ঈদ আনন্দ ম্লান, সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষকসহ তিনজনের করুণ মৃত্যু

বাড়িতে বাবা-মা, স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করবেন বলে স্ত্রী মুন্নি আক্তার (৩০) ও একমাত্র সন্তান মুহাম্মদ আয়ানকে (৮) নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের বাসায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে রওনা হয়েছিলেন মনির হোসেন (৩৫)। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছেছিলেনও। কিন্তু বাড়ি থেকে মাত্র দশ মিনিটের দূরত্ব পেরিয়ে পৌঁছানো হলো না তাঁদের। বেপরোয়া গতির চালবোঝাই একটি পিকআপ ভ্যানের চাপায় মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায় সব। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনজন।সোমবার সন্ধ্যায় ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কে ভাতশালা সেতুর কাছে চালবোঝাই পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে মনির হোসেনের মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মর্মন্তুদ এই ঘটনাটি ঘটে।নিহত মনির হোসেন মিঠামইন উপজেলার মহিষাকান্দি গ্রামের মো. সাফাজউদ্দিনের ছেলে। তিনি করিমগঞ্জ নোয়াবাদ এলাকার সাইটুটা দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক ছিলেন। এছাড়া জেলা শহরে একটি কোচিং সেন্টারও পরিচালনা করতেন।কিশোরগঞ্জের ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক মনির হোসেন পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। ছোট ভাই আশরাফুল ইসলাম ইমন কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের গুরুদয়াল সরকারি কলেজে গণিতে অনার্স করছেন। অপর ভাই মিলাদ হোসেন ইতালি প্রবাসী। মনিরের বাবা সাফা

ঈদ আনন্দ ম্লান, সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষকসহ তিনজনের করুণ মৃত্যু

বাড়িতে বাবা-মা, স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করবেন বলে স্ত্রী মুন্নি আক্তার (৩০) ও একমাত্র সন্তান মুহাম্মদ আয়ানকে (৮) নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের বাসায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে রওনা হয়েছিলেন মনির হোসেন (৩৫)। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছেছিলেনও। কিন্তু বাড়ি থেকে মাত্র দশ মিনিটের দূরত্ব পেরিয়ে পৌঁছানো হলো না তাঁদের। বেপরোয়া গতির চালবোঝাই একটি পিকআপ ভ্যানের চাপায় মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায় সব। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনজন।

সোমবার সন্ধ্যায় ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কে ভাতশালা সেতুর কাছে চালবোঝাই পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে মনির হোসেনের মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মর্মন্তুদ এই ঘটনাটি ঘটে।

নিহত মনির হোসেন মিঠামইন উপজেলার মহিষাকান্দি গ্রামের মো. সাফাজউদ্দিনের ছেলে। তিনি করিমগঞ্জ নোয়াবাদ এলাকার সাইটুটা দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক ছিলেন। এছাড়া জেলা শহরে একটি কোচিং সেন্টারও পরিচালনা করতেন।

কিশোরগঞ্জের ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক মনির হোসেন পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। ছোট ভাই আশরাফুল ইসলাম ইমন কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের গুরুদয়াল সরকারি কলেজে গণিতে অনার্স করছেন। অপর ভাই মিলাদ হোসেন ইতালি প্রবাসী। মনিরের বাবা সাফাজ উদ্দিন বেপারি ধানের ব্যবসা করেন। মা আনোয়ারা বেগম গৃহিণী।

মা আনোয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সোমবার সকালে মনিরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। দুপুরে খাবারের পর কিশোরগঞ্জ থেকে মোটরসাইকেলে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে গ্রামের বাড়ি মিঠামইনের মহিষাকান্দি গ্রামে আসবেন। কথা ছিল মঙ্গলবার মিঠামইনের হাট থেকে কোরবানির গরু কিনবেন। কিন্তু ঘাতক গাড়ির চাপায় মুহূর্তের মধ্যে মনিরের সব আশা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না তাঁর। তিনজনের প্রাণই কেড়ে নিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায় চাল ভর্তি পিকআপ গাড়িটি। একমাত্র সন্তান আয়ান ও স্ত্রী মুন্নির বাড়িতে আসার জন্য কত আশা ছিল। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নিমিষেই জীবনপ্রদীপ নিভে গেল, ঝরে গেল তিনটি তাজা প্রাণ।

মনির পরিবার ও শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন একজন পরিশ্রমী ও স্বপ্নবাজ মানুষ। স্ত্রী মুন্নি আক্তার ছিলেন সংসারের প্রাণ। ছোট আয়ান ছিল বাবা-মায়ের চোখের মণি।

মনিরের মামাতো ভাই প্রতিবেশী পল্লব হাসান বলেন, "আমাদের একই সঙ্গে পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠা। জীবনে যতবার দেখা হয়েছে ততবার আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতো। ও সবসময় বলতো আমার কোচিং সেন্টারে আসবি। কিশোরগঞ্জ থেকে দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে এসে মাত্র দশ মিনিটের রাস্তা বাড়ি পৌঁছানো দূরত্বের কাছে হেরে গেল মনিরসহ তিনটি তাজা প্রাণ। মা-বাবার সঙ্গে আর ঈদ করা হলো না।"

এই পরিবারে এবার কোরবানির ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। তিনটি কফিনের কাছে পরিবারের সদস্যদের শুধু আহাজারি। তিনটি ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখে একটু পর পর ধড়ফড় করছে। মনিরের সাজানো স্বপ্নের সমাপ্তি হয়ে গেল।

নিহত মনিরের প্রতিবেশীরা বলেন, এক সঙ্গে তিনটি তাজা প্রাণের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মহিষারকান্দি গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

ছোট ভাই আশরাফুল চিৎকার করে বলেন, "দুপুরে যে মানুষটি হাসিমুখে বাসা থেকে বেরিয়েছিল, সন্ধ্যায় ভাই-ভাবির নিথর দেহ ফিরবে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এই দুর্ঘটনা শুধু তিনটি প্রাণই নেয়নি, শেষ করে দিয়েছে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, সব আশা। ছোট্ট আয়ানের অসমাপ্ত শৈশব, মায়ের স্নেহ, আর বাবার সংগ্রামের গল্প শুধু এখন স্মৃতি হয়ে থাকবে।"

মনিরের শেষ বিদায়ে গ্রামের বাড়ি মহিষারকান্দি মাদ্রাসা মাঠে নামাজের জানাজায় সমাগম ঘটে হাজারো লোকের। তাঁরা দোয়া, ভালোবাসা আর চোখের জলে শেষ বিদায় জানান মনির হোসেনকে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow