ঐশী কথা বলছে

অফিস মিটিংয়ের মাঝখানে তাসিনের ফোন বেজে উঠলো। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখলো তার স্ত্রী মুনিয়ার কল। ভাগ্যিস ফোনটি সাইলেন্ট করা ছিল, না হলে তো এখনই বসের ঝাড়ি খাওয়া লাগতো। ফোনটি কেটে দিলো কিন্তু মুনিয়া কল দিতেই লাগলো। যতই ফোন কাটে, আবার কল করে যেতে লাগলো। বিরক্ত হয়ে বসের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রুম থেকে বের হলো। ফোন ধরে বিরক্ত হয়ে মুনিয়াকে বলল, ‘সমস্যা কী তোমার! দেখছো না বারবার কলটা কেটে দিচ্ছি। তোমার তো বোঝা উচিত যে, আমি কোনো মিটিং বা কোনো কাজে ব্যস্ত আছি।’ মুনিয়া যেন তাসিনের কথা শুনতেই পারেনি। এমনভাবে ফোনের উল্টো পাশ থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘ওগো শুনছো, আমাদের ঐশী কথা বলছে! আমাদের ঐশী কথা বলছে!’তাসিন যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।‘কী বলছো এসব!’ ‘আরে হ্যাঁ, আজকে আমার মেয়ে কথা বলেছে। তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় এসো। আমি আজকে আমার মেয়ের জন্য তার ফেভারিট মোরগ পোলাও রান্না করবো। আর শোনো, আমি কিছুই জানি না, এই আনন্দের দিনে আজকে দুপুরে আমরা একসাথে খাবো। তুমি যেভাবেই পারো নিজের বস থেকে আধা দিনের ছুটি ম্যানেজ করো।’এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল মুনিয়া। তাসিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো মুনিয়ার কথা শু

ঐশী কথা বলছে

অফিস মিটিংয়ের মাঝখানে তাসিনের ফোন বেজে উঠলো। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখলো তার স্ত্রী মুনিয়ার কল। ভাগ্যিস ফোনটি সাইলেন্ট করা ছিল, না হলে তো এখনই বসের ঝাড়ি খাওয়া লাগতো। ফোনটি কেটে দিলো কিন্তু মুনিয়া কল দিতেই লাগলো। যতই ফোন কাটে, আবার কল করে যেতে লাগলো।

বিরক্ত হয়ে বসের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রুম থেকে বের হলো। ফোন ধরে বিরক্ত হয়ে মুনিয়াকে বলল, ‘সমস্যা কী তোমার! দেখছো না বারবার কলটা কেটে দিচ্ছি। তোমার তো বোঝা উচিত যে, আমি কোনো মিটিং বা কোনো কাজে ব্যস্ত আছি।’
মুনিয়া যেন তাসিনের কথা শুনতেই পারেনি। এমনভাবে ফোনের উল্টো পাশ থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘ওগো শুনছো, আমাদের ঐশী কথা বলছে! আমাদের ঐশী কথা বলছে!’
তাসিন যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
‘কী বলছো এসব!’
‘আরে হ্যাঁ, আজকে আমার মেয়ে কথা বলেছে। তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় এসো। আমি আজকে আমার মেয়ের জন্য তার ফেভারিট মোরগ পোলাও রান্না করবো। আর শোনো, আমি কিছুই জানি না, এই আনন্দের দিনে আজকে দুপুরে আমরা একসাথে খাবো। তুমি যেভাবেই পারো নিজের বস থেকে আধা দিনের ছুটি ম্যানেজ করো।’
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল মুনিয়া। তাসিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো মুনিয়ার কথা শুনে গেল। তারপর শুধু বলল, ‘আমি আসছি।’

ততক্ষণে তাসিনের চোখের কোণে পানি জমে গেছে। এক দৌড়ে বসের কাছে গিয়ে বলল, ‘বস আমার বাসায় যেতে হবে।’
বস তাসিনের চোখে পানি দেখে বলল, ‘অ্যানিথিং সিরিয়াস তাসিন?’
তাসিন হেসে বলল, ‘বস! খুব সিরিয়াস, খুব সিরিয়াস। আজ আমি যাই।’ বলেই বসের অনুমতির জন্য অপেক্ষা না করে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল।

আজকে বাসায় যাওয়ার তর সইছে না। তাসিন মনস্থির করলো লোকাল বাসের জন্য অপেক্ষা করবে না। কতক্ষণে লোকাল বাস আসবে আর কতক্ষণে বাসায় যাবে। আজ একটু দ্রুত যেতে সিএনজিতে চড়ে বসলো। উঠেই ড্রাইভারকে বলল, ‘ভাই আমাকে দ্রুত ধানমন্ডি-২৭ নিয়ে চলেন।’
ড্রাইভার একটু উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাইজান কোনো জরুরি কিছু?’
তাসিন হালকা হেসে বলল, ‘জ্বি, আমার জীবনের অন্যতম জরুরি কিছু!’
তাসিনের উত্তর শুনে ড্রাইভার আশ্বস্ত হয়ে স্টার্ট দিলো। তাসিনের মাথায় শুধু চলতে লাগলো, তার মেয়ে ঐশী কী বলছে? কীভাবে বলছে? মুনিয়া কিভাবে নিজেকে সামলাচ্ছে? শত চিন্তা তাসিনের মাথায়। অপেক্ষা শুধু বাসায় পৌঁছানোর।

এ বছর মার্চে তাসিন আর মুনিয়ার বিয়ের পনেরো বছর হলো। যদিও প্রেমের বিয়ে। তাই দুই পরিবার মানতে একটু নারাজ ছিল। তাসিন মুনিয়ার সমবয়সী হওয়ায় তাসিনের মা রানু বেগমের এ বিয়েতে ঘোর আপত্তি ছিল। কিন্তু একমাত্র ছেলের জোরাজুরির কাছে তিনি হার মেনে ছিলেন। তার ওপর বিয়ের সাত বছর পর্যন্ত যখন তাদের সন্তান হচ্ছিলো না; তখন রানু বেগমের খোটার কাছে মুনিয়াকে প্রায় জর্জরিত হতে হতো। যদিও এটাও স্বীকার করতে হবে, সাত বছর অনেক চেষ্টার পর যখন সুখবর এলো; তখন তাসিন-মুনিয়ার পর যদি কেউ সবচেয়ে বেশি খুশি হয়ে থাকে তবে তা রানু বেগম।

মুনিয়ার গর্ভকালে সব সময় পাশে থেকে খেয়াল রেখেছেন শাশুড়ি। অনেক চেষ্টার ফসল তাদের এই সন্তান। ঐশীর জন্মের পর থেকে এ শিশুর আদরে কোনো কমতি রাখতো না রানু বেগম। তাসিন আর মুনিয়ার চোখের মণি ঐশী। কিন্তু মেয়ের বয়স তিন-চার হতেই তাসিন আর মুনিয়া খেয়াল করলো তাদের মেয়ের অস্বাভাবিকতা। কথা বলতে পারছে না। আনমনা হয়ে অন্যদিকে চেয়ে থাকে। হঠাৎ করেই খিলখিল করে হেসে ওঠে। আবার হাততালি দেয়। তাসিনের গ্রামের বাড়ির লোকেরা তো বলেই দিলো, ‘যেমন পরির মতো সুন্দরী মেয়ে, নিশ্চিত জিনে ধরেছে।’ তাই রানু বেগমের অনুরোধে কত ফকির-ওঝাকে দেখালো। তবুও ঐশী ঠিক হলো না। একসময় বাধ্য হয়ে মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে নিশ্চিত হলো ঐশী মানসিক প্রতিবন্ধী। তাসিন মুনিয়া যেন কেউই সত্যটা মানতে পারল না। তাসিন তো একদমই পারলো না।

যে মেয়েটা তার জান। সাত বছর পর যে অমূল্য রত্ন পেলো। সে কীভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী হয়? চোখের সামনে তার অদুরে মেয়ের এমন অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে তাসিন অন্ধকার সত্যকে মানতে বাধ্য হলো। যদিও এ সত্য তাসিনকে তার মেয়ের থেকে দূরে নিয়ে যেতে লাগলো। এক সময়ের তার কলিজার টুকরোকে এখন তাসিনের দু’চোখের বিষ লাগে। তাসিনের মন চায়, মেয়েটাকে এক ঘরে বন্ধ করে রাখতে। যদিও তাসিন নিজেও নিজেকে সামাজিকভাবে বন্ধ করে রেখেছে। না কোনো আত্মীয়ের বাড়ি, না বন্ধুদের আড্ডায়; এমনকি অফিসের পিকনিকেও যায় না। আগে যেত, প্রতি সপ্তাহে কোনো না কোনো আত্মীয়ের বাড়ি অথবা বন্ধুর সাথে ধানমন্ডিতে আড্ডা, তাসিনের সাপ্তাহিক রুটিন ছিল। এমনকি ঐশী হওয়ার পর মেয়েকে নিয়ে ঘুরতেও গেছে।

যখন থেকে মেয়ের অস্বভাবিকতা ধরা পড়ল আর আশেপাশের মানুষজন মেয়েকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে কিংবা তার কাছে এসে সহানুভূতি প্রকাশ করে, তাসিনের কাছে এসব বিরক্ত লাগে। তাই সেসব বাদ দিতে লাগলো। যদিও মুনিয়া তাকে অনুরোধ করেছিল যেতে। ঐশীকে নিয়ে মুনিয়া বাসায় থাকবে। তবুও তাসিন যায়নি। সে নিজেকে সবকিছু থেকে আলাদা করে নিলো। শুধু অফিস থেকে বাসা আর বাসা থেকে অফিস। এমনকি রাতে ঘুমানোর সময় ঐশী বিরক্ত করে তাই তাসিন আলাদা একটি ঘরে ঘুমায়। ঐশী যখন অনবরত চিৎকার করে হেসে ওঠে কিংবা হাততালি দেয়; তখন তাসিনের বিরক্তি চরম পর্যায়ে চলে যায়।

বিরক্তি থেকে শুরু হলো প্রতিনিয়ত ধমক দেওয়া। এমনকি কয়েকবার মুনিয়ার অজান্তে মেয়ের গায়ে হাতও তুলেছে। সত্য কথা বলতে ইচ্ছা করে তোলেনি। সারাদিন অফিস শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন বাসায় ফেরে, বিল্ডিংয়ের নিচ থেকে মেয়ের চিৎকার-চেচামেচি শোনা যায়। প্রতিবেশীরা যখন তার মেয়েকে নিয়ে কানাঘুষা করে, হাসাহাসি করে; তখন যেন মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে যায়। দুদিন পরপর রানু বেগমের অভিযোগের লিস্ট চলতেই থাকে। ‘তোর পাগলি আজ এই করছে, সেই নষ্ট করেছে।’ আরও কত কী! তাসিন বুঝে গেছে এই মেয়ে তার সারাজীবনের বোঝা। তাই ব্যর্থ আশা রেখে বিন্দুমাত্র লাভ নেই। তাই এই দুর্ভাগ্যের কাছে নিজেই হার মেনে নিয়েছে সে।

হার মানেনি মুনিয়া। যেদিন ডাক্তার তার মেয়েকে মানসিক প্রতিবন্ধী ঘোষণা করলো, তার পরের কয়েকটা দিন মুনিয়ার মন খুব খারাপ ছিল। ঘরের কোণে বসে ফুপিয়ে কেঁদেছে। একদিন তাসিন অফিস থেকে এলে মুনিয়া তাকে শান্ত চোখে জানিয়ে দেয়, মুনিয়া আর চাকরি করবে না। বরং এ সময়টা সে তার মেয়েকে দেবে। যদিও তাসিন বুঝিয়ে ছিল যে কাজের মেয়ে আছে ঐশীকে দেখার, দরকার হলে আরও একজন রাখবে তারা। তার ওপর চাকরির এই আকাল বাজারে একবার চাকরি ছাড়ালে আরেকটা পেতে খুব কষ্ট হবে। কিন্তু মুনিয়ার সেই একটা উত্তর তাসিনের যুক্তিকে হার মানিয়ে দিলো, ‘যে খেয়াল একটি মা তার সন্তানের রাখতে পারে, তা অন্য কেউ পারে না।’

পরের মাস থেকে ঠিকই মুনিয়া তার চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোটা সময় তার মেয়ের পেছনে দিতে লাগলো। কোথায় ভালো স্পেশাল শিশুদের স্কুল পাওয়া যায়, কোথায় অটিস্টিক বাচ্চাদের ভালো থেরাপি দেওয়া যায়। দিন থেকে রাত মুনিয়ার যেন সেই একটাই কাজ। এমনকি ঐশী কখন কী খাবে, কী খেলে ঐশী আরও উত্তেজিত হয়ে পড়বে। সেসব মেনে বাসার বাজার ও রান্নাবান্না সেই-ই করে। ঐশী মিষ্টি জাতীয় কিছু খেলে বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়বে। তাই মুনিয়ার সবচেয়ে পছন্দের পেস্ট্রি কেক গত ৬ বছর তাদের বাসায় আনা হয় না। মাঝখান থেকে মা-আত্মীয়দের জোরাজুরিতে তাসিন মুনিয়াকে বলছিল যে, আমরা আরেকটা সন্তান নেই। তখন মুনিয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছিলো, এখন নয়। কারণ এখন আরেক সন্তান এলে ঐশীর ঠিকমতো খেয়াল রাখা হবে না। তখন তাসিন জেদের বশে বলেই ফেলেছিলো, ‘ঐশী তো পাগল, যে কোনোদিন ভালো হবে না। তাহলে কি আমরা আর কোনো দিন বাচ্চা নেবো না?’ মুনিয়া মুখ শান্ত করে চোখ ছলছল করে বলে দিলো, ‘তুমি চাইলে স্বাচ্ছন্দে আরেকটি বিয়ে করতে পারো, কিন্তু আমার জীবনে এখন শুধুই ঐশী। আরেকটি কথা, আমার মেয়েকে পাগল আর কখনো বলবে না। ও একটা স্পেশাল চাইল্ড আর আমি ওর স্পেশাল মা।’ বলেই রুম থেকে বের হয়ে গেল।

পরদিন মুনিয়া তার বাবার বাড়ি চলে যায়। এসময় তাসিনের মা তাকে অনেক করে বোঝায়, যেন মুনিয়াকে তালাক দিয়ে আরেকটি বিয়ে করে। তবে তাসিন জানে, তার এ জীবনে মুনিয়াকে ছাড়া চলবে না। মুনিয়া নিজে চাকরিজীবী হয়েও তখন বেকার তাসিনকে বিয়ে করেছিল সবার বিরুদ্ধে গিয়ে। পুরো দেড় বছর সংসার চালিয়েছে। কিন্তু তাসিনকে সংসারের কোনো অভাব বুঝতে দেয়নি। হাসিমুখে হাত ধরে রেখেছে, সাহস জুগিয়েছে কঠিন সময়ে। তাই আজ যেহেতু মুনিয়া ঐশীর হাত ধরেছে, তাসিন ভালো করেই জানে তা আর কখনো ছাড়বে না। এমনকি তাসিন নিজেও মুনিয়াকে ছাড়তে পারবে না। একমাস পর, অনেক অনুরোধের পর তাসিন মুনিয়াকে বাসায় নিয়ে আসে। যদিও এরপর থেকে তাদের দুজনের কথাবার্তা অনেক কমে যায়। দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঐশীর মানসিক প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর। সেই প্রাচীরে চিড় ধরিয়ে আজ অনেকদিন পর তাসিনকে ফোন করেছে মুনিয়া। তাই বাসায় গিয়ে আট বছর পর নিজের মেয়ের মুখে কথা শুনতে, অনেকদিন পর নিজের বউয়ের হাসিমাখা মুখ দেখতে তর সইছে না। ঐশীর বয়স আট কিন্তু এখনো ঐশী কোনো কথা বলতে পারে না। স্পেশাল স্কুলের টিচাররা এবং থেরাপির ডাক্তাররা বলেছে, হবে আস্তে আস্তে হবে। সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে মুনিয়াও মনে করে, ও কথা বলবে একদিন। তবে তাসিন এতদিন ভেবেছে, এটা শুধু মিথ্যা আশা। আজ মনে হচ্ছে, মুনিয়ার এতদিনের কষ্টের ফসল সত্যি হতে যাচ্ছে। তাসিনের কেমন যেন নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।

তাসিন সিএনজিটি তার বাসার দুই গলি আগে রেখে নেমে গেল। সেখান থেকে মুনিয়ার পছন্দের ফ্লেভারের কেক কিনলো। কারণ গত ছয় বছর ধরে মুনিয়া কেক খায় না। তবে আজ তো খেতেই হবে। না খেলে তাসিন জোর করে খাইয়ে দেবে। তাসিন দুবার গেটে কলিং বেল বাজাতেই মুনিয়া ছুটে এসে দরজা খুলে দিলো। আবারো ফোনের মতো চেচিয়ে বলতে লাগলো, ‘শুনছো আমাদের ঐশী কথা বলছে। আমাদের ঐশী কথা বলছে।’ মুনিয়া তাসিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে ঐশীর রুমে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে দেখলো মেয়ে আপন মনে খেলছে। মুনিয়া ঐশীকে টেনে এনে বলল, ‘ঐশী মা, ডাকো তো। বলো মা, মা।’ তাসিন অবাক চোখে চেয়ে আছে। ভাবছে এ কী হচ্ছে। হঠাৎ দেখলো, ঐশী ঠোঁটটা গোলাকৃতি করে একবার বলে উঠলো, ‘মা, মা।’ বলেই আবার নিজের স্বভাবমতো চিৎকার করে লাফাতে লাগলো, হাততালি দিতে লাগলো। ‘তুমি দেখেছো, এই যে মা বলল। দুইবার মা বলল।’ মুনিয়ার উচ্ছাসের যেন কমতি নেই। তাসিন অবাক হয়ে শুধু বলল, ‘শুধু এই একটি কথাই বলছে? আর কিছুই বলছে না?’ মুনিয়া হেসে বলল, ‘আরে বোকা! বাচ্চারা কি প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়বে? ওদের কথা শুরুই তো হয় মা-বাবা, দাদা এসব বলে। দেরীতে হলেও আমাদের ঐশী কথা বলা শুরু করেছে। আমার যে কত ভালো লাগছে। কেমন যেন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, যেন কোনো কিছু থেকে আমি মুক্ত হয়ে গেছি। তোমাকে আমি বোঝাতে পারবো না।’

তাসিন দেখলো মুনিয়া হেসে হেসে কথা বলছে কিন্তু সেই সঙ্গে চোখ থেকে পানিও পড়ছে। যেন বিশ্বজয় করে ফেলেছে। এবার তাসিনের হাতে কেক দেখে মুখ আবার চেচিয়ে বলল, ‘তুমি কেক এনেছো। জানো আজ আমিই তোমাকে বলতাম কেক আনার জন্য। আজ মন ভরে আমি আর আমার মেয়ে কেক খাবো। আচ্ছা! শুনো, রান্না হতে দেরী হচ্ছে। বাসায় গ্যাস কম আসছে। চুলা আস্তে জ্বলছে, তাই খাবার হতে কিন্তু দেরী হবে।’
‘তাহলে বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করি?’
‘একদমই না। আজ আমার মেয়ের জন্য আমিই রান্না করবো। তা যত দেরীই হোক। বুঝলে? যাও এবার চট করে গোসল করে নাও। যাও।’
তাসিন কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকালো। ঐশী ওর দিকে তাকিয়ে আবার একবার ‘মা’ বলে আবার অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

তাসিন নিজের রুমে ঢুকতে যাবে এমন সময় মায়ের রুম থেকে ডাক এলো, ‘খোকা একটু শুনে যা!’ তাসিন বুঝে গেলো তার মায়ের প্রতিদিনের অভিযোগের লিস্ট শোনাবে। তাসিনও এক কান দিয়ে শোনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়। মায়ের রুমে ঢুকতে দেখে মা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।
‘ক্যামন আছো মা?’ তাসিন তার প্রতিদিনের কথা দিয়ে শুরু করলো।
‘তোরা আর ভালো থাকতে দিলি কই?’ বলতে বলতে উঠে বসলো রানু বেগম।
‘তোদের এই পাগলামি কি কখনো যাবে না? আগে তো মেয়ে পাগলামি করতো, আজকে দেখছি মেয়ের সাথে সাথে মাও পাগলামি শুরু করে দিসে। আট বছরের মাইয়া মা বলসে। তাতে সে একবার কাঁদে আবার হাসে। এইসব পাগলামির কোনো মানে হয় খোকা? ভেবেছিলাম তোদের বিয়ের ঘরে একটা সন্তান আসলে আমার ঘরে আলো জ্বলবে। ফুটফুটে বাচ্চার হাসিতে-কথাতে আমার মনটা ভরে উঠবে, ওর সাথে সারাদিন গল্প করবো। কিন্তু হলোটা কি? আল্লাহর কি নির্মম পরিহাস। এত বছর পর বাচ্চা হলো, তা-ও একটা পাগল। সারাদিন তালি দেয়, হঠাৎ করে কী করে তাকিয়ে থাকে, কথা বলে না। আবার এটা সেটা ভাঙে। ঘরে থাকলে বেশিরভাগ সময় শুধু চিৎকার-চেঁচামেচি। প্রতিবেশী কারো সাথে মুখ দেখানোর মতো অবস্থা কি রেখেছে? তুই বল, শেষ কবে তুই কোন আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিস? জিজ্ঞেস করলে শুধু বলিস, তোর ভালো লাগে না কিন্তু আমি তোর মা। আমি কি বুঝি না, তুই কেন যাস না? আমি জানি, তোর মেয়েকে নিয়ে গেলেও সে ওইখানে পাগলামি করবে আর তোর মান-সম্মানহানি হবে। এর জন্য তুই যাস না। কিন্তু খোকা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় তো যেতে হয়। না হলে আজ আমি মরে গেলে কাল কোনো আত্মীয় কেউ তোরা চিনবি না।’

তাসিন বসে কেবল শুনছে। কোনো কথা বলছে না। তার মা একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমি বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছি তোদের দুই জামাই-বউকে যে, একটা হলো পাগল। তোরা আরেকবার একটা সন্তান নিয়ে নে। কিন্তু না! মুনিয়ার তো ওই একই উত্তর, আর একটা সন্তান নিলে নাকি এই বাচ্চার প্রতি খেয়াল কমে যাবে। আরে বাবা! খেয়াল করার আছেটা কি এই মেয়ের? এ তো সারাজীবন এমন থাকবে। তাই বলে কি সারাজীবন তোরা এর পেছনে ছুটবি? মুনিয়া কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই সাথে তুইও বউয়ের গোলাম হয়ে সেই সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিয়েছিস। তুই কি কিছু বলতে পারিস না? আমি কিন্তু চাইলেই তোর ছোট বোনের কাছে বিদেশে যেয়ে থাকতে পারি। কিন্তু থাকি না কারণ তুই জানিস আমি তোকে কত ভালোবাসি আর তুই বিপদের জালে পড়েছিস, তোকে আমি ছেড়ে যাই কীভাবে? আমি জানি, আমি প্রত্যেকবার এই কথা বলি আর তুই শুনে চুপচাপ রুম থেকে বের হয়ে যাস। আমার কথা একটু গ্রাহ্য করিস না। প্লিজ কিছু বল খোকা! আমিও জানতে চাই, তোর মনের কথা। মা হয়ে কি আমার এতটুকু অধিকার নেই?’

প্রত্যেকবার তাসিন মায়ের কথা শেষ হলে মাথা নিচু করে উঠে চলে যায় কিন্তু আজ কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর একটি বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলা শুরু করলো, ‘মা! তোমার কি মনে আছে আমি ক্লাস টুয়ের বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করেছিলাম। পরে বাবার অনুরোধে আমাকে খুব কষ্টে বিশেষ বিবেচনায় পাস করা হয়েছিল।’ তাসিন দেখলো তার মায়ের ঠোঁটের কোনায় হালকা হাসি ফুটে উঠলো। তাসিন আবার বলা শুরু করলো, ‘মনে আছে মা! শুধু ক্লাস টু না ক্লাস থ্রি এমনকি ক্লাস ফোরের বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করলাম। যেই পরীক্ষাই দিতাম, আমি শুধু ফেল করতাম। পড়ালেখা আমার মাথায় কেন জানি ঢুকতো না। বাবা কতবার বেল্ট দিয়ে আমাকে মারতে আসতো কিন্তু তুমি প্রতিবার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে যেতে। এমনকি আমার ভাগের কিছু পিটুনি তুমি নিজেও খেতে। প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন আমাকে কত গাল-মন্দ করতো, আমি গাধা, আমার মাথায় গোবর, আমার মাথায় ঘিলু নাই। আরও কতো কী? আত্মীয়-স্বজনের বাসায় গেলে তারা আমাকে কত খোঁটা দিতো। তার জন্য আমি কারো বাসায় যেতে চাইতাম না। তুমি তা নিজ থেকে বুঝতে পারলে। শেষ পর্যন্ত তুমিও আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাওয়া বন্ধ করলে। কেউ যদি আমার সম্পর্কে কিছু খারাপ বলতো, তুমি তৎক্ষণাৎ আমাকে আগলে তার সাথে তর্ক করতে। তুমি বলতে, আমার খোকা একটু পরে শিখবে কিন্তু ভালো করে শিখবে। মনে আছে মা?’

রানু বেগম এবার স্নেহভরা চোখে তাসিনের দিকে চেয়ে বলে, ‘মনে থাকবো না কেন রে খোকা! সেই বছরগুলো আমার ছেলের ওপর দিয়ে যা গেছে; তখন মা হিসেবে আমি পাশে থাকবো না তো কে থাকবে বল? আমি জানতাম তুই ভালো করবি, আর দেখ সেই ক্লাস ফাইভ-সিক্স থেকে শুরু করে তুই সব ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করেছিস।’

‘এখন মা’... মায়ের কথা কেটে দিয়ে তাসিন আবার বলা শুরু করলো, ‘এখন মা, তুমি বলো খোকা যেমন তোমার সন্তান; ঐশী কি মুনিয়ার সন্তান না? আমি তো শুধু তিন বছর ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারিনি। এর জন্য তুমি আমাকে এতটা আগলে রেখেছো। আর আমার সন্তান আমার ঐশী চিরদিন দুনিয়ার কিছুই বুঝবে না, তার ভেতরে কী চলছে তা তো আমরা কিছুই জানি না। বলো তাহলে সেই সন্তানকে আগলে রাখার দায়িত্ব কি আমাদের না?’

তাসিন বলতে থাকলো, ‘তোমার মনে আছে, যখন কেউ খোঁটা দিতো আমাকে অথবা বাবা মারতে আসতো, আমি কাথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে কান্না করতাম। তুমি সেটা বুঝতে পারতে এবং আমাকে জড়িয়ে ধরে নানা রকম সান্ত্বনা দিতে কিন্তু তোমার সেই পাগল নাতনি মানে আমার মেয়ে ঐশীর কথা চিন্তা করো, এই মেয়েটাকে যদি কেউ মারে, এমনকি বিরক্ত হয়ে বাবা হিসেবে আমিও মেরেছি সবার অজান্তে। তুমি হয়তো কোনোদিন হাত তুলেছো অথবা স্কুলে গেলে অনেকেই মারে কিন্তু দেখো ও কাউকে কিছু বলতে পারে না। ও যখন স্কুল থেকে আসে কিংবা ঘরে যখন আসে; তখন ওর শরীরে, হাতে-পায়ে নানা রকম দাগ দেখা যায়। কিন্তু ও কাউকে কিছু বলতে পারে না। তখন বাবা-মা হিসেবে আমাদের কতটা অসহায় লাগে, তা কখনো ভেবে দেখেছো?’

