক সংকট কেটে উঠার একটি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক পরিকল্পনা করছে ইরান প্রশাসন। এই পরিকল্পনা সফল হলে অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়াবে তেহরান। বলা যায়, দেশটির ভাগ্য খুলে দিচ্ছে হরমুজ প্রণালি। তাদের পরিকল্পনা দেখে ঘুম হারাম ট্রাম্প প্রশাসনের।
সমরবিদদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত ৫০ বছরে ইরানে হামলার মতো বড় ভুল আর করেনি। হামলার কারণে আমছালা সবই হারাচ্ছে তারা। একদিকে ইরান যুদ্ধে হেরে গেছে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে আগামীতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইরানমুখী হতে বাধ্য হবে তেলের ব্যবসাকে চালিয়ে নিতে। কারণ একটাই হরমুজ প্রণালি। আল্লাহ ইরানের মুসলমানদেরকে এই একটি সম্পদের মাধ্যমে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনীতিতে বড় বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে তেহরান। এ বিষয়ে মেরিটাইম ডাটা ফার্ম লয়েডস লিস্ট ইনটিলিজ জানায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ— কিন্তু ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইরাকের অনেকগুলো জাহাজ এক্সেস পেয়েছে।
কিন্তু কিভাবে..?
উত্তর সহজ, ইরানের সহায়তায়, গোপন ট্রানজিট ব্যবহার করে। এই এনালাইসিস বলছে, ইরান তাদের সীমানায় একটা লেনকে ‘সেইফ করিডর’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
তোমার দেশ তেল নিয়ে এই পথে জাহাজ পাঠাবে..?
ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করো। ডকুমেন্ট দেখাও। ক্লিয়ারেন্স নিয়ে সেইফলি চলে যাও। তবে শর্ত আছে, টোল দিতে হবে এবং এই টোল ধরা হয়েছে প্রতি ব্যারেলে ১ ডলার। খালি চোখে দেখলে ব্যারেল প্রতি এই পরিমাণটা বড় না, কিন্তু হিসাব শেষে এটি বড় আকার ধারণ করবে।
এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে প্রতিদিন তেল যায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল। যদি প্রতি ব্যারেলে ১ ডলার হয় তাহলে ভবিষ্যতে শুধু এই হরমুজ প্রণালি থেকেই প্রতিদিন আয় হবে ২০ মিলিয়ন ডলার। দৈনিক আয় ২০ মিলিয়ন ডলার হয় তাহলে বছরে ৭.২ বিলিয়ন ডলার হবে।
ধরা যাক, এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেইফ এক্সিট নিয়ে আপাতত যদি প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল যায় তাহলে প্রতিদিন তাদের আয় হবে ১০ মিলিয়ন ডলার। ১ বছরে ৩.৬৫ বিলিয়ন ডলার। এই এমাউন্টটা তাদের যুদ্ধ ব্যয়ের ক্ষতি পোষানোয় সহায়ক হবে। অর্থাৎ এই সময়টাতে হরমুজ প্রণালিতে যারা টোল দিবে, তারা সেইফলি এক্সিট পাবে নয়তো হামলা চলবে।
ক্যারিক রায়ানার লিখেছেন; যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দখল না করতে পারার আগেই যুদ্ধ বিরতিতে চলে যায়, তাহলে তাদের বৈশ্বিক আধিপত্য কমবেই কমবে।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এখনও যে হরমুজ প্রণালি দখল করতে পারেনি, আরেক দেশ থেকে ‘মাইন সুইপার’ জাহাজ চেয়ে নিতে হচ্ছে, এটা মূলত কি বার্তা দেয় বিশ্বকে..?
আরব দেশগুলো নিঃসন্দেহে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবে, তারা কাকে সমর্থন জানাবে..? মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করা ইরানকে..?
নাকি সুপার পাওয়ার আমেরিকাকে যারা তিন সপ্তাহের বেশি সময় নেওয়ার পরও হরমুজ প্রণালি দখল করতে পারেনি।
এখানেই শেষ না। ক্যারিক রায়ান বলছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে এভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে ইরানের মিত্র হুতিদের দিয়ে লোহিত সাগরে আধিপত্য বিস্তার যে করবে না তার ভবিষ্যদ্বাণী কে করতে পারে..?
তখন সত্যিকার অর্থে মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি হয়ে উঠবে ইরান। আমেরিকার সেনা ছাউনিগুলোর ঠাঁই হবে না আরব বিশ্বে। তখন পাল্টে যাবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি।
লেখা : মাহমুদ সোহেল, বিশেষ প্রতিনিধি, জিটিভি।