ঈশ্বরদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে হাস্কিং মিল
৭০৬ থেকে চালু মাত্র ৬০-৭০টি অটোরাইসের দাপটে অস্তিত্ব সংকটে লোকসান-ঋণে বিপাকে মিল মালিকরা একসময় মেশিনের শব্দ আর শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত পাবনার ঈশ্বরদীর শত শত হাস্কিং রাইস মিল। দেশের অন্যতম বড় চালের মোকাম হিসেবে পরিচিত জয়নগরকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বিশাল চাল ব্যবসার কেন্দ্র। উপজেলার ভেলুপাড়া থেকে পাকশীর রূপপুর পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে ছিল সারি সারি চালকল ও চাতাল। পুরো উপজেলায় ছিল ৭০৬টি হাস্কিং মিল। কিন্তু এখন সেই সময় বদলেছে। অটোরাইস মিলের দাপট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, বিদ্যুতের বাড়তি খরচ, ধান-চালের দামের অসামঞ্জস্য এবং ব্যাংক ঋণের বোঝায় একে একে বন্ধ হয়ে গেছে এসব চালকল। বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ৬০-৭০টি। বন্ধ হয়ে যাওয়া অধিকাংশ মিল পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। কোনো কোনো মালিক চাতাল ভাড়া দিয়েছেন গাড়ির গ্যারেজসহ অন্য কাজে। একসময় এসব মিলে কাজ করা ২০ থেকে ৩০ হাজার শ্রমিকও জীবিকার প্রয়োজনে বদলে ফেলেছেন পেশা। ঈশ্বরদী উপজেলা চাউল কল মালিক গ্রুপ সূত্রে জানা যায়, একসময় উপজেলার ৭০৬টি চালকলই সংগঠনটির সদস্য ছিল। বর্তমানে সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০০ হলেও চালু রয়েছে ৬০-৭০টি মিল।
- ৭০৬ থেকে চালু মাত্র ৬০-৭০টি
- অটোরাইসের দাপটে অস্তিত্ব সংকটে
- লোকসান-ঋণে বিপাকে মিল মালিকরা
একসময় মেশিনের শব্দ আর শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত পাবনার ঈশ্বরদীর শত শত হাস্কিং রাইস মিল। দেশের অন্যতম বড় চালের মোকাম হিসেবে পরিচিত জয়নগরকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বিশাল চাল ব্যবসার কেন্দ্র। উপজেলার ভেলুপাড়া থেকে পাকশীর রূপপুর পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে ছিল সারি সারি চালকল ও চাতাল। পুরো উপজেলায় ছিল ৭০৬টি হাস্কিং মিল।
কিন্তু এখন সেই সময় বদলেছে। অটোরাইস মিলের দাপট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, বিদ্যুতের বাড়তি খরচ, ধান-চালের দামের অসামঞ্জস্য এবং ব্যাংক ঋণের বোঝায় একে একে বন্ধ হয়ে গেছে এসব চালকল। বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ৬০-৭০টি। বন্ধ হয়ে যাওয়া অধিকাংশ মিল পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। কোনো কোনো মালিক চাতাল ভাড়া দিয়েছেন গাড়ির গ্যারেজসহ অন্য কাজে। একসময় এসব মিলে কাজ করা ২০ থেকে ৩০ হাজার শ্রমিকও জীবিকার প্রয়োজনে বদলে ফেলেছেন পেশা।
ঈশ্বরদী উপজেলা চাউল কল মালিক গ্রুপ সূত্রে জানা যায়, একসময় উপজেলার ৭০৬টি চালকলই সংগঠনটির সদস্য ছিল। বর্তমানে সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০০ হলেও চালু রয়েছে ৬০-৭০টি মিল। চালু থাকা মিলগুলোর অবস্থাও নাজুক। দীর্ঘদিনের লোকসান, ঋণ ও পুঁজি সংকটে অনেক মালিক ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পথে।
অটোরাইসের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে হাস্কিং মিল
স্থানীয় ধান-চাল ব্যবসায়ীদের মতে, ১৯৮৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম হিসেবে পরিচিত ছিল ঈশ্বরদীর জয়নগর মোকাম। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ধান এনে এখানকার হাস্কিং মিলাররা চাল উৎপাদন করতেন।
