কপোতাক্ষ তীরে বঞ্চনার ইতিহাস, মধুকবির স্মৃতি আগলে রেখেছে সাগরদাঁড়ি
সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে, সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে...। ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার মাধ্যমে দেশাত্মবোধক চেতনার নতুন মাইলফলক স্থাপন ও বাংলা সাহিত্যের অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবক্তা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটা যশোরের সাগরদাঁড়ি। কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে ঐতিহাসিক এই দত্তবাড়ি ঘিরে গড়ে ওঠা মধুপল্লী দেখতে সারাদেশ থেকেই দর্শনার্থীরা আসেন। তাই আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে এবং পর্যটক টানতে ‘মধুপল্লী কমপ্লেক্স’ তৈরির দাবি রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ভাবনায়ও রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। যশোর শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটা। সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি, মধুসূদন জাদুঘর, লাইব্রেরি ও সাগরদাঁড়ি পর্যটন কেন্দ্র এসব মিলিয়ে মধুপল্লী। মধুসূদন দত্তের বাড়ি সংলগ্ন রয়েছে সেই বিখ্যাত কপোতাক্ষ নদ। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর মধুসূদন দত্তের দ্বিতল বাড়িটি পুরাকীর্তি হিসেবে চিহ্নিত। আরও পড়ুন- যেখানে আজও জীবন্ত অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলার স্মৃতিতাজহাটের প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে গোপন গল্পনদীগর্ভে যেতে বসেছে ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি জাদু
সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে, সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে...। ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার মাধ্যমে দেশাত্মবোধক চেতনার নতুন মাইলফলক স্থাপন ও বাংলা সাহিত্যের অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবক্তা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটা যশোরের সাগরদাঁড়ি।
কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে ঐতিহাসিক এই দত্তবাড়ি ঘিরে গড়ে ওঠা মধুপল্লী দেখতে সারাদেশ থেকেই দর্শনার্থীরা আসেন। তাই আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে এবং পর্যটক টানতে ‘মধুপল্লী কমপ্লেক্স’ তৈরির দাবি রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ভাবনায়ও রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
যশোর শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটা। সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি, মধুসূদন জাদুঘর, লাইব্রেরি ও সাগরদাঁড়ি পর্যটন কেন্দ্র এসব মিলিয়ে মধুপল্লী। মধুসূদন দত্তের বাড়ি সংলগ্ন রয়েছে সেই বিখ্যাত কপোতাক্ষ নদ। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর মধুসূদন দত্তের দ্বিতল বাড়িটি পুরাকীর্তি হিসেবে চিহ্নিত।
আরও পড়ুন-
যেখানে আজও জীবন্ত অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলার স্মৃতি
তাজহাটের প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে গোপন গল্প
নদীগর্ভে যেতে বসেছে ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর
প্রতিবছর জানুয়ারিতে মধুমেলা ঘিরে মধুকবির জন্মভিটা দেখতে সারাদেশ থেকে দর্শনার্থীরা সাগরদাঁড়িতে আসেন। তাই সাগরদাঁড়িকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করতে বেশকিছু দাবি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম মধুপল্লী কমপ্লেক্স গড়ে তোলা।
মধুসূদন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা উপ-পরিচালক ও স্থানীয় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোতাহার হোসাইন জানান, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটা ঘিরে মধুপল্লী কমপ্লেক্স স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। কমপ্লেক্সের মধ্যে পর্যটকদের জন্য আবাসন, হোটেল-মোটেল, অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি, শিশুদের কর্নার, অত্যাধুনিক মঞ্চসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। এছাড়া মধুসূদন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়, মধুসূদন একাডেমিকে কার্যকর করতে হবে। তাহলে মধুপল্লী পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠবে।
খুলনা থেকে সপরিবারে সাগরদাঁড়িতে ঘুরতে আসা শফিকুল ইসলাম জানান, সাগরদাঁড়িতে থাকা খাওয়ার ভালো জায়গা নেই। আশপাশের এলাকা থেকে এলে সকালে এসে বিকেলে চলে যাওয়া যায়। কিন্তু দূর থেকে এলে তাদের যশোর বা খুলনা শহরে থাকতে হয়। যা পর্যটকবান্ধব নয়।
সাতক্ষীরার তালা থেকে ঘুরতে আসা কলেজছাত্রী আসমা খাতুন বলেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও কপোতাক্ষ নদ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কবির জন্মভিটার পাশের সেই নদ এখন মৃতপ্রায়। এই নদ সংস্কারের পাশাপাশি এখানে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে একটি ব্রিজ নির্মাণ করা যেতে পারে। তাতে সাতক্ষীরার সঙ্গে যোগাযোগ যেমন সহজ হবে, তেমনি মানুষজন ব্রিজে এসে কপোতাক্ষ নদকে উপভোগ করতে পারবেন।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা থেকে সাগরদাঁড়ি ঘুরতে যাওয়া ইসমাইল হোসেন বলেন, মধুকবির বাড়ি ঘুরে দেখেছি। মূল ভবনের কিছু কিছু জায়গায় সংস্কার দরকার। এছাড়া এই ক্যাম্পাসের পরিসর বড় করতে হবে। আর এখানে নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আশপাশে কিশোর গ্যাং-উঠতি বয়সি ছেলেরা রয়েছে। এরা সুযোগ পেলেই চুরি-ছিনতাই করে।
সাগরদাঁড়ি মাইকেল মধুসূদন দত্তবাড়ির সহকারী কাস্টোডিয়ান মো. হাসানুজ্জামান জানান, দত্তবাড়িটি মাত্র ছয় একর জমিতে প্রতিষ্ঠিতি। এর ক্যাম্পাস বড় করা দরকার। সেক্ষেত্রে উত্তরদিকে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। সেটি সম্ভব হলে এই ক্যাম্পাসকে ঘিরে মধুপল্লী কমপ্লেক্স করা যেতে পারে। এতে সাগরদাঁড়ি আরও দর্শনার্থীবান্ধব হয়ে উঠবে। এছাড়া মূলভবনের কিছু সংস্কার কাজ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, পুকুরঘাট বাঁধানো, গাছগুলোকে ঘিরে বসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি কবির আঁতুরঘরকে ঘিরে নান্দনিক স্থাপনা বা অবকাঠামো তৈরি করে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলারও সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন-
জীর্ণ ভবনের স্যাঁতসেঁতে ঘরে শত বছরের ইতিহাস
বেশিরভাগ সময় গেটে ঝোলে তালা, আসে না পাঠক
বরেন্দ্র জাদুঘরের ১৭ হাজার নিদর্শনের ১৬ হাজারই গুদামবন্দি
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মো. মহিদুল ইসলাম জানান, চলতি অর্থবছর মধুপল্লীতে বেশকিছু সংস্কার কাজ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরও কিছু কাজ হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যরা রয়েছে। এছাড়া মধুপল্লীকে ঘিরে কমপ্লেক্স তৈরি করতে একটি প্রকল্প ভাবনা রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে মধুকবির জন্মভিটা ঘিরে পর্যটকদের পদচারণা আরও বৃদ্ধি পাবে।
সাগরদাঁড়ির ইতিহাস
