একদিনের কাল্পনিক শহর: শ্রমিক ছাড়া কেমন হবে নগরজীবন
ভোর ৫টা। শহর তখনো পুরোপুরি জাগেনি। কিন্তু সাধারণত এই সময়েই শুরু হয়ে যায় এক অদৃশ্য কর্মযজ্ঞ রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ, ময়লার গাড়ির ধীরগতি, নির্মাণস্থলে প্রথম হাতুড়ির আঘাত। মনে করুন, হঠাৎ একদিন সেই শব্দগুলো নেই, শহরে কোনো শ্রমিক নেই। একবার কল্পনা করে দেখুন সেই দিনটি কেমন হতে পারে? হয়তো প্রথমেই বিষয়টি বোঝা যাবে না। রাস্তা খানিকটা নীরব এটাকে ছুটির দিনের প্রশান্তি ভেবে ভুল হতে পারে। কিন্তু একটু এগোতেই অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। মোড়ের পাশে জমে থাকা ময়লার স্তূপ আগের দিনের মতোই পড়ে আছে। কেউ তা সরায়নি। বাতাসে হালকা দুর্গন্ধ। সকাল ৮টা। রাস্তায় মানুষের ভিড় বাড়ছে। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষরা বুঝতে শুরু করেছেন, কিছু একটা ঠিক নেই। কারণ, বাসগুলো বের হয়নি ড্রাইভার বা সহকারী নেই। এদিকে রাস্তায় রিকশাও নেই। কোনো কোনো অফিসযাত্রী হয়ত বলবেন, ‘প্রতিদিন এই সময়ে অন্তত ১০টা রিকশা পাই। আজ আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি, একটাও পেলাম না!’ শেষমেষ আপনি হেঁটেই যাচ্ছিলেন। শহরের অভ্যন্তরে ঢুকতেই দেখা যায় আরেক দৃশ্য। নির্মাণাধীন ভবনগুলো নিস্তব্ধ। যেখানে প্রতিদিন শ্রমিকদের ব্যস্ততা থাকে, সেখানে আজ শুধু দাঁড়িয়ে আছে অসমাপ্
ভোর ৫টা। শহর তখনো পুরোপুরি জাগেনি। কিন্তু সাধারণত এই সময়েই শুরু হয়ে যায় এক অদৃশ্য কর্মযজ্ঞ রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ, ময়লার গাড়ির ধীরগতি, নির্মাণস্থলে প্রথম হাতুড়ির আঘাত। মনে করুন, হঠাৎ একদিন সেই শব্দগুলো নেই, শহরে কোনো শ্রমিক নেই। একবার কল্পনা করে দেখুন সেই দিনটি কেমন হতে পারে?
হয়তো প্রথমেই বিষয়টি বোঝা যাবে না। রাস্তা খানিকটা নীরব এটাকে ছুটির দিনের প্রশান্তি ভেবে ভুল হতে পারে। কিন্তু একটু এগোতেই অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। মোড়ের পাশে জমে থাকা ময়লার স্তূপ আগের দিনের মতোই পড়ে আছে। কেউ তা সরায়নি। বাতাসে হালকা দুর্গন্ধ।
সকাল ৮টা। রাস্তায় মানুষের ভিড় বাড়ছে। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষরা বুঝতে শুরু করেছেন, কিছু একটা ঠিক নেই। কারণ, বাসগুলো বের হয়নি ড্রাইভার বা সহকারী নেই। এদিকে রাস্তায় রিকশাও নেই। কোনো কোনো অফিসযাত্রী হয়ত বলবেন, ‘প্রতিদিন এই সময়ে অন্তত ১০টা রিকশা পাই। আজ আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি, একটাও পেলাম না!’
শেষমেষ আপনি হেঁটেই যাচ্ছিলেন। শহরের অভ্যন্তরে ঢুকতেই দেখা যায় আরেক দৃশ্য। নির্মাণাধীন ভবনগুলো নিস্তব্ধ। যেখানে প্রতিদিন শ্রমিকদের ব্যস্ততা থাকে, সেখানে আজ শুধু দাঁড়িয়ে আছে অসমাপ্ত ইট-পাথর। যেন সময় থেমে গেছে।
দুপুর ১২টা। শহরের ব্যস্ততম বাজারে ঢুকলে বোঝা যায় সংকট কতটা গভীর। দোকান খোলা, কিন্তু পণ্য ওঠানো-নামানোর লোক নেই। পাইকারি বাজারে ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মাল খালাস হচ্ছে না। দোকানিরা অস্বস্তিতে। কোনো ব্যবসায়ী তখন বলছিলেন, ‘আমরা ব্যবসা করি ঠিকই, কিন্তু এই শ্রমিকরা না থাকলে একটা বস্তাও সরাতে পারি না।’
দুপুরে খাবারের দোকানেও একই চিত্র। রান্নাঘরে বাবুর্চি ভাই নেই, খাবার পরিবেশনের ওয়েটার নেই। অনেক দোকান আংশিক বন্ধ। ডেলিভারি সেবাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
বিকেল ৪টা। শহরের একটি হাসপাতালে যেতে হলো আপনাকে। চিকিৎসক আছেন, নার্স আছেন, কিন্তু ওয়ার্ডবয় নেই, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই। রোগীর স্বজনরা নিজেরাই অনেক কাজ সামলাচ্ছেন বিছানা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে ওষুধ আনা। তখন রোগীর স্বজনরা বলছিলেন, ‘ডাক্তার চিকিৎসা দেন, কিন্তু এই সাপোর্ট স্টাফ ছাড়া পুরো সিস্টেমই থেমে যায়।’
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শহরের ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাস্তায় ময়লা জমে আছে, আলো জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু অনেক জায়গায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাব চোখে পড়ে। নিরাপত্তাকর্মীর অনুপস্থিতিতে অনেক ভবনের প্রবেশপথ ফাঁকা।
রাত ৯টা। সাধারণত এই সময় শহর তার দ্বিতীয় জীবনে প্রবেশ করে কারখানার নাইট শিফট, রেস্টুরেন্টের ব্যস্ততা, পরিবহন চলাচল। কিন্তু আজ সবকিছু ধীর। কোথাও কোথাও বন্ধ।
একটি গার্মেন্টস কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কর্মকর্তা বললেন,‘আমাদের মেশিন আছে, অর্ডার আছে, কিন্তু কর্মী ছাড়া এগুলো কেবল লোহা।’
এই ‘অদৃশ্য শহর’ আসলে কল্পনা কিন্তু এর প্রতিটি দৃশ্য বাস্তবের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রতিদিন যাদের আমরা দেখি, কিন্তু গুরুত্ব দিই না পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণ শ্রমিক, ড্রাইভার, ডেলিভারি রাইডার, কারখানার কর্মী তাদের ছাড়া শহরের চাকা একদিনও ঘুরতে পারে না। শ্রম শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়; এটি শহরের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত এক নীরব শক্তি। এই শক্তি দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু এর অনুপস্থিতি পুরো ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়।
শ্রমিক দিবসে তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রয়োজন উপলব্ধি। শহরকে সচল রাখার এই মানুষগুলো ‘পটভূমির চরিত্র’ নয়, তারাই আসলে প্রধান চালিকাশক্তি। কারণ, একদিনের জন্য তারা অদৃশ্য হলে পুরো শহরই অচল হয়ে যায়।
- আরও পড়ুন
সদরঘাট: যেখানে প্রতিদিন গড়ে ওঠে হাজারো জীবিকার গল্প
চাকরির পাশাপাশি সাইক্লিং-ম্যারাথনে অনন্য সাফল্য মামুনের
কেএসকে
What's Your Reaction?