পৌর শহরের ভেলুপাড়া থেকে পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর পর্যন্ত আইকে রোডের দুই পাশে প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকায় ছিল অসংখ্য হাস্কিং মিল ও চাতাল। দাশুড়িয়া, আওতাপাড়া, ছিলিমপুর, মুলাডুলিসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও ছিল শত শত চালকল।এসব মিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল শতাধিক রাইস এজেন্সি। এসব এজেন্সির মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে চাল সরবরাহ করা হতো।
কিন্তু ২০১০ সালের পর অটোরাইস মিলের প্রসার শুরু হলে ধীরে ধীরে এই চিত্র পাল্টে যায়। একের পর এক হাস্কিং মিল বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি অনেক ব্যবসায়ী লোকসানে পড়ে ঋণখেলাপি হয়েছেন। কেউ কেউ পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।
ঈশ্বরদীতে অটোরাইস মিল স্থাপন শুরু ২০১০ সালের পর থেকে। বর্তমানে উপজেলায় ১৭টি অটোরাইস মিল চালু রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও কম উৎপাদন ব্যয়ের কারণে এসব মিল দ্রুত বাজার দখল করে নেয়। বিপরীতে পুরোনো প্রযুক্তিনির্ভর হাস্কিং মিলগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাস্কিং মিলে ধান থেকে চাল উৎপাদনে সময় লাগে প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন। অন্যদিকে অটোরাইস মিলে এক-দুই দিনের মধ্যেই চাল উৎপাদন করে বাজারজাত করা যায়। ফলে দ্রুত উৎপাদন ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের কারণে বাজারে অটোরাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে হাস্কিং মিল মালিকদের জন্য।
আইকে রোডের চরমিরকামারী এলাকার চালকল মালিক আনিসুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, ঢাকাসহ বিভিন্ন মোকামে চাল দিয়ে টাকা না পাওয়া এবং অটোরাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারাসহ নানা কারণে একের পর এক হাস্কিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মালিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মিল চালাতেন। ব্যবসায় লোকসানের কারণে ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে ঋণখেলাপি হয়ে সবকিছু হারিয়েছেন।’
তিনি বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব মিলে লাখ লাখ টাকার যন্ত্রাংশ ও চাতাল পড়ে থেকে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে।
শুধু অটোরাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতাই নয়, শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধিও হাস্কিং মিলের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধান-চালের বাজারে দামের ওঠানামা এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের সমন্বয় না থাকায় লোকসান বাড়ছে বলে জানান মিল মালিকরা।
দাশুড়িয়া এলাকার হাস্কিং মিল মালিক আকরাম হোসেন বলেন, ‘অটোরাইস মিলে উৎপাদন ব্যয় আর আমাদের হাস্কিং মিলের উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। অটোরাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই নিজের কষ্টে গড়া মিলটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি। এছাড়া শ্রমিক সংকট ও শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধিসহ নানা সমস্যা তো রয়েছেই।’
ঈশ্বরদী উপজেলা চাউল কল মালিক গ্রুপের সভাপতি শামসুল আলম বলেন, ‘বেশিরভাগ চালকল মালিক লোকসানের মুখে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে না পেরে দেউলিয়া হয়েছেন। ফলে ধীরে ধীরে হাস্কিং মিল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দফায় দফায় বিদ্যুতের ইউনিটের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়াসহ বিদ্যুতের নানা খরচে মিলাররা চাপে পড়েছেন। পাশাপাশি ধান ও চালের দামের অসামঞ্জস্য, অটোরাইস মিলের তুলনায় বেশি উৎপাদন খরচ এবং সরকারি খাদ্যগুদামে সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাল সরবরাহ করতে না পারায় অনেক হাস্কিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে।’
কম সুদের ঋণে অটোরাইস, উচ্চ সুদে হাস্কিং
চালকল মালিকরা বলছেন, কৃষকদের ধান উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি হাস্কিং মিল মালিকদের জন্য সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ, বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো এবং সরকারি খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, সরকারের কার্যকর সহায়তা ছাড়া পুরোনো এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। অন্যথায় ৭০৬টি চালকলের যে ইতিহাস একসময় ঈশ্বরদীর অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, তা ধীরে ধীরে কেবল স্মৃতিতেই পরিণত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাস্কিং মিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; এর সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও ধান-চাল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মানুষও ক্ষতির মুখে পড়বেন। একসময় যে শিল্প হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ঈশ্বরদীকে দেশের অন্যতম বড় চালের মোকামে পরিণত করেছিল, সেটি এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।
পাবনা জেলা অটো মেজর হাস্কিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুল আলম দুলাল সরদার বলেন, ‘সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে অটোরাইস মিল মালিকদের কোটি কোটি টাকা স্বল্প সুদে ঋণ দেয়। অথচ হাস্কিং মিল মালিকদের স্থানীয় ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে মিল-চাতাল পরিচালনা করতে হয়।’
তার ভাষ্য, ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অনেকে দেউলিয়া হয়েছেন। ঋণে জর্জরিত হয়ে অনেকেই চালকল বিক্রি কিংবা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ধান কিনে চাল উৎপাদন করতে হাস্কিং মিলে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। আর অটোরাইস মিলে এক-দুই দিনের মধ্যে চাল উৎপাদন করে বাজারজাত করা যায়। তাদের উৎপাদন খরচও অনেক কম। তাই তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।’

স্বস্তি ফেরেনি কুষ্টিয়ার চালের বাজারে
ঈশ্বরদী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. শাহিনুর আলম জাগো নিউজকে জানান, এ উপজেলায় প্রায় ৮০টি চালকল সরকারি চাল ক্রয়ের তালিকায় রয়েছে। প্রতিটি চালকলের ধারণক্ষমতা (কেপাসিটি) বা যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। কোন মিলে কত টন বরাদ্দ দেওয়া হয়, এটি এই মুহুর্তে বলা মুশকিল। তবে আনুমানিক সর্বনিম্ন ৭ টন থেকে ২৫ টন পযন্ত চাল বা কখনো মিলের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী চেয়ে বেশি চাল ক্রয়ের চাহিদা দেওয়া হয়।
হাস্কিং মিলের চেয়ে অটো রাইস মিলে সরকার চাল ক্রয়ের চাহিদা বা বরাদ্দ বেশি দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাস্কিং মিলের চেয়ে অটোরাইস মিলের কেপাসিটি বা ধারণক্ষমতা বেশি, তাই তাদের থেকে বেশি চাল ক্রয়ের চাহিদা দেওয়া হয়। এখানে আর অন্য কোনো কারণ নেই। মিলগুলো তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী বরাদ্দ পেয়ে থাকে।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মমিন বলেন, শুনেছি এ উপজেলায় একসময় সাত শতাধিক হাস্কিং চালকল ছিল। এখন সংখ্যা অনেক কমেছে। এ উপজেলা সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানকার বেশিরভাগ জমিতে সবজি উৎপাদন হয়। ধানের আবাদ এখানে বরাবরই কম হয়। এখানকার চালকলগুলোতে যে ধানের জোগান দেওয়া হয়, তা বাইরের জেলা থেকে সংগ্রহ করা হয়। তাই এখানকার হাস্কিং মিলগুলো বন্ধ হলেও ধান চাষের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
এসকেএম/কেএইচকে/জেআইএম
What's Your Reaction?