ইতিহাস অনুযায়ী, মাইকেল মধুসূদন ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দ ২৫ জানুয়ারি কেশবপুর উপজেলার সাগরদাড়ী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দত্তবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৩০ সালে এই বাড়ি ছেড়ে কলকাতার খিদিরপুর চলে যান তিনি। ১৮৬২ সালে কলকাতায় থাকাকালীন মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে নিয়ে নদীপথে আবার আসেন সাগরদাঁড়িতে। যখন তিনি সপরিবারে এখানে এসেছিলেন তখন ধর্ম পরিবর্তনের কারণে জ্ঞাতিরা তাকে এই বাড়িতে উঠতে দেননি। পরে তিনি কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী এক কাঠবাদাম গাছের তলায় তাঁবু খাটিয়ে ১৪ দিন অবস্থান করেছিলেন। পরে বিফল মনে সেখান থেকেই কলকাতায় চলে আসেন। এরপর কোনোদিন তিনি আর এ বাড়িতে ফিরে আসেননি।
বর্তমানে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাহায্যে কবির স্মৃতি নিদর্শন এবং আলোকচিত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি জাদুঘর। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংস্কার করা এই দোতলা বাড়িটিতে রয়েছে মোট ছয়টি কক্ষ। এর মধ্যে ওপরে রয়েছে তিনটি এবং নিচে রয়েছে তিনটি কক্ষ। এর নিচ তলায় রয়েছে কবি পরিবারের একটি মন্দির আর মধুসূদন জাদুঘর। মধুসূদন জাদুঘরে আছে কবির ব্যবহার করা খাট, চেয়ার ও আলমারি। এর পাশে রয়েছে একটি ছোট পাঠাগার। এই ভবনের একদম উত্তর দিকে আছে ছাদহীন-দেয়ালঘেরা একটি অসাধারণ নির্মাণশৈলীর একটি কক্ষ। এই কক্ষেরই কোণার দিকে রয়েছে তুলসী গাছ। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাড়ির প্রবেশ পথের সামনে রয়েছে ১৯৮৪ সালের শিল্পী বিমানেশ চন্দ্র বিশ্বাসের নির্মিত কবি মধুসূদন দত্তের একটি ভাস্কর্য।
আধুনিক বাংলা কবিতার জনক ও যুগস্রষ্টা এক কবি বাংলা সাহিত্যে সনেট, চতুর্দশপদী কবিতা এবং মহাকাব্য সৃষ্টি করেছেন। কবিতাকে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন। তার অমর সৃষ্টি মেঘনাদবধ কাব্য। এছাড়াও দ্য ক্যাপটিভ লেডি, শর্মিষ্ঠা, কৃষ্ণকুমারী, পদ্মাবতী, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, একেই কি বলে সভ্যতা, চতুর্দশপদী কবিতাবলী ইত্যাদি।
জমিদার ঘরে জন্মগ্রহণ করেও শুধুমাত্র সাহিত্যকে ভালোবেসে সমাজ সংসার থেকে পেয়েছেন বঞ্চনা আর যন্ত্রণা। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতায় মারা যান মহাকবি মাইকেল মধুসূদন। এরপর কবির ভাইয়ের মেয়ে কবি মানকুমারি বসু ১৮৯০ সালে কবির প্রথম স্মরণসভার আয়োজন করেন সাগরদাঁড়িতে। সেই থেকে শুরু হয় মধু মেলা। এর ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা প্রশাসন প্রতিবছর মধুকবির জন্মদিন ঘিরে আয়োজন করে সপ্তাহব্যাপী মধুমেলার। মেলাকে ঘিরে প্রতিবছর বিভিন্ন এলাকার মানুষ মধুমেলা উপভোগের জন্য আসেন।
সময়সূচি ও প্রবেশমূল্য
মধুপল্লী মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং সোমবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রোববার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে। মধুপল্লীতে প্রবেশমূল্য শিক্ষার্থী ১০ টাকা। প্রাপ্তবয়স্ক ২০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশ ১০০ টাকা এবং অন্যদেশের পর্যটক ৩০০ টাকা।
যেভাবে যাবেন
এখানে আসতে হলে আপনাকে প্রথমেই যশোরে আসতে হবে। যশোর সদর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে মধুপল্লী। যশোর থেকে বাসে এসে কেশবপুর নামতে হবে। বাস ভাড়া ৫০ টাকা। এরপর স্থানীয় যানবাহন রিজার্ভ করে সাগরদাঁড়ির এই মধুপল্লীতে যেতে হবে।
এফএ/জেআইএম
What's Your Reaction?