তাসিন চোখের জল মোছে। তারপর আবার বলে, ‘বাবা হিসেবে আমি এমন কী করতে পেরেছি? যত্ন তো দূরের কথা, যখনই পেরেছি নিজের রাগ মেয়ের ওপর ঝেড়েছি। যেখানে আমার মেয়ের হাত সবচেয়ে বেশি সময় আমার ধরার কথা, সেখানে তার হাত তো ছেড়ে দিয়েছিই; উল্টো আমার হাত ধরতে এলে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি।’
রানু বেগম দেখলো তার ছেলে কথা বলতে বলতে চোখ দিয়ে টপটপ পানি পড়ছে। ‘ভাগ্যিস! আমার মেয়ের শত জনমের ভাগ্য যে সে মুনিয়ার মতো মা পেয়েছে। যে সব সময় আমার মেয়ের দুর্বল হাত শক্ত করে ধরে তাকে আগলে রেখেছে। এই যে আমার মেয়ের জন্মের আট বছর তাকে নিয়ে কত কষ্ট, কত দৌড়াদৌড়ি করেছে। তবে আমি একদিনের জন্যও আমার মুনিয়ার চোখে পানি দেখিনি, উল্টো তার চোখে দেখেছি সাহস। মুনিয়া যখন তার মেয়ের মুখে প্রথমবার ‘মা’ শুনলো; তখন আমি দেখলাম সে এই খুশির সংবাদ বলতে গিয়ে ঝরঝর করে কান্না করে দিলো। সত্যি বলতে আমি অফিস থেকে তাড়াহুড়ো করে যখন বাসায় ফিরি; তখন তার এই ছোট্ট ঘটনা নিয়ে আমার খুব মেজাজ গরম হয়েছিল। কিন্তু আমি যখন মুনিয়ার চোখের দিকে তাকাই; তখন বুঝতে পারি, তারই এতদিনের কষ্ট-সাধনা হয়তো কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। আর তখন নিজেকে সবচেয়ে ছোট মনে হয়েছে। হয়তো মুনিয়ার মতো আমিও যদি অথবা তুমিও যদি ঐশীর হাতটা শক্ত করে ধরে আগলে রেখে তার সাথে চলতাম, তাহলে হয়তো মা ডাকের সাথে সাথে সে বাবা এমনকি দাদাও বলা শিখে যেত।’

তাসিন দেখলো তার মা মাথা নিচু করে ছেলের সব কথা শুনছে। তাসিন উঠে মায়ের রুমের দরজার কাছে গিয়ে আবার দাঁড়ালো। এরপর বললো, ‘মা আমি গোসলে যাচ্ছি। গোসল থেকে ফিরে ঐশীর জন্য কেক কাটা হবে। তারপর সবাই মিলে ধুমধাম করে খাওয়া-দাওয়া করবো। আশা করি তুমি তোমার নাতনির এই খুশির দিনে তার সাথেই থাকবে।’ বলেই চলে গেল।

আজ একটু সময় নিয়ে তাসিন গোসল করছে। যেন ঝরনার প্রতিটি ফোটা তাহসিনকে ঐশীর প্রতি অবহেলার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এমন সময় মুনিয়ার গলা শোনা গেল, ‘কি! তোমার হলো? এদিকে কিন্তু আমরা সবাই রেডি। বিছানার ওপর কিন্তু তোমার নতুন জামা-কাপড় রাখা আছে। বেরিয়ে এসে তা-ই পড়বে।’
আজ একটু বেশিক্ষণ ধরে গোসল করলো তাসিন। গোসল থেকে বের হয়ে ড্রয়িং রুমে যেতেই দেখে, তার মা কেক সামনে নিয়ে একটা ইস্ত্রি করা শাড়ি পরে বসে আছে। তাসিনকে দেখেই বলল, ‘যা সুন্দর দেখে একটা জামা পরে আয়। মুনিয়া আর ঐশীও সাজতে গেছে। জলদি যা।’ তাসিন হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল।

প্রতিবেশীরা আজ খুব অবাক। কারণ আজ পাগল ঐশীর বাসা থেকে প্রচুর হাসাহাসির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এতদিন তো শুধু ঐশী আর তার মা মুনিয়ার শব্দ শোনা যেত। তবে আজ তাসিনেরও কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে রানু বেগমের হাসির শব্দ। সবার মুখে একটাই কথা ‘মা’।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow