এখনো ১০ টাকায় চিকিৎসা মেলে রিকশাচালক জয়নালের হাসপাতালে

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রিকশা চালিয়ে ২০০১ সালে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার টান হাসাদিয়া গ্রামে জয়নাল আবেদীন প্রতিষ্ঠা করেন মমতাজ হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অসহায় মানুষের ভরসাস্থল হয়ে ওঠে এই হাসপাতালটি। নিরক্ষর জয়নাল আবেদিনের একদিন চোখের সামনে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান বাবা। ঠিক তখনই গ্রামে হাসপাতাল গড়ার স্বপ্ন দেখেন জয়নাল আবেদিন। ঢাকা শহরে দিন-রাত রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে সেই স্বপ্নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।  ঘাম ঝরানো উপার্জনের ৪০ হাজার টাকায় ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পরানগঞ্জ ইউনিয়নের টানহাসাদিয়া গ্রামে ২৪ শতাংশ জমি কিনে মেয়ে মমতাজের নামে প্রতিষ্ঠা করেন হাসপাতাল। সেখানে বিনামূল্যে গ্রামের মানুষকে চিকিৎসাসেবার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। জীবদ্দশায় রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে হাসপাতালটি চালাতেন জয়নাল। কিন্তু ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি বার্ধক্যজনিত শারীরিক অসুস্থতায় মারা যান রিকশাচালক জয়নাল আবেদিন।  হাসপাতালটির উদ্যোক্তার মৃত্যুর পর উদ্যোগটি বন্ধ হয়ে যাবে মানুষ চিন্তা করলেও এখনো টিকে আছে হাসপাতালটি। জয়নাল আবেদিন পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তার বাবার নাম ছিল আবদুল গনি। জয়নাল আবেদিন এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছ

এখনো ১০ টাকায় চিকিৎসা মেলে রিকশাচালক জয়নালের হাসপাতালে
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রিকশা চালিয়ে ২০০১ সালে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার টান হাসাদিয়া গ্রামে জয়নাল আবেদীন প্রতিষ্ঠা করেন মমতাজ হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অসহায় মানুষের ভরসাস্থল হয়ে ওঠে এই হাসপাতালটি। নিরক্ষর জয়নাল আবেদিনের একদিন চোখের সামনে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান বাবা। ঠিক তখনই গ্রামে হাসপাতাল গড়ার স্বপ্ন দেখেন জয়নাল আবেদিন। ঢাকা শহরে দিন-রাত রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে সেই স্বপ্নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।  ঘাম ঝরানো উপার্জনের ৪০ হাজার টাকায় ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পরানগঞ্জ ইউনিয়নের টানহাসাদিয়া গ্রামে ২৪ শতাংশ জমি কিনে মেয়ে মমতাজের নামে প্রতিষ্ঠা করেন হাসপাতাল। সেখানে বিনামূল্যে গ্রামের মানুষকে চিকিৎসাসেবার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। জীবদ্দশায় রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে হাসপাতালটি চালাতেন জয়নাল। কিন্তু ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি বার্ধক্যজনিত শারীরিক অসুস্থতায় মারা যান রিকশাচালক জয়নাল আবেদিন।  হাসপাতালটির উদ্যোক্তার মৃত্যুর পর উদ্যোগটি বন্ধ হয়ে যাবে মানুষ চিন্তা করলেও এখনো টিকে আছে হাসপাতালটি। জয়নাল আবেদিন পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তার বাবার নাম ছিল আবদুল গনি। জয়নাল আবেদিন এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর সুইডেনপ্রবাসী ছেলে জাহিদ হাসান হাসপাতালটির হাল ধরেছেন। হাসপাতালটির দেখভাল করেন জয়নাল আবেদিনের ভাতিজা আশিক মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার চাচা এলাকায় সাদা মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত। চাচা মারা যাওয়ার পর হাসপাতালে কোনো অনুদান কোথাও থেকে আসে না। বাবার করা প্রতিষ্ঠান ধরে রাখার জন্য আমার চাচাতো ভাই নিজের অর্থায়নে হাসপাতালটি টিকিয়ে রেখেছেন।’ আশিক মিয়া জানান, আগে প্রতি সপ্তাহে শনি, সোম ও বুধবার সেবা দেওয়া হলেও গত ১ নভেম্বর থেকে সপ্তাহে ৫ দিন (শনি থেকে বুধবার) সেবা দেওয়া হচ্ছে। এখানে প্রতিদিন ৪০-৫০ জন রোগী হয়। ১০ টাকার টিকিটে প্রাথমিক সেবাগুলো দেওয়া হয় এবং ওষুধ দেওয়া হয়। প্রতি মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ হয় সব মিলে। বাবার প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে ছেলেও চেষ্টা করে যাচ্ছে। মানবতা ও মানুষের সেবার জন্যই এটা করে যাচ্ছে। হাসপাতালটিতে মাত্র ১০ টাকার টিকিট কেটে ডাক্তার দেখানো ও বিনামূল্যে ওষুধ পান গ্রামের মানুষ। ডায়াবেটিসও পরীক্ষা করা হয়। এই হাসপাতালে আশপাশের গ্রামগুলো থেকে নানা বয়সী নারী রোগীরাই বেশি আসেন। হাসপাতাল সংলগ্ন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সেটি এখন সরকারি হয়েছে। একটি মসজিদও করেছিলেন তিনি। গত ৭ জানুয়ারি সকালে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ১০টা বাজার আগেই বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারীরা আসতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ এসেছেন শিশুদের নিয়ে। নানা বয়সী এসব রোগী লাইন ধরে হাসপাতালটি থেকে সেবা নেন। এদিন মোট ৪১ রোগী সকাল ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত সেবা নেন। হাসপাতালটি ঘুরে দেখা যায়, আধাপাকা ভবনে মমতাজ হাসপাতালটির জৌলুস অবশ্য কমে গেছে। হাসপাতালের পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডে তিনটি করে বেড রয়েছে। ডায়রিয়া ও অন্য রোগীদের ভর্তি রেখে সেবা দেওয়া হতো শুরুর দিকে। কিন্তু এখন আর ভর্তি রেখে কোনো রোগীর সেবা দেওয়া হয় না। করফুল জান নামে এক নারী বলেন, ‘আমগর এলাকায় অনেক ধনী মানুষ আছে। গেরামের গরিব মানুষের লাগি কেউ তো কিছু করে না। ঢাকা শহর রিকশা চালায়া আমগর লাইগা একটি হাসপাতাল বানাইয়া গেছে জয়নাল, গেরামের মানুষ এখন ওষুধ পায়।’ সেবা নিতে আসা চর সিরতা গ্রামের বাসিন্দা জয়তুন নেছা (৭৭) শারীরিক নানা জটিলতা নিয়ে আসেন সেবা নিতে। তিনি বলেন, ‘আমার হাইপ্রেশার, ডায়াবেটিস ও চলাফেরা করতে হয়রান লাগে। ১০ টেহার টিকিট কাইট্টা ওষুধ নিয়ে খাইয়া বাইচ্চা আছি। ২০ বছর ধইরা এইহান আসি। যদি এই হাসপাতাল না থাকত তাইলে খুব বিপদে পড়তাম।’ রিজিয়া খাতুন বলেন, ‘আমরা চাই গেরামের এই হাসপাতাল যেন আরও ভালো হয়। সাদা মনে গেরামের অনেক উপকার কইরা গেছে। হাসপাতাল করছে, এখান থেকে ওষুধ নিয়ে খাইয়া বাঁইচ্চা রইছে এলাকার অনেক মানুষ।’ অভাবের সংসার থাকায় রিকশাচালক জয়নালের স্ত্রী মোসা. লাল বানু ঢাকায় বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে দীর্ঘ ২৫ বছর আয়া হিসেবে কাজ করেছেন। জয়নাল যখন হাসপাতাল করতে চেষ্টা করেন, তখন স্ত্রী বাধা দেন। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে গ্রামের মানুষের কল্যাণে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। রিকশাচালক জয়নালের স্ত্রী মোসা. লাল বানু কালবেলাকে বলেন, ‘আমার শ্বশুর চিকিৎসার অভাবে মারা যান। বাবার মৃত্যুর কারণে গ্রামের মানুষের কথা ভেবে হাসপাতালটি করেন আমার স্বামী। নিজে রিকশা চালিয়ে মানুষের কাছ থেকে চেয়ে টাকা এনে হাসপাতালটি চালাত। আমাদের জন্য কোনো চিন্তা করত না।’ স্বামী মারা যাওয়ার পর তার ছেলে প্রতি মাসে টাকা পাঠিয়ে হাসপাতালটির খরচ চালিয়ে যাচ্ছে। স্বামী জীবিত থাকাকালে দুটি কোম্পানি মাসে কিছু ওষুধ দিয়ে সহযোগিতা করত। এখন আর সে ওষুধ পাওয়া যায় না। জয়নালের ছোট ভাই মো. দুলাল মিয়া বলেন, ‘আমার ভাই ঢাকায় রিকশা চালিয়ে ওষুধ কিনে এনে গ্রামের মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওষুধ দিত। পরে বাড়ির সামনে জমিতে একটি ঘর করে হাসপাতাল করে। এরপর দেশ-বিদেশের মানুষ এই হাসপাতাল দেখতে আসেন। নিজের সংসার ও দুই সন্তানকে বাদ দিয়ে হাসপাতাল করায় সবাই অবাক হতো। আমার ভাই মারা যাওয়ার পর ভাতিজা এই হাসপাতালটি চালিয়ে নিচ্ছে। গ্রামের মানুষ অনেক উপকৃত হচ্ছে। ১০ টাকার টিকিটে এখানে ১০০ টাকার মতো ওষুধ দেওয়া হয়।’ উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. রায়হান তানভীর কালবেলাকে বলেন, ‘এই হাসপাতালটিতে নারী রোগীরা বেশি আসেন। সাধারণ রোগীদের সেবা দেওয়া হয় এবং জটিল রোগীদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এছাড়া শিশু রোগীদের সেবাও দেওয়া হয়। তবে কোনো রোগী ভর্তি রাখা হয় না।’ এ বিষয়ে ময়মনসিংহের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. ফয়সল আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘মমতাজ হাসপাতাল সম্পর্কে আমার জানা নেই। আমাদের দপ্তরের পক্ষ থেকে মমতাজ হাসপাতালকে সহযোগিতা করার তেমন সুযোগ নেই। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সহযোগিতার জন্য আবেদন করলে হয়তো বিষয়টি মন্ত্রণালয় বিবেচনা করতে পারে।’  

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow