এআই দক্ষ মানবসম্পদ: নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি নতুন উদ্ভাবন শুধু মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তন করে না, বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, কর্মসংস্থানের ধরণ এবং বৈশ্বিক অবস্থানকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নিঃসন্দেহে এমনই এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি। শিল্পবিপ্লবের সময় যেমন বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎ ও পরে ইন্টারনেট বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিয়েছিল, বর্তমান সময়ে এআই সেই পরিবর্তনের নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে বাংলাদেশে এআইভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর সরকার যে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা সময়োপযোগী এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এমপি সম্প্রতি বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং গবেষণা-উদ্ভাবনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তার এই বক্তব্য মূলত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এআইভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি নতুন উদ্ভাবন শুধু মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তন করে না, বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, কর্মসংস্থানের ধরণ এবং বৈশ্বিক অবস্থানকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নিঃসন্দেহে এমনই এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি। শিল্পবিপ্লবের সময় যেমন বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎ ও পরে ইন্টারনেট বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিয়েছিল, বর্তমান সময়ে এআই সেই পরিবর্তনের নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে বাংলাদেশে এআইভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর সরকার যে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা সময়োপযোগী এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এমপি সম্প্রতি বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং গবেষণা-উদ্ভাবনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তার এই বক্তব্য মূলত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এআইভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিকে নতুন বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন। তার দৃষ্টিভঙ্গিতে তরুণ প্রজন্ম শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়; বরং তারা হবে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নির্মাতা। একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ- এই উপলব্ধিই আধুনিক উন্নয়ন দর্শনের মূল ভিত্তি।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা আর শুধু শিল্পকারখানা, প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করছে না। এখন প্রতিযোগিতার মূল শক্তি হচ্ছে জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত- যেসব দেশ এআই ও উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে, তারা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশের জন্য এআই একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন আধুনিক দক্ষতা, গবেষণার সুযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা।
এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা ল্যাবের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সাভারের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ডিআইইউ) উদ্বোধন হওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ল্যাব এই ধরনের উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। শুধু একটি ল্যাব স্থাপন করলেই হবে না; বরং সেই ল্যাবকে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের উপযোগী প্রযুক্তিতে রূপান্তর করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
ডিআইইউর এআই ল্যাবে আধুনিক কম্পিউটিং অবকাঠামো, শক্তিশালী জিপিইউ এবং দক্ষ গবেষক দল যুক্ত হওয়া একটি ইতিবাচক দিক। এরইমধ্যে এআই প্রফেসর, এআই প্রক্টর এবং এআই রেজিস্ট্রারের মতো উদ্ভাবনী সমাধান তৈরি করা হয়েছে, যা শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই ধরনের উদ্যোগ যদি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী এআই ইকোসিস্টেম গড়ে উঠতে পারে।
তবে এআই নিয়ে আলোচনায় শুধু প্রযুক্তিগত দিক বিবেচনা করলে চলবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের শ্রমবাজার। অনেকেই আশঙ্কা করেন, এআই মানুষের চাকরি কমিয়ে দেবে। বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তির প্রতিটি বড় পরিবর্তনের সময় এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, নতুন প্রযুক্তি কিছু পুরোনো কাজ পরিবর্তন করলেও নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- মানুষকে সেই নতুন কাজের উপযোগী করে তোলা। এ কারণেই সরকারের আগামী পাঁচ বছরে আইসিটি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু প্রশিক্ষণ নয়, প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা তৈরি করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের তরুণরা শুধু দেশের বাজারে নয়, বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারে।
এআই প্রশিক্ষণকে শহরকেন্দ্রিক রাখলে চলবে না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের কাছেও প্রযুক্তির সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে এআই ট্রেনিং সেন্টার এবং উন্নত ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল বৈষম্য কমানো ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, তথ্য নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শক্তিশালী প্রযুক্তি, কিন্তু এর ব্যবহার হতে হবে মানুষের কল্যাণে। ভুল তথ্য, সাইবার অপরাধ এবং অপব্যবহার ঠেকাতে একটি কার্যকর নীতিমালা ও সচেতনতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের মতো যেসব খাত বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়েছে, ভবিষ্যতে এআই, সফটওয়্যার, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা খাত সেই ভূমিকা পালন করতে পারে। এজন্য এখন থেকেই দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এআইভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা শুধু প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ আগামী দিনের বিশ্বে এগিয়ে থাকবে সেই দেশ, যে দেশ তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের শক্তিতে প্রস্তুত করতে পারবে।
বাংলাদেশের তরুণদের হাতে যদি আধুনিক প্রযুক্তির দক্ষতা তুলে দেওয়া যায়, গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা যায় এবং উদ্ভাবনী চিন্তার পরিবেশ তৈরি করা যায়, তাহলে এআই শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনবে না- এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার নতুন ভিত্তি তৈরি করবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত মানুষের মেধায়। কারণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়বে প্রযুক্তি নয়, প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে সক্ষম দক্ষ মানুষ।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
এইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?